জাতীয় পজেটিভ বাংলাদেশ

মাস্ক ফাউন্ডেশন : কৃষিস্বাস্থ্য সুরক্ষার আঁতুরঘর

কিছুদিন আগেও কৃষিস্বাস্থ্য সুরক্ষার ধারণাটি আমাদের কৃষিতে একরকম অবহেলিতই ছিল। বলা চলে- এখনো এবিষয়ে চাষির আগ্রহ বা সচেতনতা এর কোনটিই আমলে নেই। ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক প্রয়োগের সময়ও যেখানে নেওয়া হয় না কোন ব্যক্তিগত সুরক্ষাকারী ব্যবস্থা। সেখানে চাষীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে কাজ করছে মাস্ক ফাউন্ডেশন নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। বিস্তারিত জানাচ্ছেন সাইয়েদুল বাশার মাসুদ।

শুরুর কথা
তখন ছিল ২০০৮ সাল। শুরুর পথ ও প্রাপ্তি বলতে জুটেছিল কেবলই হাসি ঠাট্টা আর ব্যাঙ্গ বিদ্রূপ। তাতে দমে যাওয়ার পাত্র নন কৃষিবিদ মো হামিদুল ইসলাম। সংগঠিত করেছেন চাষিদের, বুঝিয়েছেন স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা, দিয়েছেন ফ্রি মাস্ক। সদস্য হয়েছেন অনেকে, অনেকে বেরিয়েও গেছেন। আস্তে আস্তে এক দুই করতে করতে আজ কৃষিবিদ, ডাক্তার, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, ব্যাংকার, সাংবাদিক, ডিপ্লোমা কৃষিবিদসহ অনেকেই এই মাস্ক ফাউন্ডেশনের সদস্য।

ফ্রি মাস্ক বিতরণ
মূলত ফ্রি মাস্ক বিতরণ কার্যক্রমের মধ্যদিয়ে শুরু হয় মাস্ক ফাউন্ডেশনের পথচলা। গোড়ার দিকে ধুলাবালি নিয়ে সবার মাঝে স্বাস্থ্য সচেতনতা ছড়িয়ে দিলেও বর্তমানে কৃষিতে স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ সকল কাজে মাস্ক ও অন্যান্য ব্যক্তিগত সুরক্ষাকারী উপাদান সুনিশ্চিত করতে কাজ করছে এই স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানটি। প্রাপ্ত সূত্রমতে, এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মসূচীর আওতায় সরসরি মাঠে কাজ করেন এমন চাষী ও পথচারীদের মাঝে প্রায় লক্ষাধিক মাস্ক বিতরণ করেছে মাস্ক ফাউন্ডেশন।

মাস্ক বুথ
ফাউন্ডেশনের নিজস্ব তদারকিতে ফ্রি মাস্ক বিতরণের পাশাপাশি গড়ে ওঠে মাস্ক বুথ। আমাদের দেশের চাষিরা মাস্ক ব্যবহারের সাথে তেমনতরো পরিচিত কিংবা সচেতন কোনটিই নয়। তাই ফ্রি মাস্ক হাতের নাগালে ‘যখনি প্রয়োজন তখনি’ পাওয়ার লক্ষ্যে মাস্ক বুথের এই সহজ ব্যবস্থা চালু হয় এবং বিভিন্ন ফার্ম মিটিং ও মাস্ক ব্রিফিং প্রোগ্রামে চাষীদের নিকটস্থ মাস্ক বুথের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করা হয়।

ফার্ম মিটিং 
চাষী পর্যায়ে মাস্ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে এ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক ফার্ম মিটিং বা উঠান বৈঠক করেছে মাস্ক ফাউন্ডেশন যেখানে চাষীরা ধুলাবালিতে মাস্কের ব্যবহার এবং কীটনাশক প্রয়োগের সময় মাস্কসহ অন্যান্য ব্যক্তিগত সুরক্ষাকারী উপাদান যেমন- গ্লাভস, গগলস, ফেসশিল্ড, অ্যাপ্রোন, গামবুট ইত্যাদির আবশ্যিক প্রয়োজনীয়তা ও ব্যবহার সম্পর্কে সহজেই জানতে পারেন। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো- উঠান বৈঠকের মাধ্যমে চাষীরা মাস্ক ফাউন্ডেশনের সাথে সরাসরি মিলিত হন, সমাধান পান চাষ সংক্রান্ত স্বাস্থ্য সমস্যার।

