মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার মাহে রমজান

ইফতারের নামে প্রতিদিন যে এত খাবার নষ্ট করছি তা কি ধর্মীয় অনুশাসন সমর্থন করে?

রেজানুর রহমান : বিরাট হলঘর। অসংখ্য গোলটেবিলের ওপর থরে থরে ইফতারির প্লেট সাজানো। প্রায় ৭০০ লোকের ইফতারির আয়োজন। শাহি এন্তেজাম। ইফতারির এক ঘণ্টা আগে থেকেই লোকজন আসতে শুরু করেছেন। নির্ধারিত সময়ে শুরু হলো ইফতার। আগেই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে ইফতারের পর মাগরিবের নামাজ শেষে ডিনার অর্থাৎ রাতের খাবার পরিবেশন করা হবে। ঘোষণা শুনেই কি না অনেকে ইফতারির বুট, মুড়ি, ছোলা, পিঁয়াজু, জিলাপি, কলা, তরমুজসহ অন্যান্য খাবারের অর্ধেক ছুঁয়েও দেখলেন না। অনেক খাবার এঁটো হয়ে গেল। হোটেলের কর্মীরা এঁটো খাবারসহই ইফতারির প্লেট নিয়ে গেল। বুফে থেকে রাতের খাবার নিতে হবে। বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, নামাজ শেষ হওয়ার আগেই অনেকে প্লেটভর্তি খাবার নিয়ে গোলটেবিলগুলো দখল করছেন। মনে হলো প্লেটে কে কত খাবার নিতে পারেন তার একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কিন্তু প্লেটের খাবারগুলো খেতে গিয়ে অনেকেই প্রতিযোগিতায় টিকতে পারলেন না। অনেকের প্লেটেই বেশির ভাগ খাবার পড়ে থাকল। আবারও অনেক অনেক খাবার এঁটো করে একে একে হলঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন সবাই।

নীরবে দাঁড়িয়ে আছি হলঘরের একটি কোনায়। পবিত্র রমজান হলো ত্যাগের মাস। কিন্তু এই কী ত্যাগের নমুনা? এভাবে খাবার নষ্ট করাকে কী আমাদের পবিত্র ধর্ম ইসলাম সমর্থন করে? নিশ্চয়ই না। তাহলে আমরা প্রতিদিন সারা দেশে হাজার হাজার ইফতারের অনুষ্ঠানে এভাবে খাবার নষ্ট করছি কেন? পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে আমরা রোজা থাকি বা না থাকি ইফতারির আয়োজন না করলে যেন মান-সম্মান থাকে না। দেশের ছোট-বড় সব রাজনৈতিক দল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সংগঠন, এমনকি পারিবারিক পর্যায়েও ইফতারির আয়োজন করার ক্ষেত্রে একধরনের নেপথ্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। পবিত্র রমজানে সারা দিন রোজা রাখার পর স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও পানীয় পান করা উচিত। কিন্তু ইফতারের নামে আমরা এই যে প্রতিদিন এত খাবার খাচ্ছি, খাবার নষ্ট করছি তা কি ধর্মীয় অনুশাসন সমর্থন করে? পবিত্র রমজান যদি হয় ত্যাগের মাস, সংযমের মাস তাহলে আমরা কি সত্যিকার অর্থে ত্যাগ ও সংযম পালন করছি?

পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ধর্মীয় উৎসবের আগে বিভিন্ন পণ্য ও ব্যবহার্য জিনিসপত্রের দামের ক্ষেত্রে ‘ছাড়’ ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ একটা কিনলে একটা ফ্রি অথবা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেশি কমিশন ঘোষণা করা হয়। আর আমাদের দেশে উৎসব উপলক্ষেই ক্রেতার ওপর আর্থিক চাপ পড়ে বেশি। বিভিন্ন পণ্য ও ব্যবহার্য জিনিসপত্রের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া তো দূরের কথা, কে কিভাবে ক্রেতার কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করে নেবে তার কূটকৌশলে মেতে ওঠে। ঈদ উৎসবে নতুন পোশাকই কেনা হয় বেশি। অথচ এই পোশাক বাজারেই উচ্চমূল্য দাপট দেখায় সব সময়। পাশাপাশি খাবারজাত দ্রব্যের উচ্চমূল্যও অসহায় করে তোলে সাধারণ মানুষকে। তাও যদি ভেজালমুক্ত খাবার পাওয়া যেত, তাহলেও না হয় একটা সান্ত্বনা খোঁজা যেত। চালে ভেজাল, ডালে ভেজাল, তেলে ভেজাল, ডিমে ভেজাল, মাছ, মাংসেও ভেজাল। আর ফলমূলে ভেজাল তো লেগেই আছে। অনুজপ্রতিম সাংবাদিক তুষার আব্দুল্লাহ তাঁর ফেসবুক ওয়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা পোস্ট করেছেন। তিনি লিখেছেন, কারওয়ান বাজারে ফলের সমাহার। ক্রেতার জোগান ভালো। ফলের টসটসে রং দেখে লোভ হলো ফল কেনার। দরদাম করছি। একজন প্রবীণ বিক্রেতা বললেন—নিতে পারেন, তবে পেঁপে ছাড়া সব ওষুধে পাকানো। রাতে কার্বাইড দেওয়া হয়েছে আমে। আনারসে স্পিরিট, লেচুতে রং ও স্পিরিট দুটিই। পেঁপে পেকেছে আগুনের তাপে। তরমুজে রং আর স্যাকারিনের ইনজেকশন। জানতে চাইলাম তাহলে খাব কী? প্রবীণ বললেন, ডাব কিনবেন বুইঝা, ইনজেকশন ডাবেও চলে। জাম খেতেও বারণ করলেন। আবার জানতে চাইলাম, তাহলে খাব না কিছুই? তিনি বললেন, ডেউয়া, বাঙ্গি, ডুমুর খান। আমি ফিরছিলাম পেছন থেকে ডেকে বললেন, ‘ভাতিজা ভাত খাও। ধানের দাম কমছে…’।

ধানের দাম কমেছে এইটা আবার মারাত্মক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। ধান চাষি যে দরে ধান বিক্রি করছে তাতে ধানের উৎপাদনমূল্য তার হাতে আসছে না। এ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় চলছে দেশে। এ প্রসঙ্গ থাক। আমরা বরং পবিত্র রমজানে কৃচ্ছ্র ও সংযম প্রদর্শনের কথায় আসি। আমরা কি বড় বেশি আনুষ্ঠানিকতাপ্রিয় জাতিতে পরিণত হচ্ছি? যখন যা আসে তাই নিয়েই মেতে উঠি। পরে তা বেমালুম ভুলে যাই। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় অতিমাত্রায় তৎপর হয়ে উঠি। বাংলা ভাষা ছাড়া যেন আমার চলবেই না। ফেব্রুয়ারি শেষ, মাতৃভাষার কথা ভুলে যাই। পহেলা বৈশাখে অতিমাত্রায় বাঙালি হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু করি। মাটির থালায় ইলিশ-পান্তা খাই। পহেলা বৈশাখের পরের দিন ইলিশ খাই ঠিকই, তাতে আর মাটির বাসন আর পান্তা থাকে না। কারণ মাটির থালায় গরিবেরা ভাত খায়। তেমনি করে পবিত্র রমজান এলেই আমরা অতিমাত্রায় ধর্মপ্রাণ হয়ে উঠি। নামাজ পড়ি বা না পড়ি, রোজা রাখি বা না রাখি অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতায় জোর কদমে চলার চেষ্টা করি। জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিই। আভিজাত্য ও সম্মান রক্ষার লক্ষ্যে ইফতারির নামে খাবার নষ্ট করি। আর যত পারি অন্যকে ঠকানোর প্রতিযোগিতায় মেতে উঠি। এসব কাজ নিশ্চয়ই আমাদের ধর্মীয় অনুশাসনে মানায় না। তাহলে আমরা অনেকেই তা করছি কেন?

ইদানীং আবার সাহরি খাওয়ার ক্ষেত্রেও ভিন্ন এক সংস্কৃতি চালু হয়েছে। ঢাকার অনেক হোটেলে এক শরও বেশি পদের খাবারের আয়োজন থাকে সাহরির সময়। গভীর রাতে অনেকে দামি গাড়িতে চড়ে বিভিন্ন হোটেলে গিয়ে সাহরির খাবারের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে যান। এক শ পদের খাবার প্লেটে নেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন। কিন্তু প্লেটের সব খাবারই খান না সবাই। উচ্ছিষ্ট, এঁটো পড়ে থাকে অনেক খাবার। এর নাম কি কৃচ্ছ্র সাধন? নাকি সংযম পালন? আমাদের বিবেক কী বলে?

লেখক : কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক-আনন্দ আলো

জুমবাংলানিউজ/এইচএম