অপরাধ-দুর্নীতি জমিজমা সংক্রান্ত জাতীয় পজিটিভ বাংলাদেশ বিভাগীয় সংবাদ স্লাইডার

কল্যাণ চৌধুরী : যিনি রুখে দিয়েছিলেন শিবগঞ্জ ভূমি অফিসের ঘুষ বাণিজ্য

13427981জুবায়ের জুয়েল : কোনও ব্যক্তি উত্তরাধিকার বা ক্রয়সূত্রে একখণ্ড জমি পেলেও সরকারি নথিপত্রে তার বৈধ মালিক হতে হয়। আর এই মালিকানা পেতে সবাইকেই ছুটতে হয় ভূমি অফিসে। কিন্তু তাতেই কি কাজ হয়? কাজ সমাধা করতে গিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিত্যনতুন দুর্নীতি ও হয়রানির শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে। এ যেন এক রকম নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে এদেশে। তাছাড়া  বাংলাদেশের বেশিরভাগ মামলা-মোকদ্দমা বা বিরোধই ভূমি সংক্রান্ত। আর এজন্য ভূমি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে সৃষ্ট জটিলতাও অনেকাংশে দায়ী।

কিন্তু হতাশার বিপরীতে কখনো কখনো শোনা যায় আশা জাগানিয়া কিছু দেশপ্রেমিক তরুণ কর্মকর্তার কথা; যারা শত বাধা ডিঙিয়ে, হাজারো প্রলোভনকে জয় করে চলেছেন স্রোতের বিপরীতে; স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক সেবা নিশ্চিত করে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করেছেন ঘুষ বাণিজ্যের নাগপাশ থেকে।

এদেরই একজন হলেন চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি (ল্যান্ড) কল্যাণ চৌধুরী। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলার ইউএনও বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন ৩০তম বিসিএস-এর মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডার পাওয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কৃতী ছাত্র। মাঝখানে গত বছরের ১২ নভেম্বর থেকে এ বছরের ০২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসের জন্য একই সাথে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা এবং নেজারত ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে এসেছেন পাবনায়।

মানিকগঞ্জের কৃতি সন্তান কল্যাণ চৌধুরী ২০১২ সালের ০৭ জুন থেকে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বরগুনা ডিসি অফিসে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ১০ আগস্ট পর্যন্ত সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সেবা দিয়েছেন বরিশালের জনসাধারণকে। ২০১৬ সালের ০৯ সেপ্টেম্বর থেকে এক বছর এক মাস তিন দিন চাঁপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে দায়িত্ব পালন করেন এসি (ল্যান্ড) ও ভারপ্রাপ্ত ইউএনও হিসেবে। আর এখান থেকেই জনগণের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের সুযোগ্য সন্তান কল্যাণ চৌধুরী। সে আলোচনা মনযোগ আকর্ষণ করে জুমবাংলা ডটকমের।

22688034শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর গ্রামের দরিদ্র কৃষক মন্টু মিয়া। জমির নামজারির আবেদন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দালালদের খপ্পরে পড়ে ভোগান্তিতে ছিলেন তিনি। অবশেষে উপজেলা অফিসে এসে এসি ল্যান্ডের সাথে দেখা করেন নিজেই। তার মনে থাকা সমস্ত নেতিবাচক ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে শিগগিরই সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন সদালাপী, বিনয়ী ও পরোপকারী এসি (ল্যান্ড)। কয়েক দিনের মধ্যেই শুধু সরকারি ফি দিয়েই মন্টু মিয়া পেয়ে যান প্রত্যাশিত কাগজপত্র। নিজেই বিশ্বাস করতে পারেননি, এত তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে তার কাজ; তাও আবার মোটা অঙ্কের  ঘুষ ছাড়া। কয়েক মাস আগেই বিদায় নিয়েছেন সেই এসি (ল্যান্ড), কল্যাণ চৌধুরী। কিন্তু আজও সেই অভিজ্ঞতার কথা মন্টু মিয়া স্মরণ করেন কৃতজ্ঞ চিত্তে।

