মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

অসাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্য সমুন্নত রাখতে হবে-বাহালুল মজনুন চুন্নু

ষোলই ডিসেম্বরে একদিকে বাঙালি পাকিস্তানি স্বৈরাচারদের রাহুগ্রাস থেকে, রুদ্ধবাক অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে খুঁজে পেয়েছিল নব প্রাণের আবেশ; অন্যদিকে বিশ্বের মানচিত্রে একসাগর রক্তের বিনিময়ে দীর্ঘ ৯ মাসের জঠর-যন্ত্রণা শেষে জায়গা করে নিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশ নামের এক নৈসর্গিক ভূখণ্ড তথা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা। মাতৃভূমির পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্তির জন্য মুক্তিপাগল বাঙালি লাখো প্রাণ উৎসর্গের বিনিময়ে বিজয়ের লাল সূর্য ছিনিয়ে এনে উড়িয়ে দিয়েছিল বিজয় পতাকা।

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি পৃথিবীর মানচিত্রে অধিষ্ঠানের মাধ্যমে দূর হয়েছিল ইতিহাসের সেরা এক অসংগতি।যে সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি যখন মিত্রবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সর্বাধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করে নিজের রিভলবার জমা দেন, তখন এ দেশের লাখো শহীদের আত্মাও যেন বলে উঠেছিল, ‘জয় বাংলা’। ওই মুহূর্তটি বাঙালি জাতির জীবনে সবচেয়ে গৌরবের সন্ধিক্ষণ। ওই মুহূর্ত থেকে বাঙালি বুঝেছিল তাদের আর পাকিস্তানিদের নিষ্ঠুর গুলির আঘাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হবে না; পালিয়ে বেড়াতে হবে না একটুখানি নিরাপদ ঠাঁই পাওয়ার আশায়; বাতাসে লাশের গন্ধ সহ্য করতে হবে না;  ড্রেনে মুখ থুবড়ে থাকবে না কোনো ধর্ষিত বোনের বীভৎস দেহ; ডোবায় ভেসে উঠবে না ফুলেফেঁপে থাকা থরে থরে লাশ, একটার ওপর আরেকটা লাশ; শকুনের চিরে খাওয়া পচা-গলা ক্ষতবিক্ষত লাশ। অবশেষে পাকিস্তানি শোষণ-নিপীড়ন আর দুঃশাসনের কুহেলিকা ভেদ করে নিপীড়িত বাঙালি যতি টানতে সক্ষম হয়েছে ২৪ বছরের কৃষ্ণ অধ্যায়ের।

ওই মুহূর্তে প্রতিটি বাঙালি নারী-পুরুষ-শিশু সবার চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক। চিরশত্রুর পদাবনত অবস্থান দেখে স্বজনহারাদের চোখেও ঠাঁই নেই শোকের পরিবর্তে আনন্দাশ্রু। সেই অশ্রু গঙ্গা-যমুনা হয়ে, সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বিশ্ববাসীকে জানান দেয়, আমরা বাঙালি, আমরা অজেয়, আমরা উড়াতে পেরেছি লাল-সবুজের বিজয় কেতন। কারণ আমাদের কাছে মহান নেতা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এক অপরূপ মোহিনী শক্তি আছে এই নামে। আমাদের মনের মুকুরে প্রোথিত হয়ে থাকা এই নামের জাদুই আমাদের সাহস জুগিয়েছে সম্মুখসমরে বীরদর্পে শত্রু বধে ঝাঁপিয়ে পড়তে, তাদের পরাজিত করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে। মিয়ানওয়ালি কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি জাতির পিতার অস্তিত্ব রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের কাছে প্রতি মুহূর্তেই দেদীপ্যমান ছিল মনের কোণে। তাঁর বিদ্রোহের, সংগ্রামের বাণী ও সুর প্রতিনিয়ত অনুরণিত হয়েছিল দেশমাতৃকার তরে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া প্রতিটি সূর্যসন্তানের মনে। অবহেলিত-অপমানিত, নির্যাতিত-বঞ্চিত সেসব  যোদ্ধারা তাঁর দ্রোহের অনির্বাণ শিখায় জ্বলে উঠে বজ্রশপথে থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে নিজপ্রাণ তুচ্ছ করে বীরবিক্রমে লড়াই করে নিয়ে এসেছিল ষোলই ডিসেম্বরের গৌরবোজ্জ্বল মহান বিজয়। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালির জন্য চির শান্তির বার্তা বয়ে আনেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে অত্যাচারের কঠোর আবরণ বিদীর্ণ করে জ্বলে উঠে বাঙালি। তাদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সংগ্রামের তীব্রতায় পাকিস্তানি শাসকরা যখন বুঝছিল যে তাদের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন, তখনই তারা লেলিয়ে দেয় নরপিশাচ হানাদার বাহিনী। এরা রাতের গহিন আঁধারে নিরীহ ঘুমন্ত বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হত্যাযজ্ঞের খেলায় মেতে ওঠে। এদের সহচর হয় এ দেশেরই কিছু কুলাঙ্গার রাজাকার, আলবদর, আলশামস। এদের সম্মিলিত নির্মমতা এতই ভয়াল রূপ ধারণ করে যে পুরো বাংলাদেশই পরিণত হয় এক ভয়ংকর মৃত্যুকূপে। এতে পুরো বিশ্ববাসীই হতবুদ্ধি হয়ে যায়। কিন্তু বাঙালি দমে যায়নি। তারা দমার পাত্রও নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদর্শ ও চেতনাকে বুকে ধারণ করে দেশমাতৃকাকে পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্ত করতে বাঙালি শত গুণ বেগে জ্বলে ওঠে। সম্মুখসমরে কিংবা গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে একের পর এক হানাদার ও তাদের দোসরদের পরাজিত করতে থাকে। এ জন্য বিলিয়ে দিতে হয়েছে লাখো শহীদের প্রাণ।

