জাতীয় মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

ওস্তাদ বায়ে পেলাসটিক…, ওই ‘রোহিঙ্গা’ দূর হ

“ওস্তাদ, বায়ে পেলাস্টিক ডাইনে লন”-বলেই বাসটা একটু সামনে এগিয়েছে তারপরই একটা রিক্সা বাগড়া দিল। বাসের হেল্পার আবার তারস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে বলল, ওই “রোহিঙ্গা” দূর হ। লোকাল বাসের এ অভিজ্ঞতাটা সাম্প্রতিক। এর বাইরেও নগরীতে আরও দু’এক জায়গায় রোহিঙ্গা শব্দের এমন বিদ্বেষমূলক ব্যবহার লক্ষ্য করলাম। রোমান ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসকে কী কেউ কানেকানে এ খবর মিয়ানমার-বাংলাদেশ সফরের আগেই বলেছেন? নাকি তিনি জেনে গিয়েছিলেন যে প্রতিভাবান বাঙালি জাতির কেউ কেউ রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর নাম ইতোমধ্যে গালি হিসেবে ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে! এ গোপন খবরের ভিত্তিতে তিনি হয়ত গোস্বা করে থাকতে পারেন । যে কারনে তাঁর পুণ্যমুখে বিতর্কিত ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ ব্যবহারে এতো সংযত ছিলেন। যা মানবাধিকার কর্মীদের ক্ষুব্ধ করেছে। তারা পোপের সমালোচনায় মুখর হয়েছেন।

ভ্যাটি-আমেরিকান, ইউরোপিয়ান বা তাবৎ পৃথিবীর ক্যাথলিক খৃস্টানদের ধর্মপ্রাণ রাজ-কূটনৈতিক অঙ্গনের প্রধান মুখপাত্রের লালখেলা(রেড ডিপ্লোমেটিক গেম) বা লীলাখেলা কি আমি নগণ্য জানি নে। তবু পোপ রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এথনিক ক্লিনজিংয়ের শিকার এই বিপন্ন মানুষগুলোর পক্ষে আরও শক্ত অবস্থান তিনি নিতেই পারতেন। পৃথিবীর সকল ধর্মের মানবতাবাদী বাণী আমাদের বিপর্যস্ত, বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়। ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফাঁদে পড়ে কাঁদা রোহিঙ্গাদের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে তাঁর শক্ত ভূমিকার খুবই প্রয়োজন ছিল। তবু ঢাকায় তাঁর পুণ্য পদধূলির জন্য আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

লেখার এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে, ছোটবেলা দেখতাম বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে বাইরে থেকে এসে যারা সেটেলড হত তাদেরকে ‘আবাদী’ বা ‘নোয়াখালী’ বলে ডাকা হত। কুমিল্লা, নোয়াখালী ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষেরা সাধারণত সিলেট অঞ্চলে বেশি মাইগ্রেট করতেন। পেশায় তারা ছিলেন মসজিদ মক্তবের ইমাম-মোয়াজ্জিন, শিক্ষক, মাদ্রাসা পড়ুয়া তালেবে আলেম, কৃষি, মৎস্য ও শিল্প পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাছাড়া, ফসল তোলার মওসুমে দাওয়াল খাটতে যেতেন বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের মানুষেরা(অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধুর লেখায় এর উল্লেখ দেখতে পাই)। আরও উল্লেখ করা যেতে পারে হিজরতকারী নোয়াখালীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের প্রভাবে তাদের নিজ অঞ্চলের নামে বৃহত্তর সিলেটে দু একটা ইউনিয়নের নামকরণ পর্যন্ত হয়েছে। মজার বিষয় হলো হিজরতকারী যে অঞ্চলেরই হোন না কেন তারা ‘নোয়াখালী’ বলে বিবেচিত হতেন। এই ডাকটার মধ্যেও এক ধরনের বিদ্বেষ, তাচ্ছিল্য ও মানুষকে হেয় করার একটা গোপন সচেতন প্রয়াস দেখতাম । এ ধরনের মনোভাব একদম সেকেলে ও হারিয়ে গেছে এ কথা এখনো হলফ করে বলতে পারি না। তবে ভাষিক বিচ্ছিন্ন এ আক্রমণের বাইরে আউটসাইডারদের প্রতি সিলেট অঞ্চলের মানুষেরা সহানুভূতিশীল এবং প্রাচীনকাল থেকেই দেশ-বিদেশে অতিথিপরায়ণ বলে সুনাম কুড়িয়েছেন। তা না হলে দক্ষিণের নদীভাঙা, বাস্তুচুত্য জীবিকার তাগিদে এতো বেশি সংখ্যায় মানুষেরা সিলেট অঞ্চলে স্থায়ী বসত গড়তে পারতেন না।

যে প্রসঙ্গে লেখা শুরু করেছিলাম সে প্রসঙ্গে ফেরা যাক। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরতার শিকার হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা এদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের পাশে মানবিক ডাকে সাড়া দিয়ে এ দেশের নানা ব্যক্তি, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়েছে। খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, ওষুধ সামগ্রী ও নগদ অর্থ সাহায্য নিয়ে ছুটে গেছেন। সিলেটের বেশ কজন তরুণ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সাহায্য করতে যেয়ে ফেরার পথে এক সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে জীবন দিয়েছেন। এগুলো এ দেশের মানুষের জাতিগত উদারতার পরিচয় বহন করে। সীমান্তের দুঃখনদী নাফ পেরিয়ে টেকনাফ-উখিয়ায় আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের ঘিরে বহুমাত্রিক সংকট ঘনীভূত হবার আগেই সংকটের স্থায়ী, শান্তিপূর্ণ সমাধান ও রোহিঙ্গাদের জরুরী প্রত্যাবাসন দরকার। সে লক্ষ্যে রাষ্ট্র তার অনুকূলে থাকা আন্তর্জাতিক সব শক্তির সমর্থন নিয়ে যত দ্রুত কাজ করবে ততই সকলের জন্যে মঙ্গল ।

লেখক:আলমগীর শাহরিয়ার, কবি ও কথাসাহিত্যিক