একই দাবি শোনা যায় কমল কুমার ত্রিবেদি নামে স্থানীয় আরেক ব্যক্তির মুখে। তিনি বলেন, “কল্যাণ চৌধুরী এসি (ল্যান্ড) থাকাকালীন একবারই শিবগঞ্জ ভূমি অফিসে গিয়েছিলাম খারিজের কাজে। গিয়ে জানলাম, ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাবতীয় লেনদেন ও তথ্যসেবা চালু করেছেন তিনি। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ বাণিজ্য বা দালালদের হয়রানি কোনটারই শিকার হতে হয়নি আমাকে। এসএমএস’র মাধ্যমেই জেনে গিয়েছি, কাজ হয়েছে কিনা। কাগজপত্র জমা দিতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় ধরে লাইনেও দাঁড়াতে হয়নি। বরং এসি (ল্যান্ড)-কেই এগিয়ে এসে সেবাপ্রত্যাশী মানুষজনের সাথে কথা বলতে দেখেছি।”

শুধু কমল কুমার ত্রিবেদি কিংবা মন্টু মিয়াই নন, একই বক্তব্য শিবগঞ্জ উপজেলার বিশিষ্টজনদের মুখেও। জুমবাংলার পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলে শিবগঞ্জের বাসিন্দা ও চাঁপাইবার্তা পত্রিকার সাংবাদিক কামাল হোসেন বলেন, “সাবেক এসি (ল্যান্ড) কল্যাণ চৌধুরী আসার আগে শিবগঞ্জ ভূমি অফিসের চিত্র ছিল এখনকার ঠিক উল্টো। এসি (ল্যান্ড), কানুনগো, সার্ভেয়ার, নামজারি সহকারী, নাজির, চেইনম্যান, প্রসেস সার্ভারদের বেশিরভাগই ছিলেন ঘুষ বাণিজ্যে জড়িত। নামজারি বা খারিজের জন্য গেলে দাগ-খতিয়ানে গড়মিল দেখিয়ে ফাইল আটকে রাখা হতো। এরপর শুরু হতো ঘুষ নিয়ে দালালদের দর কষাকষি। ১০ হাজার থেকে শুরু করে লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হতো। কল্যাণ চৌধুরীও চাইলে কোটি কোটি টাকা কামাতে পারতেন। কিন্তু তিনি কঠিন সততার পরিচয় দিয়েছেন। যদ্দুর জানি, অনেকে এজন্য তার প্রতি বিরাগভাজন ছিলো; তারা চাইতো, তিনি যাতে এখান থেকে তাড়াতাড়ি বদলি হয়ে চলে যান। তার মতো সৎ মানুষ হয় না।”

উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কাঞ্চন কুমার দাশ বলেন, “কল্যাণ চৌধুরী এখানকার ভারপ্রাপ্ত ইউএনও হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। সে সময় সমাজসেবা দিবস পালন ও বিভিন্ন কর্মসূচি সামনে রেখে তার কাছে যেতাম। তিনি সব সময় সহযোগিতা দিতেন এবং এর পাশাপাশি কীভাবে আরও জনমুখী সেবা নিশ্চিত করা যায়, সে ব্যাপারেও সৃজনশীল পরামর্শ দিতেন। সাধারণ জনগণের হয়রানি-ভোগান্তির কষ্টটা তিনি সবসময় হৃদয় দিয়ে অনুভব করতেন।”

17155302_1012568948887600_4053212945767362449_nজুমবাংলার পক্ষ থেকে ফোনে যোগাযোগ করা হয় শিবগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেনের সঙ্গে। কল্যাণ চৌধুরী সম্পর্কে শোনা তথ্যগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করে তিনি বলেন, “বাবাজি, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এত ভালো লোক আর দেখিনি। কী চমৎকার তার ব্যবহার! কী চমৎকার তার আচরণ! আমরা মুক্তিযোদ্ধারা তার কাছ থেকে বিশেষভাবে সম্মান পেতাম। তার রুমে ঢুকলেই তিনি চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে যেতেন। আমরা বলার পরে বসতেন। আমাদের যেকোনও প্রয়োজনে তিনি সবার আগে এগিয়ে আসতেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শও নিতেন।”

