জাতীয় মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

এতই অবিশ্বাস্য যে, কোনও ব্যাখ্যাই কাজে আসে না

ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. মাহবুব উল্লাহ্

ড. মাহবুব উল্লাহ্: ড. অশোক মিত্র ভারতের একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ। তিনি আজ আর বেঁচে নেই। ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গেই ছিল তার আদি নিবাস। তাকে বাংলাদেশের ঋদ্ধ পণ্ডিত ব্যক্তিরা জানেন। কেউ কেউ তার লেখাজোখার মধ্য দিয়ে, অন্যরা প্রত্যক্ষ পরিচয়ের মাধ্যমে।

অশোক মিত্র ছিলেন প্রাবন্ধিক, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই তিনি লিখতেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি অধ্যাপনা করেছেন। তিনি ছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষিপণ্য মূল্য কমিশনের সভাপতি ও ভারত সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা।

পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এবং রাজ্যসভার সদস্য। বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চার জন্য সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। ভারতের যেসব পণ্ডিত ব্যক্তিকে আমি শ্রদ্ধার চোখে দেখি তাদের মধ্যে অশোক মিত্র অন্যতম।

২০০৭ সালে তার একটি প্রবন্ধ সংকলন ‘সমাজ, স্মৃতি, সাহিত্য’ নামে প্রকাশিত হয়। এ সংকলনের প্রতিটি প্রবন্ধ ভাষাশৈলী এবং সাহিত্য গুণের দিক থেকে অতুলনীয়। এ গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধটির শিরোনাম ‘আপাতত’।

এ প্রবন্ধের এক পর্যায়ে তিনি লিখেছেন, ‘যে কোনো যুগে যে কোনো কালে এরকম হয়ে এসেছে, হওয়া সম্ভব। আদি বিশ্বাসের খুঁটি নড়ে গেছে, পেছনের দিকে কি ছিল তা দেখা যাচ্ছে না, সামনের দিকেও সমান অস্পষ্ট। এ অবস্থায় আদর্শের বন্ধন আলগা হয়ে আসে, পণ্ডিত ও পণ্ডিতম্মন্যরা কেরামতির দিকে ঝোঁকেন, উত্তর-আধুনিকরাও ঝুঁকেছেন। সার্ত্র-ব্যুভিয়ের দ্বারা লালিত অস্তিত্ববাদ অনুর সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করেছিল।

সেই ঘোষণা নিয়ে একদা প্রচুর জল ঘোলা, মানবমুক্তির সম্ভাবনা কতটা পরাহত সেই তর্কের অন্তিমেও কিন্তু এ সিদ্ধান্তে স্থিত হওয়া : কমিউনিস্ট পার্টিকে মানি বা না মানি, কমিউনিস্ট সৌভ্রাত্রকে অস্বীকার অকল্পনীয়। তারপর তো আরও অনেক ঘটনাক্রমের পরম্পরাগত শোভাযাত্রা। ফুকো, অ্যালথুসর, দেরিদা, সবার উপরে টুকরো সত্য তার উপরে নেই।

অস্তিত্বকেই টুকরো করে নাও, চেতনাকে ছোরার ফলা বসিয়ে খণ্ড-বিখণ্ড করো; কোনো সামগ্রিক দর্শন নয়, খণ্ডিত শব্দই স্বয়ম্ভু খণ্ডিত অনুভূতি। মানব ইতিহাস। যে কোনো পত্রপত্রিকা খুলে দেখুন, দিস্তা-দিস্তা তত্ত্ব কপচানো হচ্ছে, ইতিহাসের ক্ষেত্রে, দর্শনচর্চার ক্ষেত্রে, ধনবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে।’

আমাদের সমাজের নানা অসঙ্গতি এবং অনেক ক্ষেত্রে আদর্শের মৃত্যু দেখে অনেকেই মন্তব্য করেন, আমরা নষ্ট সময় পার করছি। কেন এই নষ্ট সময়ের অবস্থার সৃষ্টি হয় তার দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অশোক মিত্র যথার্থই বলেছেন, যে কোনো যুগে যে কোনো কালে এ রকম হয়ে এসেছে, হওয়া সম্ভব।

আদি বিশ্বাসের খুঁটি নড়ে গেছে, পেছনের দিকে কি ছিল তা দেখা যাচ্ছে না, সামনের দিকেও সমান অস্পষ্ট। এ অবস্থায় আদর্শের বন্ধন আলগা হয়ে আসে, পণ্ডিত ও পণ্ডিতম্মন্যরা কেরামতির দিকে ঝোঁকেন, উত্তর আধুনিকরাও ঝুঁকেছেন। সময় যে কীভাবে নষ্ট হয়ে ওঠে তা আমরা অনেক সময় বুঝে উঠতে পারি না। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের একজন সদস্য ছিলেন, যিনি সব সময় সরকারি দলেই থাকতেন।

অর্থাৎ যে সময় যে সরকার ক্ষমতায় থাকে সেই সরকারের দলেই তিনি ঢুকে পড়েন। একবার সংসদে তার বিরোধী পক্ষের লোকরা তাকে প্রশ্ন করেছিল, আপনি কেন বারবার দল বদল করেন, ডিগবাজি খান। জবাবে সেই সদস্য বলেছিলেন, কে বলে আমি দল বদল করি?

