মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

এখন শিক্ষার বিজয় হোক-গোলাম কবির

বিজয় দিবসের বয়স এবার ৪৫ বছর পূর্ণ হলো। এই দিনে রমনা রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।

উল্লাস আর আনন্দসাগরে অবগাহন করেছিল সমগ্র জাতি। বীরের রক্তস্রোত আর জননীর চোখের জলে কেনা এই বিজয় সেদিন আমাদের স্বজন হারানোর বেদনা ভুলিয়ে দিয়েছিল ক্ষণিকের জন্য। এ অনুভব বই পড়ে কিংবা লোক মুখে শোনা নয়, একেবারে জীবন্ত প্রত্যক্ষ করা।আজ প্রায় অর্ধশতাব্দী পর পেছন ফিরে চেয়ে দেখি। হিসাব মেলাতে গিয়ে কিসের যেন অবক্ষয় আমাদের চেতনাকে বিদ্ধ করে। কর্মজীবনের সূচনা ও সমাপ্তি টেনেছি শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা দিয়ে। সুতরাং শিক্ষার কথাই বলি। সদ্য স্বাধীন ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত দেশ স্বাভাবিক গতি পায়নি। স্বাধীন দেশে প্রথম উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো। পরীক্ষা নয় যেন উন্মত্ত নকলের বন্য মেলা বসেছিল। বঙ্গবন্ধু এ নৈরাজ্য বরদাশত করেননি। তাঁর কঠোর হস্তক্ষেপের জন্য পরের বছর আর বিশৃঙ্খলার পুনরাবৃত্তি হয়নি। শিক্ষাকে সর্বজনীন করার জন্য তিনি গঠন করেছিলেন ড. কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে শিক্ষা কমিশন। সে কমিশনের দু-একটি অধিবেশনে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তখন শিক্ষার মৌলিক পাঠক্রম কিংবা পরীক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কাটাছেঁড়ার কোনো পরামর্শ ছিল না। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিদেশে গিয়ে সেখানকার নিয়ম দেখে এসে তা-ই প্রবর্তন করার অপরিণামদর্শিতা দেখাননি। এখন নিত্যনতুন বিধি প্রবর্তনের ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই ঝাপসা দেখে।

ইংরেজির কথাই বলি। পাঠক্রমে ইংরেজি ব্যাকরণ ও ট্রান্সলেশনের প্রাধান্য নেই, নেই ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার যোগসূত্র। পড়ছে যোগাযোগের ইংরেজি। তাই বলে ভাষা শেখার আগে ব্যাকরণ পড়ার কথা আমরা বলছি না। তাহলে প্রমথ চৌধুরীর কথায় মুখে কালি লাগবে। যা হোক, যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি তাদের জন্য এটি প্রযোজ্য হলেও আমাদের জন্য কতখানি ফলপ্রসূ হবে, তা ভেবে দেখা উচিত ছিল। কথায় বলে, মানুষ শুধু রুটির জন্যই বাঁচে না। আমরা এই ইংরেজি শিখে যোগাযোগে সিদ্ধিলাভ করব। পক্ষান্তরে আমাদের আনন্দময় জগতের অপমৃত্য ঘটবে। যেমন— অকালপ্রয়াণ ঘটেছে সংস্কৃত ও ফারসি ভাষার ক্ল্যাসিকগুলোর, যা একসময় ঐচ্ছিক বিষয় ছিল মাধ্যমিক পর্যায়ে।