সবার বর্ণনায় সাবেক এসি (ল্যান্ড) কল্যাণ চৌধুরীর যে ভাবমূর্তি পাওয়া গেলো, তাতে প্রতিফলিত হয় সৎ, দেশপ্রেমিক, মেধাবী ও জনগণের কষ্ট উপলব্ধি করা একজন আলোকিত মানুষের প্রতিচ্ছবি। হবেই না বা কেন? তার বাবা প্রাণ গোপাল চৌধুরী ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক। কল্যাণ চৌধুরীর ভাষায়, “আমার বাবা, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রাণ গোপাল চৌধুরীই আমার আদর্শ, তিনিই আমার প্রেরণা। তাঁর কাছ থেকেই শিক্ষা পেয়েছি খাঁটি মানুষ হওয়ার, দেশপ্রেমিক হওয়ার। যেখানে তিনি শিক্ষকতা করতেন, সেই বেতিলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ তখনও সরকারি হয়নি। সে কারণে খুব সামান্যই বেতন পেতেন তিনি। তাই দিয়ে কোনও রকমে টেনেটুনে পরিবারের সারা মাসের খরচ চালাতেন আমার গৃহিণী মা, চায়না চৌধুরী। অনেক কষ্ট আর ত্যাগ স্বীকার করে আমাকে আর বোন সুপ্রিয়া চৌধুরীকে (মানিকগঞ্জে ঘিওর সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের লেকচারার) লেখাপড়া করিয়েছেন তারা। তাই সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছি বলে সাধারণ মানুষের কষ্ট আর সংকটের বিষোয়গুলো উপলব্ধি করতে পারি।”

উচ্চবিত্ত বাবাদের মতো সব আবদার পূরণ করতে না পারলেও প্রতিটি মুহূর্তে সন্তানদের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাবার শিক্ষা ও প্রেরণা যুগিয়ে গেছেন শিক্ষক প্রাণ গোপাল চৌধুরী। ‘জাতি গড়ার এই কারিগরের’ দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, একমাত্র ছেলেটা একদিন মানুষের মতো মানুষ হয়ে বাবার মুখ রাখবে, জাতির কাজে লাগবে। তাঁর সে বিশ্বাস মিথ্যে হয়নি। ‘সোনার ছেলে’ হয়ে সোনার বাংলা গড়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন ছেলে কল্যাণ চৌধুরী। এক কথায়, সার্থক শিক্ষক বাবার সফল ছেলে তিনি।

ছোটবেলা থেকেই দারুণ মেধাবী ছাত্র ছিলেন ১৯৮৪ সালের ২১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করা কল্যাণ চৌধুরী। মানিকগঞ্জের বেতিলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৯ সালে এসএসসি এবং ২০০১ সালে মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন কৃতিত্বের সঙ্গে। এরপর ২০০২-০৩ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে। সেখানেও রাখেন মেধার স্বাক্ষর। পরে ৩০তম বিসিএস পরীক্ষায়  উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসন ক্যাডার হন। এর পরের কথা তো মানুষের মুখে মুখেই ফিরছে।

সাধারণ মানুষের মনে কল্যাণ চৌধুরীর যে  ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, তা জানিয়ে আগামীর পথচলায় তার লক্ষ্য কী, জানতে চাওয়া হয়। জবাবে তিনি বলেন, “সাধারণ মানুষের মনে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, তা দূর করার জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করা খুবই প্রয়োজন। আমি সেটাই করে যেতে চাই। তরুণদের প্রতি আমি আস্থাশীল। তারা পরিবর্তন চায়। আমাদের দেখানো পথেই আগামী প্রজন্ম হাঁটবে। আর এভাবে একদিন বিশ্বের দরবারে শান্তি, প্রগতি ও উন্নয়নের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে মাতৃভূমি বাংলাদেশ।”

ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী সুস্মিতা চৌধুরী আর এক বছরের সন্তান অনিরুদ্ধ চৌধুরী স্বপ্নকে নিয়ে তার সুখী পরিবার। ক্রিকেট ও টেবিল টেনিস খেলা তার শখ। বই পড়া তার নেশা, বিশেষ করে উপন্যাস। তবে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আমানত হলের ৫ বছরের সুমধুর স্মৃতিগুলো রোমন্থন করতে ভালোবাসেন।

14212597