আমি তো সব সময় সরকারি দলেই থাকি। এ অবস্থানের পক্ষে এসব লোক অনেক যুক্তি হাজির করেন। যেমন সরকারি দলে থাকলে দেশ ও সমাজেরকল্যাণের জন্য অনেক কাজ করা যায়। বিরোধী দলে থাকলে এ রকম জনকল্যাণধর্মী কাজ করা যায় না।

এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অতিপরিচিত কিছু রাজনৈতিক মুখকে দল বদল করতে দেখা গেছে। এর তাৎক্ষণিক কারণ দীর্ঘকালজুড়ে তারা যে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দলের জন্য অনেক কাজ করেছেন, সেই দল তাদের মনোনয়ন দেয়নি।

কারও কারও ক্ষেত্রে দল বদলের ব্যাপারটি এতই অবিশ্বাস্য যে কোনো ব্যাখ্যা দিয়ে এর যথার্থতা দাঁড় করানো কঠিন। অবশ্য একটি ঠুনকো ব্যাখ্যা আছে।

মানুষ রাজনৈতিক দল কেন করে? দল করার মোক্ষম লক্ষ্য হল এমপি বা মন্ত্রী হওয়া। আর তাই যদি না হওয়া যায় তাহলে রাজনীতি করে কী লাভ? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আদর্শ বলে কিছু নেই, বিশ্বাস বলে কিছু নেই। রাজনৈতিক দলগুলোও এ রকম সুবিধাবাদের সুযোগ নেয়।

লেনিন বলেছিলেন, শাসকগোষ্ঠী যখন জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরে ফাটল দেখা দেয় তখনই বিপ্লবের বাস্তব অবস্থার সৃষ্টি হয়। এদেশে যত রাজনৈতিক দল রয়েছে তাদের মধ্যে কেউ বিপ্লব করতে চায় এমনটি ভাবার সঙ্গত কোনো কারণ নেই।

তাহলে শাসক দলের অভ্যন্তরে মতপার্থক্যের সুযোগ নেয়া কেন? সুযোগ এ জন্যই নেয়া হয় যে, পরবর্তী ক্ষমতা বদলের পালায় শাসকগোষ্ঠীরই ভিন্ন একটি অংশ ক্ষমতায় আসতে পারে। ১৯৬৯-এ আইয়ুব খানের পতনকে যেসব কারণ অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিল তার মধ্যে একটি গৌণ কারণ ছিল জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরকার থেকে বিদায় এবং ভিন্ন রাজনৈতিক দল গঠন।

গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল জোয়ারের মধ্যে আইয়ুব খান পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য তার অধীনেই সামরিক আইন জারি করার অপশনটি নিয়ে ভাবছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি যখন তার প্রধান সেনাপতি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে কথা পারলেন, তখন ইয়াহিয়া খান প্রশ্ন তুললেন, Martial lwa Under Whom? বুদ্ধিমান আইয়ুব খানের পক্ষে ইয়াহিয়ার এ উক্তির তাৎপর্য বোঝা কঠিন হয়নি।

তিনি বুঝতে পারলেন, সামরিক আইন জারি করে তাকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করে ইয়াহিয়াই ক্ষমতার মসনদে বসতে চান। এটাও শাসকগোষ্ঠীর এক্সিকিউটিভদের মধ্যে দ্বন্দ্বের বহির্প্রকাশ।

যখন শাসকগোষ্ঠীর পুরনো কর্মকর্তারা অকেজো হয়ে যায়, তখন শাসকগোষ্ঠী নতুন কর্মকর্তা বেছে নেয়। এর ফলে বিপ্লবও হয় না, বিদ্যমান সামাজিক অবস্থারও কোনো পরিবর্তন হয় না। হয়নি যে তার সাক্ষী তো আমরা, যারা এ রাজনৈতিক উথাল-পাথাল প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছি।

অশোক মিত্র উত্তর-আধুনিক মতবাদ সম্পর্কে যে সমালোচনা করেছেন সেই উত্তর-আধুনিকরা মনে করেন, সব গ্র্যান্ড নেরেটিভের মৃত্যু ঘটেছে। কোনো বিশ্বাস বা দর্শনের ওপর মানুষের এখন কোনো আস্থা নেই। মানবজাতির গ্র্যান্ড নেরেটিভগুলোর মধ্যে রয়েছে নানারকম ধর্মীয় বিশ্বাস এবং গণতন্ত্র ও কমিউনিজমের মতো বিশ্বাসগুলো।

এখন পৃথিবীতে কোথাও খাঁটি গণতন্ত্র বা খাঁটি কমিউনিজম খুঁজে পাওয়া যায় না। কিছুদিন আগে বাংলাদেশের একজন রাজনৈতিক নেতা আমাকে বলেছিলেন, পৃথিবীটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। অতীতের জং ধরা বিশ্বাস দিয়ে এখন আর সামনের দিকে এগোনো সম্ভব না।

এর মূলে রয়েছে এমন একটি বিশ্বাস যার ভাবার্থ অশোক মিত্রের ভাষায়, নব্য ধ্র“পদী অর্থনীতিবিদদের চিন্তায় প্রকাশ পায়। এ চিন্তা অনুসারে সমাজ একটি কল্পিত সমষ্টি, তেলে জলে যেমন মিশ খায় না, একটি মানুষের আচার-বিচার, পছন্দ-অপছন্দ ইত্যাদির সঙ্গে অন্য কোনো মানুষের বিচরণ-বিভঙ্গ-মতামতকে সমসূত্রে গাঁথার কোনো প্রকরণ কুশলতা নেই। অর্থাৎ সমাজ এখন এক উৎকট অনু কেন্দ্রিকতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে।

এ সমাজে সমষ্টির স্বার্থ নয়, ব্যক্তির স্বার্থই প্রধান। এ রকম সামাজিক মানসিকতা তখনই সৃষ্টি হয় যখন আদি বিশ্বাসের খুঁটি নড়ে যায়, অতীত ও ভবিষ্যৎ দুটোই অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে মানুষ স্বপ্ন দেখে না, সামনের দিনগুলোতে সমগ্র মানবগোষ্ঠীর জন্য কল্যাণকর কিছু করা সম্ভব সেটাও সে বিশ্বাস করতে চায় না। এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে ষাটের দশকের পর।

ষাটের দশকেই মার্টির লুথার কিং বলেছিলেন ও যধাব ধ ফৎবধস. ষাটের দশকের পর মানবজাতির সমগ্র ইতিহাসের তুলনায় আমরা ক’বছর পার করেছি? এত অল্প সময়ের মধ্যে মানবজাতির চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে কথা বলার সময় আসেনি।

ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন না দেখারও কারণ নেই। আমাদের এক গায়ক গেয়েছিলেন, কী ভাবার কী ভাবছি, কী দেখার কী দেখছি! এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যা কিছু দেখছি তাতে মনে হয়, রাজনীতির মৃত্যু ঘটেছে। ২৮ নভেম্বরের (২০১৮) দৈনিক যুগান্তরের প্রথম পাতায় ৩ কলামব্যাপী একটি শিরোনাম ছিল, ‘মনোনয়ন বাণিজ্যে বিপর্যস্ত জাতীয় পার্টি- টাকা ফেরত চেয়ে বঞ্চিতদের আলটিমেটাম।’

সংবাদ ভাষ্যের ভেতরে লেখা হয়েছে, ‘টাকা ফেরত দেয়ার জন্য ভুক্তভোগীরা পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিনকে প্রকাশ্যে আলটিমেটাম দিয়েছেন। সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দ্রুত টাকা ফেরত না দিলে পুলিশও তাদের রক্ষা করতে পারবে না। মঙ্গলবার দিনভর এ রকম ক্ষোভ-প্রতিবাদের ঘটনা ঘটে বনানীর দলের কার্যালয়ে।’ একটি রাজনৈতিক দলের মহাসচিব কীভাবে এত নিচে নামতে পারেন, বিশ্বাস করা যায় না।

রাজনৈতিক দল সমর্থক ও দরদিদের অর্থানুকূল্যে চলে। তাই রাজনৈতিক দলের পক্ষে চাঁদা নেয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এ ব্যাপারে যখন কোনো ধরনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকে না তখনই প্রশ্ন ওঠে। আমি বলতে পারব না আমাদের দেশের সব রাজনৈতিক দল সমর্থক ও দরদিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রতিটি পাই-পয়সার হিসাব রাখে কিনা এবং রাখলে তা দলের কাউন্সিলে পেশ করে কিনা।

তবে এ কথাও সত্য, সরকারে যে দল থাকে সে দল যদি স্বৈরাচারী হয়ে পড়ে, তখন বিরোধী দলের পক্ষে অর্থপ্রাপ্তির উৎস প্রকাশ করা বিপজ্জনক হয়ে পড়ে। তবে জাতীয় পার্টির মহাসচিব সম্পর্কে যে অভিযোগ উঠেছে সেই অভিযোগের মূলে সরকারি চাপের কারণ দর্শিয়ে পার পাওয়া সম্ভব হবে না। কারণ জাতীয় পার্টির সঙ্গে বর্তমান সরকারি দলের গভীর সুসম্পর্ক রয়েছে। যা হোক এ রকম ঘটনা আদর্শহীনতার কারণেই ঘটতে পারে। জানি না আর কত বছরে আমাদের দেশের রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও সততা ফিরে আসবে।

ড. মাহবুব উল্লাহ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

জুমবাংলানিউজ/ জিএলজি