আমরা শুরু করেছিলাম পরীক্ষায় নকল করার কথা দিয়ে। আবার সেখানে ফিরে আসি। একসময় পরীক্ষায় নকল হতো। সেকালের শিক্ষকরা আপ্রাণ চেষ্টা করতেন নকল ঠেকাতে। শতভাগ সকল হতেন, তা বলা যায় না। তবে দুঃখের বিষয়, এখন অভিনব নকল শুরু হয়েছে। এর মূলে রয়েছে বিদেশ থেকে নতুন নতুন কায়দাকানুন আমদানি। যেমন—সৃজনশীল পদ্ধতি। এই পদ্ধতি সম্পর্কে শতকরা পাঁচজন শিক্ষকও সম্যক অবহিত নন। যে দু-একজন বোঝেন, তাঁরা গাইড লেখেন। শিক্ষকদের অনেকে সেই গাইড নকল করে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেন। শিক্ষার্থীরা সেই সমাধান পরীক্ষার উত্তরপত্রে লিখে আসে। এটা অন্য ধারার অভিনব নকল।

সাবেকি আমলের লেখাপড়ার সব কিছু বর্জনীয়—এ ধারণা যেসব উর্বর মস্তিষ্ক থেকে জন্ম নিয়েছে, তাঁরা কিন্তু সাবেকি লেখাপড়া করেই আজ সমাজ-রাষ্ট্রের বিশিষ্ট আসনে অধিষ্ঠিত। আমরা কল্যাণকর পরিবর্তনের বিপক্ষে নই। তবে পরিবর্তনের আগে যাঁরা প্রয়োগ করবেন তাঁদের সঠিক ধারণার ব্যাপক প্রয়োজন ছিল। সেটা না হওয়ার জন্য এখন হ-য-ব-র-ল অবস্থা। বিষয়টি সামাল দেওয়ার জন্য ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কয়েকজনকে বিদেশ পাঠিয়ে তার সমাধান হবে না। গোটা শিক্ষক সমাজকে এর আওতায় আনতে হবে। দুঃখের বিষয়, সেই নিবেদিতপ্রাণ পণ্ডিত শিক্ষকের আজ বড় অভাব।

পত্রপত্রিকায় পরীক্ষার উত্তপত্র মূল্যায়ন নিয়ে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মনে নানা প্রশ্ন উদিত হয়। এর প্রধান কারণ যথাযথ মূল্যায়নকারীর সংখ্যা দিন দিন সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে। আর পরীক্ষাসংক্রান্ত কাজে যাঁরা নিয়োজিত তাঁদের যাচাই-বাছাইয়েও গলদ আছে। এমএ পাস করে যেকোনোভাবে শিক্ষা বিভাগে চাকরি হয়ে গেল, আর তিনি পরীক্ষাসংক্রান্ত গুরুদায়িত্ব পেয়ে গেলেন! তাঁকে দিয়ে তোষামোদি পাওয়া যাবে, সত্যিকার শিক্ষিত বাছাই বিঘ্নিত হবে। একসময় দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অধিকর্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হতো। এখন হয়েছে উল্টো; প্রায় ক্ষেত্রে তোষামোদকারীরাই প্রাধান্য পাচ্ছে।

সারা বিশ্ব জানে আমরা অপশক্তিকে পরাজিত করে বিজয় এনেছি। আজকের শিক্ষার কুণ্ঠিত অবস্থা আমাদের ম্লান করছে কি না একটু ভেবে দেখার অবকাশ আছে বলে মনে হয়। আমরা শিক্ষার জন্য গলদঘর্ম হয়ে প্রাণপাত করছি। আমাদের আড়ম্বরের অবধি নেই; কিন্তু সেই তপঃক্লিষ্ট শিক্ষা কই?

বাল্যশিক্ষার অবসান হওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিষ্ফলা স্কুল জীবনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘কিছু না করিয়া যে-সময় নষ্ট হয় তাহার চেয়ে অনেক বেশি লোকসান করি কিছু করিয়া যে-সময়টা নষ্ট করা যায়’ (জীবনস্মৃতি)। সমাজ ও জীবন চলমান। আমরাও কালচক্রের সঙ্গে এগিয়ে যাব। তার অর্থ এই নয় যে পরানুকরণ করে নিজেদের বিসর্জন দেব। করে ভাবব না, ভেবে করব।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

Add Comment

Click here to post a comment