অর্থনীতি-ব্যবসা কৃষি চট্টগ্রাম জাতীয় বিভাগীয় সংবাদ

কৃষি ব্যাংকের অভিনব দুর্নীতি ও একজন প্রাণহরি দাসের গল্প!

নিজস্ব প্রতিবেদক : লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের বৃদ্ধ কৃষক প্রাণহরি দাস। অসহায় এ বৃদ্ধ বয়স্কভাতা পাচ্ছেন গত আট বছর ধরে। তিনি দশ বছর আগে কৃষি ব্যাংক থেকে পাঁচ হাজার টাকা কৃষিঋণ নেন। এর মধ্যে সময়মতো তিনি আট হাজার টাকা পরিশোধও করেন। এরপর প্রায় বছর দুয়েক প্রাণহরি দাস ও কৃষি ব্যাংক, কোনো পক্ষের সাড়া ছিল না।

ভাগ্যক্রমে কৃষি ব্যাংক থেকেই প্রাণহরি দাসের বয়স্ক ভাতার টাকা দেওয়া হয়। আর এই সুযোগটাই নেয় কৃষি ব্যাংকের স্থানীয় শাখা। প্রাণহরি দাসের বয়স্ক ভাতার টাকা বকেয়া কৃষিঋণ হিসেবে জোর করে আদায়ের অভিযোগ উঠেছে কৃষি ব্যাংকের ওই শাখার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। পাঁচ হাজার টাকার ঋণ পরিশোধের নামে গত আট বছরে বয়স্ক ভাতা থেকে ২২ হাজার টাকা কেটে নেওয়া হলেও ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পাননি প্রাণহরি দাস।

জোতদারের মতো প্রাণহরি দাসের সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার গল্পটি এখন কমলনগরের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে এ রকম ‘প্রাণহরি দাস’ অনেক আছেন, যারা কৃষি ব্যাংকের কাছে নাজেহাল হচ্ছেন, প্রতারিত হচ্ছেন। যে ঋণ পাওয়া তাদের অধিকার, সেটি পেতে জামানত দেওয়ার পরও তাদের গুণতে হচ্ছে মোটা অংকের ঘুষ। এরপর ঋণের চার-পাঁচগুণ সুদ দেওয়ার পরও মুক্তি মিলছে না কৃষকদের।প্রাণহরি দাসরা গ্রামের ভুলোভালা অশিক্ষিত, দরিদ্র কৃষক। তাদের কব্জা করা তুলনামূলক সহজ, আর কৃষি ব্যাংকের বেশিরভাগ সেবাগ্রহীতা গ্রামের শ্রমিক এবং কৃষককূল। তাই কর্মকর্তা ও দালালদের কাছে তারা মায়া হরিণের মতো। কর্মকর্তারা শুধু ওঁৎ পেতে থাকলেই হয়, দায় ঠেকে ওরা আসবে। কেউ বাঁচবে কোনোমতে, কেউ মরবে, তবে ঠকবে সবাই।

দরিদ্র কৃষকদের ঠকানোর কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক। ঋণ সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এসব ঠকানোর কৌশল গ্রহণ করা হয়। যেমন, ধরা যাক কেউ ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিল। সুদে আসলে তা এখন দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার টাকায়। তাকে বলা হল, যেহেতু তুমি শোধ করতে পারছো না, তুমি এবার ৪০ হাজার টাকা ঋণ নাও। সে চল্লিশ হাজার টাকা ঋণ নিল, কিন্তু কোনো টাকা হাতে পেল না। তার পূর্বের ঋণ শোধ হলো। আবার তার নামে ৪০ হাজার টাকা ঋণ বরাদ্দ হল। এক্ষেত্রে অবশিষ্ট পাঁচ টাকা গেলো কর্মকর্তাদের পকেটে।

তবে এর চেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয়ও আছে কৃষি ব্যাংকে। ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো আসল সুদে-আসলে দ্বিগুণ হয়ে গেলে, তার ওপর আর সুদ চার্জ করা যায় না। বেশিরভাগ শাখায় সে নিয়মেরও বালাই নেই। লেজারে নিয়মানুযায়ী টানা থাকলেও গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়।

ঋণ সমন্বয়ে গ্রাহকরা এবং ব্যাংক কীভাবে ঠকে সে বিষয়টি আর একটু পরিষ্কার করার প্রয়োজন রয়েছে। ধরা যাক, কেউ ঋণ নিয়েছিল ৩০ হাজাট টাকা। সুদে-আসলে তা এখন ৫৮ হাজার টাকা হয়েছে। টাকাটা আর দুই হাজা টাকা বাড়তে পারে। নিয়মানুযায়ী, এর চেয়ে বেশি বাড়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ গ্রাহক যদি ঋণের টাকাটা শোধ করে, তাহলে সর্বোচ্চ তাকে ৬০ হাজার টাকা শোধ করতে হবে।

কিন্তু ব্যাংক এক্ষেত্রে যেটা করে, ছা-পোষা গ্রাহককে ভয়ভীতি দেখিয়ে ঋণ সমন্বয় করে দেয়। তার নামে এবার বরাদ্দ যদি হয় ৬০ হাজার টাকা, তাহলে কোনো একদিন তাকে বা তার বংশধরকে সর্বোচ্চ শোধ করতে হবে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। যেখানে সে ৬০ হাজার টাকা শোধ করে পার পেতো, কোনো টাকা নতুন করে হাতে না পাওয়া সত্ত্বেও এবং ব্যাংকে কোনো টাকা জমা না হলেও ভবিষ্যতে তাকে শোধ করতে হবে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। এরকম পদে পদে শুভঙ্করের ফাঁকি আছে কৃষি ব্যাংকে।

কৃষকদের দশ টাকায় একাউন্ট খোলার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। অথচ এ দশ টাকার একাউন্ট খোলার ‘প্রসেসিং ফি’ নেওয়া হয় দুইশ টাকা। প্রতি পদে পদে এমন রকমারি অনিয়ম ও দুর্নীতি রয়েছে কৃষি ব্যাংকের বেশিরভাগ শাখায়, যার শিকার হচ্ছেন প্রাণহরি দাসরা।