জাতীয় সিলেট

অতঃপর একটি ফোনকল…

মোবাইল ফোনের একটি কল বের করে দিল দেড় বছর আগের একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। যুক্তরাজ্য প্রবাসী আবদুল গফুরকে হত্যা করে লাশ দাফন করা হয়েছিল জৈন্তাপুরে। গতকাল রোববার তার হাড়গোড় উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জগন্নাথপুর পৌরসভার জগন্নাথপুর গ্রামের মৃত মদরিছ আলীর ছেলে আবদুল গফুর ২০১৭ সালের ৮ মে দেশে ফেরেন যুক্তরাজ্য থেকে। ৯ মে সিলেটের দরগা গেইট আবাসিক হোটেল রাজরানীতে ওঠেন। রুম বুক করেই বের হন হোটেল থেকে। এর আগে ওই হোটেল থেকেই দেশে আসার সংবাদ দেন তার এক বন্ধুকে। বন্ধুর সঙ্গে শেষ কথা বলার পর থেকেই নিখোঁজ হন তিনি। অনেক খোঁজাখুঁজি করে তার সন্ধান না পেয়ে ভাগনে লালা মিয়া এ বছরের ২৬ অক্টোবর জগন্নাথপুর থানায় একটি জিডি করেন।

জৈন্তাপুর থানার ওসি হারুনুর রশীদ জানান, যুক্তরাজ্য প্রবাসী আবদুল গফুর ছিলেন কবিরাজ ভক্ত। কোনোভাবে তিনি জৈন্তাপুর দারুস সুন্নাহ্‌ দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক ও সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্রের মসজিদের ইমাম কবিরাজ কুমিল্লার হোমনা উপজেলার দত্তেরকান্দি গ্রামের মৃত আবদুল গফুরের ছেলে আনোয়ার হোসেনের সন্ধান পান। যুক্তরাজ্য থেকে তিনি দেশে আসার পর তার মোবাইল ফোন দিয়ে কল করেন তার এক বন্ধুকে। ওই দিন তার ওই বন্ধুর মেয়ের বিয়ে থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি।

মেয়ের বিয়ে শেষ হওয়ার পর বন্ধুর খোঁজ করেন। এরপর তার কোনো সন্ধান পাননি তার ওই বন্ধু। এরপর জানতে পারেন- যুক্তরাজ্যেও যাননি। এ অবস্থায় পড়ে যান সন্দেহের দোলাচলে। বিষয়টি বন্ধুর ভাগনে লালাকে জানান। লালা মিয়া এ বছরের ২৬ অক্টোবর জগন্নাথপুর থানায় একটি জিডি করেন।

তারা সম্প্রতি আবুল কালামের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে আবদুল গফুরের প্রসঙ্গে জানতে চান। তখন আবুল কালাম তাকে চেনেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। এক পর্যায়ে ওই মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে তারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ওই নম্বরটি সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্রের মসজিদের ইমাম আবুল কালামের। বিষয়টি তারা

জগন্নাথপুর থানার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আবিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেন। একপর্যায়ে গত মঙ্গলবার হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে একদল পুলিশ জৈন্তাপুর থানায় যায়। তারা সেখানে গিয়ে সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্রের অফিস সহায়ক জৈন্তাপুরের ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের মৃত মর্তুজ আলীর ছেলে আবুল কালাম আজাদ, তার জামাতা জৈন্তাপুর দারুস সুন্নাহ দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক কুমিল্লার হোমনা উপজেলার দত্তেরকান্দি গ্রামের মৃত আবদুল গফুরের ছেলে আনোয়ার হোসেন ও জৈন্তাপুর উপজেলার নিজপাট মোকামটিলা গ্রামের মো. ইদ্রিছ আলীর ছেলে মো. জুনাব আলীকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পরপরই পুলিশের কাছে আবদুল গফুরকে খুনের কথা স্বীকার করে তারা।

তাদের দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী উপজেলার উজানীনগর গ্রামের মোকাম টিলা থেকে গতকাল রোববার জেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ক্রিস্টোফার হিমেল রিছিলের উপস্থিতিতে আবদুল গফুরের হাড়গোড় উত্তোলন করা হয়। এ সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান ও বাদী লালা মিয়াসহ নিহতের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। পরে ময়নাতদন্তের জন্য হাড়গোড়গুলো একটি ব্যাগে ভরে পাঠানো হয় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে। এর আগে হোটেল রাজরানী থেকে নিহত আবদুল গফুরের ব্যবহূত জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়। সেগুলো তার বলেই শনাক্ত করেন পরিবারের সদস্যরা।

পুলিশ জানায়, গ্রেফতারকৃত আবুল কালাম ও তার জামাতা আনোয়ার হোসেন মোটা অঙ্কের টাকার লোভে প্রবাসী গফুরকে হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

এ ব্যাপারে জৈন্তাপুর থানার মো. হারুনুর রশীদ জানান, গ্রেফতারকৃতরা অনেক আগেই থানায় পুলিশের সামনে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে। আদালতেও তারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।

এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘প্রায় দেড় বছর পর একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জানা গেছে। টাকা-পয়সার জন্য তারা নির্মমভাবে প্রবাসী আবদুল গফুরকে খুন করে লাশ সেখানেই দাফন করে রেখেছিল।’

জুমবাংলানিউজ/ জিএলজি