Exceptional বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

কীভাবে ব্ল্যাকহোল দেখেন বিজ্ঞানীরা?

একটা নক্ষত্রের কথা ভাবতে পারি। সেই নক্ষত্রটার ভর সূর্যের ভরের চেয়ে দেড়গুণেরও বেশি। অর্থাৎ নক্ষত্রটা সূর্যের চন্দশেখর লিমিটকে ছাড়িয়ে গেছে। এখন তার নির্মম মৃত্যুতে কেউ আর বাধা দিতে আসবে না। ধরা যাক নক্ষত্রটার ভেতরের জ্বালানি ফুরিয়ে আসছে। তাই নক্ষত্রটার ভেতরের নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ায় প্রায় বন্ধের পথে।

সুতরাং সেটা ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। মানে ছোট হয়ে আসছে। কিন্তু তার ভেতরের ভর তো কমছে না। বরং ভেতরে পদার্থগুলো চলে আসছে পরস্পরের কাছাকাছি। তাই তাদের মধ্যে মহাকর্ষীয় আকর্ষণ বলের মানও বাড়ছে। দূরত্ব আরো নিবিড় হচ্ছে। একসময় নক্ষত্রটির আয়তন কমতে কমতে এমন এক পর্যয়ে পৌঁছাবে যে তখন সে তার চুপসে যাওয়াকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। নক্ষত্রের এই অবস্থার ব্যাসার্ধ্যকে বলে ক্রান্তিও ব্যাসার্ধ। ক্রান্তীয় ব্যাসার্ধ অতিক্রম করার সাথে সাথে হঠাৎ অনিয়ন্ত্রিতভাবে সংকোচন শুরু হয়ে যাবে। নক্ষত্রটির আয়তন কমতে কমতে এমন এক অবস্থানে পৌঁছাবে যখন সেটা একটা বিন্দুতে পরিণত হয়ে যাবে।

প্রায় আয়তনশূন্য একটা বস্তুর ভর যদি সূর্যের ভরের দ্বিগুণ হয় তবে তার ঘনত্ব কত হবে! নিশ্চয়ই সেটা অনুমান করা দুঃসাধ্য। তেমনি সেই বস্তুর মহাকর্ষ টানের পরিমাণও আমরা কল্পনায় আনতে পারি কীভাবে? আর এই বিশাল মহাকর্ষ টান উপেক্ষা করে তা থেকে কোনো বস্তুই বেরিয়ে যেতে পারে না। নক্ষত্রের এই অবস্থাকেই বলে ব্ল্যাকহোল। শুধু বস্তু কেন, কোনো প্রকার আলোক রশ্মিও ব্ল্যাকহোল থেকে বেরোতে পারে না। নক্ষত্র থেকে আলো আগেই বেরিয়ে গেছে, তাই আলো থাকার কথা নয়। তবে এ ধারণা ভুল। কিছু আলো মুত্যুর আগ পর্যন্ত নক্ষত্রের ভেতরে থেকে যায়। নক্ষত্রের আয়তন ক্রান্তীয় ব্যাসার্ধ পৌঁছানোর সময় একেবারে কম হলেও কিছু আলো অবশিষ্ট থাকে । এইর আলোটাও ব্ল্যাকহোল থেকে বেরুতে পারে না।

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিয়োরি অব রিলেটিভিটি বলে, আলো গতি মহাবিশ্বের সব জায়গায় এক। এই গতি কখনো যেমন বাড়ানো কমানো যায় না তেমনি একে থামানোরও উপায় নেই। তাহলে ব্ল্যাকহোলের মহাকর্ষ টানের প্রভাবে থামে কীভাবে? তাহলে কী ব্ল্যাক হোল থিয়োরি ভুল, নাকি আইনস্টাইনের থিয়োরি..? আসলে কোনোটাই ভুল নয়। এর সমাধান রয়েছে আইনস্টাইন সাধারণ থিয়োরি অব রিলেটিভিটিতে। এ থিয়োরিতে আইনস্টাইন বলেছেন, নক্ষত্রের মতো বিশাল ভরের বস্তু পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আলোক রশ্মি গতিপথ বেঁকে যায়। ব্ল্যাকহোলেও একই ব্যাপার ঘটে। ব্ল্যাকহোল থেকে নির্গত আলোক রশ্মি এর মহাকর্ষ বলয় থেকে বের হতে চাইলেও পারবে না। মহা শক্তিশালী মহাকর্ষ টানে বার বার বেঁকে যাবে, গতিপথ পরিবর্তন করবে কিন্তু বের হতে পারবে না আবার থামবেও না। প্রতিটা গ্রহ-নক্ষত্রের মহাকর্ষীবলের সীমা আছে। সেই সীমা অতিক্রম করতে হলে একটা নির্দিষ্ট বেগ অর্জন করতে হয় বস্তুকে। একে ওই বস্তুর মুক্তিবেগ বলে। পৃথিবীর মুক্তিবেগ সেকেন্ডে ১১.২ কিলোমিটার। কোনও বস্তুকে পৃথিবীর মহাকর্ষবল কাটিয়ে মহাকাশে যেতে হলে তার বেগ এই মুক্তিবেগের বেশি হতে হবে। যেসব মহাশূন্যযান পৃথিবী থেকে অন্যগ্রহে অভিযান চালাতে যায় তাদের গতি ১১.২ কিলোমিটারের চেয়ে বেশি হতে হয়। ব্ল্যাকহোলের মুক্তিবেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি। তাই ব্লাকহোল থেকে আলো বেরুতে পারে না।

এমনকি দূরের কোনো নক্ষত্রের আলো ব্ল্যাক হোলের গায়ে এসে পড়বে সে উপায়ও নেই। ব্ল্যাক হোলের মহাকর্ষ বলের প্রভাবে বেঁকে অন্য দিকে ঘুরে যায়, ব্ল্যাক হোলের শরীর স্পর্শ করার সাহস যেনো সেসব আলোর নেই।
ব্ল্যাকহোল যদি নাই দেখা যাবে তবে ব্ল্যাকহোল যে আছে তার প্রমাণ কী? একজন অন্ধ লোক, চোখে দেখে ন। কিন্তু না দেখেও দিব্যি সে সাদা ছড়ি নিয়ে চলাফেরা করে।

কীভাবে করে? সাদাছড়িটায় তাকে জানিয়ে দেয় সামনে কী আছে না আছে। তেমনি অন্ধের মতো বিজ্ঞানীদের হাতেও কিছু আছে সাদাছড়ি। কথা আগেই বলেছি; দূরের কোনো নক্ষত্র থেকে এসে ব্ল্যাক হোলের শরীর স্পর্শ করার আগেই বেঁকে যাওয়া সেই আলোক রশ্মিই বিজ্ঞানীদের সাদাছড়ি। বেঁকে যাওয়া এই আলোর গতি প্রকৃতিই ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্বের ঘোষণা দেয়। এই আলোকরশ্মির একটা নাম আছে। হকিং বিকিরণ। স্টিফেন হকিংয়ের নামে। এটা নিয়ে আরেকদিন আলোচনা করা যাবে।

জুমবাংলানিউজ/ জিএলজি