অপরাধ/দুর্নীতি জাতীয়

একদিন দেখতে না পারলে সে পাগলের মতো হয়ে যেত, আর এখন…

আমাকে একদিন দেখতে না পারলে সে পাগলের মতো হয়ে যেত। সে আমাকে খুবই ভালোবাসতো। আমার প্রতিটা মুহূর্তের খবর নিতো। যে ছেলেকে ভালোবেসে বিয়ে করলাম আর সে আমার জীবনটাই শেষ করে দিল। যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় শেষ পর্যন্ত সে আমাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে পা ভেঙে দিল। কথাগুলো বলছিলেন রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসনের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী নাহিদনিগার মেঘনা।

তিনি আরো বলেন, মাঝে মাঝে মনে হয় নিজের জীবনটাই শেষ করে দেই। আজ নিজের জীবনের কোনো মায়া নেই। ভালোবেসে বিয়ে করে ভুল করেছি। যৌতুকের কাছে ভালবাসা আজ পরাজিত।

সরেজমিনে রোববার সকালে দেখা যায়, পাঁচদিন ধরে হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বামীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে পা ভাঙা অবস্থায় দ্বিতীয় তলায় ১৪ নং বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছেন।

লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার দক্ষিণ পারুলিয়া গ্রামের মতিয়ার রহমানের মেয়ে নাহিদনিগার মেঘনা (২২) এ প্রতিবেদকের কাছে নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দেওয়ার সময় দুচোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল তার।

পরিবার সুত্রে জানা গেছে, কলেজ জীবন থেকে দুজনের মধ্যে প্রেম। এভাবে কাটে তিন বছর। এক সময় একই উপজেলার উত্তর পারুলিয়া গ্রামের নুরল ইসলামের ছেলে রেজাউল আলম সুজন বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে উঠে। বিয়েতে রাজি না হলে সে আত্মহত্যা করবে বলে চাপ দেয়।

সবার অজান্তে ২০১৩ সালে জানুয়ারিতে পাঁচ লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করে রংপুর নোটারি পাবলিক ক্লাবে গিয়ে বিয়ে করেন তারা। একই বছরের শেষের দিকে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের আওতায় হাতীবান্ধা পাটিকাপাড়া ইউনিয়নে পরিদর্শকের সরকারি চাকরি পান রেজাউল আলম সুজন। চাকরির পর রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেঘলাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন তিনি। পরে পরিবারের চাপে প্রথম বিয়েটা ডিভোর্স করিয়ে নতুন করে দুই লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করে আবার বিয়ে পড়ানো হয় তাদের।

বিয়ের পাঁচদিন না যেতেই মেঘনার উপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। নির্যাতনের পাশাপাশি মেঘনাকে তার বাবার কাছ থেকে যৌতুকের জন্য একটি পালসার মোটরসাইকেল ও ১০ লক্ষ টাকা আনার জন্য চাপ দিতে থাকেন সুজন। গত মঙ্গলবার সকালে সুজন ও মেঘনার মধ্যে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে সুজন লাঠি দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে ডান পা ভেঙে দেন মেঘনার। পরে তাকে পরিবারের লোকজন মঙ্গলবার বিকেলে উদ্ধার করে হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভর্তি করেন।

চিকিৎসাধীন মেঘনার মা আফরোজা বেগম কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, সুজন আমার মেয়ের ভবিষ্যত নষ্ট করে দিয়েছে। এখন যৌতুকের টাকা না পেয়ে নির্যাতন করে মেরে ফেলতে চাইছে।

মেঘনার স্বামী রেজাউল আলম সুজন জানান, আমি তাকে মারধর করিনি। আগে থেকে তার পা ভাঙা ছিল। সংবাদটি পরিবেশন করবেন না বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে। তবে যৌতুক চাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন সুজন।

হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মকর্তা ডা. রমজান আলী জানান, মেঘনার ডান পায়ের হাড়ে ফাঁটল দেখা যাওয়ায় তা প্লাস্টার করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

হাতীবান্ধা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) জাকির হোসেন বলেন, নির্যাতিত মেঘনার স্বামী সুজনসহ পাঁচজনকে আসামি করে মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে।