মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

‘অনুভব করলাম কারও একটা হাত আমার কোমরে’

রাস্তা ঘাটে, অফিসে আদালতে, স্কুলে-কলেজে, ট্রেনে-বাসে, দোকানে ফুটপাতে, লঞ্চে-জাহাজে, ঘরে-বাইরে, জলে-স্থলে অন্তরীক্ষে সর্বত্র একটি জিনিস ঘটে, সেটি হলো যৌন হেনস্থা। কিন্তু মাদ্রাসায় যখন ধার্মিকেরা ধর্মের কিতাব পড়েন, মসজিদে যখন নামাজ পড়েন, মক্কায় যখন হজ করেন, আমরা ধরে নিই, এসময় মেয়েরা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। কারণ পুরুষেরা আল্লাহ নাম জপছেন, এই সময় তারা নিখাদ সাধু সন্ত।
হজের সময় যখন কাবা শরিফ ঘিরে সাত পাক দিতে থাকে এক সঙ্গে হাজারো মুসলিম নারী-পুরুষ, দেখেছি অনেক কিন্তু একটিবারের জন্যও এই দুর্ভাবনা উদয় হয়নি মনে, যে, যৌন হেনস্থা ঘটতে পারে ওই পবিত্র স্থানে। মুসলমানদের জন্য কাবা শরিফের চেয়ে বড় পবিত্র স্থান তো আর একটিও নেই। মুসলমান পুরুষ, যত নারী-লোভীই হন না কেন, সর্বশক্তি দিয়ে নারী-লোভ তারা দমন করবেন, এমনই নিশ্চয়ই সবাই মনে করেন।

কিন্তু সেদিন পাকিস্তানি মেয়ে সাবিকা খানের অভিযোগ শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন:

‘এশার নামাজ আদায় করার পর আমি তখন কাবা শরিফকে ঘিরে হাঁটছিলাম, মানে তাওয়াফ করছিলাম, লক্ষ করলাম একটা অদ্ভুত ঘটনা। ওটা আমার তৃতীয় তাওয়াফ ছিল, অনুভব করলাম কারও একটা হাত আমার কোমরে। ভাবলাম হয়তো আমার ভুল, হয়তো ওটি কোনও হাত ছিল না। ইগ্নোর করলাম। হাঁটতে শুরু করলাম। তারপর আবার হাতের স্পর্শ অনুভব করলাম কোমরে। ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। ৬ নম্বর তাওয়াফের সময় আরও অবিশ্বাস্য কিছু টের পেলাম। এবার আর কোমরে নয়, আমার নিতম্বে কেউ হাত দিয়েছে। আমি ঠিক বুঝে পেলাম না এটি ইচ্ছাকৃত কিনা। আবারও ইগ্নোর করলাম এবং হাঁটতে লাগলাম ধীরে। ভিড় খুব বেশি। পেছন দিকে দেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। যখন ইয়েমেনি কোণায় পৌঁছলাম, আমার নিতম্ব খামচি দিয়ে ধরেছে একটি হাত। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম, লোকটির হাতটি সজোরে সরিয়ে দিলাম। কিন্তু ভিড়ের কারণে ওই জায়গা থেকে সরে যেতে পারলাম না। ওখানেই  দাঁড়িয়ে রইলাম। যতটুকু সম্ভব পেছনে ফিরলাম, দেখার চেষ্টা করলাম, কী ঘটছে। পেছন ফিরলাম বটে, কিন্তু বুঝে পেলাম না কে এই কাণ্ডটি করেছে। আমার কী যে অপমান লাগছিল। কিছু বলতেও পারছিলাম না কাউকে। আমি চুপ রইলাম। জানি, আমি যদি বলিও ঘটনার কথা, আমার মা ছাড়া কেউ আমাকে বিশ্বাস করবে না, কেউ আমার কথা সিরিয়াসলি নেবেও না। তাই মা’কে বলেছিলাম। হোটেলে পৌঁছে সব কথা খুলে বলেছিলাম মা’কে। আমার মা খুব ভেঙে পড়েছিলেন। তবে ওই দিনের পর থেকে আমাকে আর একলা তাওয়াফ করতে যেতে দেননি।

এটা খুব দুঃখজনক যে পবিত্র স্থানেও মেয়েরা নিরাপদ নয়। পবিত্র স্থানে আমি যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছি, একবার নয়, দু’বার নয়, তিনবার। যখন হজ্বের কথা ভাবি, যৌন হেনস্থার ঘটনাগুলো মনে পড়ে। আমি মনে করি নিজের হেনস্থার কথা, সে যে স্থানেই হোক, প্রকাশ করা উচিত। জানি না আমার মতো অভিজ্ঞতা আর কারও হয়েছে কিনা, তবে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে আমি প্রায়ই খুব মনমরা হয়ে বসে থাকি।’

সাবিকা খানের লেখাটি পড়ার পর আরও কিছু মেয়ে লিখেছেন, তারাও শিকার হয়েছেন যৌন হেনস্থার। একজনের নাম প্রকাশ করতে বড় আপত্তি, তাই তাকে মুতিয়া নামে ডাকছি। মুতিয়া বলেছেন, তিনি বেশ কয়েকবার হজ আর উমরাহ করেছেন। কাবা শরিফের পূর্ব দিকে লাগানো কালো পাথরের দিকে যাওয়ার সময় হেনস্থাটা বেশি হয়েছেন। সেইজন্যই মুতিয়া এবার কালো পাথরের দিকেই যাননি, আর তাওয়াফটা করেছেন সবচেয়ে বাইরের বৃত্তে, যেখানে লোক সবচেয়ে কম।

সাবিকা খানের লেখা পড়ে শিরিন আজমল লিখেছেন, ‘মেয়েরা পৃথিবীর কোথাও নিরাপদ নয়। ২০১০ সালে হজ করতে গিয়ে প্রায় একই রকম অভিজ্ঞতা হয় আমার।’

জি মনির মন্তব্য করেছেন, ‘আমারও একই অভিজ্ঞতা। আমি যখন কাবার দেওয়াল স্পর্শ করতে নিচু হয়েছিলাম, তখনই আমার শরীর ছুঁয়েছে এক লোক। আরেক জন মুখে হেনস্থা করেছে। দু’বারই আমি মোটেও নিরাপদ বোধ করিনি। আল্লাহর ঘরের সামনে কিনা আমাকে হেনস্থা হতে হলো। পবিত্রতম জায়গা মানুষ নামক জানোয়াররাই নষ্ট করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক মেয়ে লিখেছেন, ‘তোমরা একা নও, এই ঘটনা আমার জীবনেও ঘটেছে। একবার নয়, দু’বার। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো অন্য কিছু, কিন্তু দ্বিতীয়বার আবারও ঘটলো। ঘটার পর আমি নব্বই ডিগ্রি পেছন ফিরে দেখতে গিয়েছি, কে করেছে এই কাজ। কী দেখবো, মানুষের স্রোত আমাকে উল্টোদিকে ঠেলে দিচ্ছে, বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার হয়েছিল বটে। আমি শ্বাস নিতে পারছিলাম না। আল্লাহ জানেন কী কষ্ট হয়েছিল ভিড়ের ওই স্রোত থেকে আমার বেরিয়ে আসতে। মনে আছে, শেষ দুই তাওয়াফ সম্পূর্ণ করে বসে যখন নফল নামাজ পড়ছিলাম, তখন টের পেয়েছিলাম, তখনও কাঁপছি আমি, আমার সারা শরীর কাঁপছে।’