ভারত বাঙালিকে পরম বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কোটির ওপর শরণার্থীকে তারা যুদ্ধের পুরোটা সময় আশ্রয় দিয়েছিল, ভরণপোষণ দিয়েছিল। অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও অর্থকড়ি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিল তারা। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণের মুখে পর্যুদস্ত ও হতোদ্যম হয়ে পড়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী। পনেরোই ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে পরদিন সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ভারতীয় বিমান আক্রমণ স্থগিত রাখা হয় নিয়াজির অনুরোধে। ষোলই ডিসেম্বর সকালে মেজর জেনারেল নাগরা নিয়াজিকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানালে নিয়াজি রাজি হয়ে যান। লেজ গুটিয়ে পালানোর কোনো উপায়ই যখন খুঁজে পাচ্ছিল না, তখন নাগরার এই আহ্বান তার কাছে ছিল চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো। যাহোক, পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের কথা প্রচার হয়ে যাওয়ায় একের পর এক ট্রাকে করে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকায় প্রবেশ করতে থাকে। সবার মুখে অনাবিল হাসি। বাঙালির সেই সময়ের হাসির সঙ্গে পৃথিবীর আর কোনো মানুষের হাসির তুলনা হতে পারে না। যেই রেসকোর্স ময়দান সকালের দিকে ছিল জনশূন্য, সেই ময়দান বেলা ৩টা বাজতে না বাজতে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে জনাকীর্ণ হয়ে উঠেছিল। ৪টা ৩১ মিনিটে যখন নিয়াজি ৯৩ হাজার সৈন্যসহ আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন তখন কেবল রেসকোর্স ময়দানই নয়, যেন ধরণীজুড়েই শুরু হয় হর্ষধ্বনি। ওই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্ববৃহৎ আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান, যার মধ্য দিয়ে এক স্বাভাবিক সত্য প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত, মানস ও জাতিগত অস্তিত্বকে অস্বীকার করে কেবল ধর্মকে পুঁজি করে কোনো দুটি পৃথক অঞ্চলের একত্রীকরণ ঠিক হতে পারে না, সে সত্যই প্রতিষ্ঠিত হলো ২৬৬ দিনের সেই ভয়াল যুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে।

এই যুদ্ধ বাঙালি জাতির হৃদয়ে একদিকে সর্বস্ব হারানোর বেদনায় সকরুণ সুর তোলে, আবার ত্যাগ ও মহিমায় সমুজ্জ্বলিত করে বাঙালিকে গৌরবান্বিত করে তোলে। এই যুদ্ধজয়ের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজন্ম লালিত স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক চেতনার  সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়েছিল। সে অনুযায়ী বাহাত্তরে সংবিধানও প্রণীত হয়েছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করার কাজও এগিয়ে গিয়েছিল বহুদূর। কিন্তু পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টে তাসের ঘরের মতোই সব কিছু ভেঙে পড়ে জাতির পিতার সপরিবারে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, মানুষকে আবারও অসাম্প্রদায়িক, ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ার স্বপ্নে বিভোর করে। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতায় সেবার তা সম্পন্ন করা না গেলেও এখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে।

ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্তির পথে দেশ। উন্নয়নের ছোঁয়া সর্বত্র। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলার দ্বারপ্রান্তে আজ দেশ তাঁরই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন এ দেশের মাটিতে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের বিচারকার্য সুসম্পন্নকরণ। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধীদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে দেশকে কলঙ্কমুক্ত করতে, লাখো শহীদের আত্মার শান্তির জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশি-বিদেশি নানা প্রতিবন্ধকতা, নানা ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হয়েছে। বিশেষ করে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী আর যুদ্ধপরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী দল বিএনপি জোটবদ্ধ হয়ে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র করে বিচারকে বানচাল করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পারেনি। আজ দেশ কলঙ্কমুক্ত। এতে মননে-চেতনে পাকিস্তানি সেসব রাজনীতিবিদ, মধ্যরাতের বুদ্ধীজীবীরা মনঃকষ্ট পেলেও দমে যায়নি, তারা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে নিত্যনতুন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে দেশে জঙ্গি হামলা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাসহ নানা অশুভ ঘটনা ঘটছে। বর্তমান বাস্তবতায় এদের প্রতিহত করার কোনো বিকল্প নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর জাতির পিতার আদর্শকে বুকে ধারণ করে ঐতিহ্যগতভাবে লড়াকু বাঙালি জাতি আবারও ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই কুচক্রীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে দেশের অসাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্যকে সমুন্নত রাখবে।

লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

Add Comment

Click here to post a comment