মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

একজন মেয়র হয়েও আনিসুল হকের নজিরবিহীন যতো কাজ!

সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক। তিনি শুধু মেয়রই ছিলেন না, ছিলেন নগরের অভিভাবক, নগরপিতা। একজন মেয়র হয়েও তিনি যেন ছিলেন সকলের স্বজন, একান্ত প্রিয়জন। পরিচ্ছন্ন, সবুজ, বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন, স্বপ্নের পথ ধরে এগিয়েও চলেছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ যেন সবকিছু থমকে গেলো!

বিভক্ত ঢাকার প্রথম নির্বাচনে ডিএনসিসির মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে আধুনিক ঢাকা গড়ার শপথ নিয়েছিলেন আনিসুল হক। নগরের যেকোন সংকটে রাত নেই, দিন নেই ছুটে গিয়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, এতোসব ছোটাছুটি বাবদ তিনি কখনও সরকারি অর্থ ব্যয় করতেন না। নিজের প্রাপ্ত বেতনও দিয়ে দিতেন কর্মচারীদের!

রোববার নগরভবনে এক সাক্ষাৎকারে সদ্যপ্রয়াত মেয়রের ব্যক্তিগত সহকারী একেএম মিজানুর রহমান জানান, মেয়র নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি আর নিজের গাড়িচালক নিয়েই নগরের কাজে ছোটাছুটি করতেন। আর সেই গাড়ির তেল খরচও তিনি নিজের পকেট থেকেই দিতেন।

নগরপিতার আশ্চর্যজনক কর্মকাণ্ড এখানেই শেষ নয়। মেয়র হিসেবে তিনি যে সরকারি বেতন পেতেন তার পুরোটাই তিনি নগর ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরদের মাঝে বণ্টন করে দিতেন বলেও জানান মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘অফিসের সিকিউরিটির খরচও স্যার মেটাতেন। নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা এনে আমাদের আলাদা ভাতা দিতেন। তাছাড়া আমরা যে নয়জন স্যারের সঙ্গে দিনরাত পরিশ্রম করতাম, স্যার তাদের মধ্যে প্রতি মাসে বেতনের টাকা বণ্টন করে দিতেন।’

প্রয়াত মেয়রের ব্যক্তিগত সহকারী বলেন, ‘স্যার আমাদেরকে সবসময় বলতেন, কারো কাছ থেকে কখনও চার আনা পয়সাও নিবা না। কখনও টাকা লাগলে আমাকে বলবা। এখানে ছয়-সাতজন আর্কিটেক্ট ছিলেন যারা শহর নিয়ে নানা প্ল্যানিং করতেন। কিন্তু সিটি করপোরেশন থেকে তাদের বেতন দেওয়ার বিধান ছিল না। স্যার তাদের বেতনও নিজের মোহাম্মাদী গ্রুপ থেকেই দিতেন।’

মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমি দাবি দিয়ে বলতে পারি, স্যার কোনদিন সিটি করপোরেশনের টাকায় এককাপ চা পর্যন্ত খাননি। তিনি প্রতিমাসে নিজের আপ্যায়নের জন্য আমাদের কাছে টাকা দিয়ে রাখতেন। সেটা দিয়েই স্যারের অতিথিদের আপ্যায়ন করা হতো।’

মেয়র আনিসুল হক যখন যেখানে সমস্যা, সেখানেই তৎক্ষণাৎ সমাধান দিতে ছুটে গেছেন। আর এই নীতিতে চলতে গিয়ে বহুবার বহু বাঁধার সম্মুখীন হয়েছেন। কিন্তু কখনও ভীত হননি, দমে যাননি, পিছিয়ে আসেননি। তিনি নিজে যেমন যেকোন সমস্যায় ছিলেন অবিচলিত, তেমনই সহকর্মীদেরকেও কিছু বুঝতে দেননি। কঠোর পরিশ্রম আর মেধার জোরে তিনি সবক্ষেত্রেই বিজয়ী হয়েছিলেন। কেবল জয় করতে পারেননি মৃত্যুকে। গত বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬৫ বছর বয়সে সবাইকে কাঁদিয়ে পাড়ি দেন না ফেরার দেশে।