আন্তর্জাতিক

এক দিনে তিন দেশে হামলায় আতঙ্ক ইউরোপ জুড়ে

গত ১৯ ডিসেম্বর সোমবার একই দিনে সন্ত্রাসী হামলায় কেঁপে ওঠে ইউরোপের এই তিন দেশ জার্মানি, তুরস্ক ও সুইজারল্যান্ড। এ দিন স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় জার্মানিতে বার্লিনের এক মার্কেটে চালানো হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৪০ জনেরও বেশি আহত হয়। আর্ট গ্যালারি পরিদর্শন করতে গিয়ে বন্দুকধারীর গুলিতে প্রাণ হারান তুরস্কে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কারলভ। সুইজারল্যান্ডের জুরিখের একটি মসজিদে এক বন্দুকধারীর হামলায় তিন ব্যক্তি আহত হয়েছেন। এই তিন হামলার ঘটনায় ইউরোপ জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার আভাস মিলেছে।
জুরিখে মসজিদে হামলায়
সুইজারল্যান্ডের জুরিখে মসজিদে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর এক বন্দুকধারীর গুলিবর্ষণে তিনজন আহত হয়েছেন।
সোমবার সন্ধ্যায় ওই বন্দুকধারী মসজিদটিতে হামলা চালায় বলে জানিয়েছে সুইস পুলিশ। পুলিশ বলেছে, মসজিদটির ভেতরে থেকে হামলার নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে। হামলার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তারা।
পুলিশ জানিয়েছে, তারা ঘটনাস্থলের কাছ থেকে একজনের লাশ উদ্ধার করেছে। মসজিদে হামলার সাথে এ লাশ উদ্ধারের ঘটনা সম্পর্ক থাকতে পারে। সুইজারল্যান্ডের লোকাল নিউজ এ খবর জানায়। স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৫টার একটু পরে জুরিখের প্রধান রেল স্টেশনের পাশের মসজিদে হামলাটি হয়। গুলিতে ৩০, ৩৫ ও ৫৬ বছর বয়সী তিন ব্যক্তি আহত হয়েছেন, এদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছে জুরিখ পুলিশ। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কালো পোশাক ও কালো উলের ক্যাপ পরা প্রায় ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি হামলাটি চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। হামলার পর সে পালিয়ে যায়। সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়ে পুলিশ বলেছে, তারা কাছাকাছি এলাকা থেকে এক বালককে পেয়েছে। এই বালকের সাথে হামলার কোনো যোগসূত্র আছে কি না তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে, তদন্তনাধীন থাকায় এ বিষয়েও কোনো মন্তব্য করেনি তারা।
জুরিখের ইসগাসি এলাকার ইসলামি সেন্টারটিকেই মসজিদ হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনতা জানিয়েছে। এখানে আগত মুসল্লিদের বেশির ভাগই সোমালি বলে জানান তারা। মসজিদটিতে নিয়মিত নামাজ পড়তে আসা সোমালি আবুকর আবশিরো বলেন, ‘আমরা এর আগে কখনো কোনো সমস্যার মুখোমুখি হইনি। কোনো একজন এসে বলেনি, কেন তোমরা এখানে এসেছ। কখনোই এ রকম কিছু হয়নি।’
সুইজারল্যান্ডের ইসলামি সংগঠনগুলোর ফেডারেশন জানিয়েছে, আক্রান্ত ইসলামিক সেন্টারটি তাদের সদস্য নয় এবং ঘটনাটির বিষয়ে প্রত্যক্ষভাবে তাদের কিছু জানা নেই। সুইজারল্যান্ডের ৮৩ লাখ বাসিন্দার মধ্যে মাত্র পাঁচ শতাংশ মুসলিম, বাকিদের বেশির ভাগই খ্রিষ্টান।
বার্লিনে ট্রাক হামলা
আসন্ন বড় দিন উপলক্ষে জার্মানির অন্য সব শহরের মতো রাজধানী বার্লিনও ছিল উৎসবমুখর। আনন্দের মাঝেই সোমবার নগরীর ব্রাইটশাইড প্লাৎস স্কয়ারের ক্রিসমাস মার্কেটে ঢুকে পড়ে একটি ঘাতক লরি। স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় মার্কেটটিতে সাধারণ মানুষের ওপর লরি উঠিয়ে দিয়ে এ হামলা চালানো হয়। লরিটির লাইসেন্স প্লেট ছিল পোল্যান্ডের। ওই ঘটনায় ১২ জন নিহত এবং ৪০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন।
হামলার পর শুরুতে জার্মান রাজনীতিবিদেরা একে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে আখ্যা দিতে চাননি। পরে এআরডি টেলিভিশনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থমাস দে মাইজিয়েরে বলেছেন, ‘অনেকগুলো বিষয় মিলে একটি বিষয়কে নির্দেশ করছে।’ এ ঘটনাকে সন্ত্রাসী হামলা বলে সন্দেহ করছেন খোদ জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মারকেলও। এ ঘটনাকে ‘সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করছে দেশটির পুলিশ।
বার্লিন পুলিশ জানিয়েছে, এটি সন্ত্রাসী হামলা ছিল কি না তা জানতে তদন্ত চলছে। প্রাথমিকভাবে একে সন্ত্রাসী হামলা বলে মনে করা হচ্ছে। চালক ইচ্ছে করেই লরিটিকে ক্রিসমাস মার্কেটে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন বলে ধারণা তাদের।
বার্লিন পুলিশের মুখপাত্র উইনফ্রিড ওয়েনজেল বলেছেন, হামলাস্থলের এক মাইল দূরের এলাকা থেকে এক সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। তাকে এখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার পরিচয় প্রকাশ না করা হলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হামলাকারী চালক পাকিস্তান থেকে আসা অভিবাসন প্রত্যাশী। এদিকে ওই লরির পোলিশ মালিক দাবি করেছেন, লরিটি মূল চালকের কাছ থেকে ছিনতাই হয়ে থাকতে পারে। আর পুলিশের ধারণা, একটি নির্মাণ এলাকা থেকে লরিটি চুরি করা হয়ে থাকতে পারে। লরিটি এবং এর চালকের ব্যাপারে আরো বিস্তারিত তদন্ত চলছে।
আঙ্কারায় রাষ্ট্রদূত হত্যা
সোমবার সন্ধ্যায় একটি আর্ট গ্যালারি পরিদর্শন করছিলেন তুরস্কে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কারলভ। হঠাৎই হামলার শিকার হন তিনি। বন্দুকধারীর ওই হামলায় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। হামলায় আরো বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। সিরিয়ায় রুশ বাহিনীর হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে তুরস্কে বিক্ষোভের এক দিন পরই এ হামলা চালানো হয়। হত্যা করা হয় রুশ রাষ্ট্রদূতকে। ‘তুর্কিদের চোখে রাশিয়া’ শিরোনামের প্রদর্শনীতে বক্তব্য দেয়ার সময় কারলভকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। রাষ্ট্রদূতকে গুলি করার পর হামলাকারী অনুষ্ঠানের সব অতিথিকে চলে যাওয়ার সুযোগ দেয়। কারলভকে গুলির পর গ্যালারিতে বন্দুকযুদ্ধ চলে কিছুক্ষণ। হামলায় আহত আরো তিনজনকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুলেমান সয়লু।
পরে তুরস্কে নিয়োজিত রুশ রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কারলভের হত্যাকারীর নাম-পরিচয় প্রকাশ করে সে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা দাবি করেছে, অ্যাডিনে জন্ম নেয়া ২২ বছর বয়সী হত্যাকারীর নাম মেভলুট মার্ট আলটিনটাস। দাঙ্গা পুলিশের হয়ে কাজ করতেন তিনি। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে তারা আলামত সংগ্রহ করেছে। তবে সন্দেহভাজনের উদ্দেশ্য কী হতে পারে, সে ব্যাপারে মন্তব্য করেননি তারা। সুইজারল্যান্ডের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ খ্রিষ্টান। কিন্তু অভিবাসীদের আগমনের কারণে দেশটিতে মুসলিমদের সংখ্যাও বাড়ছে। দেশটিতে মুসলিম বসবাসের হার বেড়ে ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
২০১৩ সাল থেকে আন্দ্রেই কারলভ তুরস্কে রুশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার হত্যাকারী মেভলুট মার্ট আলটিনটাস সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুলায়মান সয়লু বলেন, ‘তিনি ২২ বছর বয়স্ক একজন ব্যক্তি। আড়াই বছর ধরে দাঙ্গা পুলিশের হয়ে কাজ করতেন।’
এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, হামলাকারী একাই ছিল। হামলাকারীকে ‘আমি এখান থেকে জীবিত ফিরব না’ বলতে শুনেছেন তিনি। রাষ্ট্রদূতকে গুলি করার পর হামলাকারী সিরিয়ার আলেপ্পোর পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে হামলাকারীর মৃত্যু হয়েছে। হামলাকারী রুশ রাষ্ট্রদূতকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি চালিয়েছে।
হামলাকারী ‘আল্লাহু আকবর’ ও ‘আলেপ্পোর কথা ভুলে যেও না’ বলে চিৎকার করেছে। হামলার মোটিভ সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে কিছু জানা যায়নি। পুলিশের পরিচয়পত্র দেখিয়ে হামলাকারী গ্যালারিতে প্রবেশ করে বলে শোনা যাচ্ছে। অনুষ্ঠানটির ভিডিওতে দেখা যায়, স্যুট পরিহিত সুদর্শন এক যুবক হাতে রিভলবার নিয়ে চিৎকার করছে। তুরস্কের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আলটিনটাসের জন্ম ১৯৯৪ সালে। মন্ত্রী সয়লু বলেন, পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য অ্যাডিনে জন্ম তার। রুশ রাষ্ট্রদূতকে হত্যার পর নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন তিনি।
একই দিনে তিন হামলার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপজুড়ে। সামাজিক মাধ্যম টুইটারে সেই আতঙ্কের আভাস মিলেছে। স্টেফানি হামিল লিখেছেন, ‘একই দিনে তিন তিনটি হামলার ঘটনা। আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। হামলায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের প্রতি আমার সমবেদনা এবং নিহতদের রূহের শান্তি কামনা করছি।’
আরেক টুইটার ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘যে তোমাকে আশ্রয় দিয়েছে, সেই মানুষদের কিভাবে তুমি হত্যা করো? এটা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিশ্বাসঘাতকতা।’ ফিলিপ মরিস নামের একজন জার্মান টুইটারে লিখেছেন, ‘ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটা ভীত আমি কখনো হইনি।’ হারশিমরাত কওর বার্লিন হামলায় নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। ট্রাকচালক সম্ভাব্য মুসলিম অভিবাসী হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে পল যোসেফ ওয়াটসন নামের একজন লিখেছেন, ‘মারকেলের নীতি এখন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।’ এ জন্য তিনি মারকেলকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন।

Add Comment

Click here to post a comment