ফাতেমা বালুচ লিখেছেন, তারও একই অভিজ্ঞতা। মিকদাদ হোসেন লিখেছেন, ‘পবিত্র জায়গায় যারা হজ করতে গেছেন,   তাদের সবার হৃদয় কি পবিত্র? বেশিরভাগই পাপী এবং দুর্নীতিবাজ। হজে যাওয়ার উদ্দেশ্য পাপ মোচন। হজ থেকে ফিরে আবারও সেই একই খারাপ কাজ করতে  শুরু করেন।’

তাহি নাজাফি লিখেছেন, ‘স্থান বড় ব্যাপার নয়। আসল কথা, তোমার হৃদয়ে আল্লাহ আছেন কিনা সেটা দেখা জরুরি। সাবিকা তুমি একা নও। আরও অনেকেরই তোমার মতো অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। পকেট মারা, যৌন হেনস্থা করা, শরীরে ঝাঁপিয়ে পড়া– এগুলো কত ঘটেছে হারেমে তার ইয়ত্তা নেই।’

মিকদাদ হোসেন ঠিক বলেছেন, মক্কায় যারা হজ করতে যান, তারা সবাই খুব ভালো লোক নন, অনেকেই যান নিজের জমে যাওয়া পাপের জন্য ক্ষমা নিয়ে আসতে। পরকাল বলে যদি কিছু থেকেই থাকে, তাহলে, হজ করলে যেহেতু সব পাপ আল্লাহ ক্ষমা করে দেন, হজ করেই আসেন। হজ করতে যারা মক্কা যান, তারা এই সমাজেরই লোক, যে সমাজে প্রতিনিয়ত মেয়েদের হেনস্থা করা হচ্ছে। হজ যারা করেন, তারা কি অন্য পুরুষদের চেয়ে বেশি ভালো? তারা কি মেয়েদের অন্য পুরুষদের চেয়ে বেশি সম্মান করেন? তার কোনও প্রমাণ মেলেনি। বরং প্রমাণ মিলেছে, তারা আর সব পুরুষের মতই, সুযোগ পেলে মেয়েদের যৌন হেনস্থা করতে ছাড়েন না, এমন কী কাবা ঘরের সামনেও।

এ কথা সত্যি, পাপ মোচন হবে বলেই অনেক পুরুষ হজ বা উমরাহ পালন করতে যান। আজ যদি এমন একটি খবর তারা জানেন, যে হজ বা উমরাহ করলে কারও কোনও পাপ মোচন হবে না, শুধু আল্লাহকে ভালোবেসে যেন হজ বা উমরাহ পালন করে মানুষ। তাহলে, আমার বিশ্বাস হয় না, হজ বা উমরাহ পালন করতে খুব বেশি লোক উৎসাহী হবে।

কোনও একটি কাজ করলে জীবনে করা সব পাপ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে– এরকম ঘোষণা দিলে পাপ মোচন করার জন্য মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়ে ঠিক, কিন্তু পাপ মোচন খুব সহজে করে নিতে পারলে আবারও পাপ করার প্রতিও মানুষের আগ্রহ বাড়ে। কারণ পাপ মোচনের কায়দাটা তো জানা হয়ে যায়। তখন পাপকে অতটা ভয় হয় না।

সমাজে যদি যৌন হেনস্থা না কমে, তাহলে কাবা ঘরের সামনেও কমবে না। বদ পুরুষ এই সমাজে বাস করে, বদ পুরুষই পাপ করে, বদ পুরুষই পাপ থেকে মুক্তি পেতে তীর্থে যায়। এখন এই বদ পুরুষের হাত থেকে মেয়েদের বাঁচাবার উপায় কী? মেয়েরা যারা হজ বা উমরাহ করতে গিয়ে এমন ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা অর্জন করে, মুশকিল হলো, তারা আর কাবা ঘরের চারপাশকে নিজেদের জন্য নিরাপদ জায়গা বলে ভাবছে না।

লেখক: কলামিস্ট

জুমবাংলানিউজ/এসএস