মাস্ক ব্রিফিং
মাস্ক ব্রিফিং একটি নিয়মিত অনানুষ্ঠানিক কর্মসূচী যেখানে মাস্কের আদ্যোপান্ত সকল শ্রেণীর মানুষকে সব সময় ব্রিফ করে এবং মাস্কের ব্যবহার, বিভিন্ন ধরণের মাস্কের পরিচিতি, প্রাপ্তিস্থান, মাস্কের বিকল্প ব্যবহার, দূষিত কণার পরিচিতি, উপস্থিতি, স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ এবং প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে সকলে জানতে পারেন। জানতে পারেন মাস্ক ফাউন্ডেশনের নানামুখী কার্যক্রম সম্পর্কে।

মাস্ক সেমিনার
মাস্ক ফাউন্ডেশন বিভিন্ন কর্পোরেট সেশনে ব্যক্তিগত সুরক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে মাস্ক সেমিনারের আয়োজন করে। বিভিন্ন ক্লাব, আইপিএম ক্লাব, স্কুল, কলেজ এবং সরকারি বেসরকারি সংস্থায় মাস্ক সেমিনারের মাধ্যমে মাস্কের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যবহার তুলে ধরে এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষায় অন্যান্য উপাদানের পরিচিতি এবং সহজ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আলোচনা করে এই ফাউন্ডেশন।

মাস্ক মিউজিয়াম
সবার মাঝে মাস্ক বিষয়ে ব্যাপক সচেতনতা ও আগ্রহ বাড়াতে স্থাপন করেছে মাস্ক মিউজিয়াম। এখানে রাখা আছে বিভিন্ন রকমারি মাস্ক যা দেখে মাস্ক ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন অনেকেই।

হরি এখন মাস্ক হরি
কয়েকবছর আগেও হরিদাস জানতো না মাস্ক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু। মাস্ক বিক্রি করতো ঠিকই কিন্তু সামান্য একটি মাস্ক কখনো কখনো জীবন রক্ষাকারী উপাদান হিসেবে কাজ করে তা মাস্ক ফাউন্ডেশনের ব্রিফিং থেকেই জানতে পারেন। মাস্ক বিক্রেতা হরিদাস এখন শুধুই একজন হরি নয়, ‘হরি এখন মাস্ক হরি’ হিসেবেই অধিক পরিচিত। এরকম অনেকেই ‘মাস্ক হরি’তে নাম লিখিয়েছেন।

একজন ডাঃ সেলিনা আকতার
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ধুলাবালি ও অন্যান্য পার্টিকেল ম্যাটারের বিপরীতে মাস্ককে প্রতিরোধী ব্যবস্থা হিসেবে প্রেসক্রাইব করেন ডাঃ সেলিনা আকতার। ধুলাবালি ও অন্যান্য সুক্ষ্মকণার প্রভাবে মূলত শারীরিক স্বাস্থ্যসমস্যা বা ফিজিক্যাল ডিজঅর্ডার দেখা দেয়। বায়ুবাহিত রোগ যেমন- সর্দি, কাশি, কফ, অ্যাজমা, অ্যালার্জি, ব্রংকাইটিস, নিউমোনিয়া, ফুসফুসের আলসার, ক্যানসার ইত্যাদি থেকে পরিত্রাণের সহজ উপায় খুঁজতে মাস্ক ব্যবহার করাকে তিনি মনে প্রাণে ধারণ করেন, কাজ করেন মাস্ক ফাউন্ডেশনের একজন নিবেদিত মানুষ হিসেবে। তার স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রাইম মেডিকেল কলেজের লেকচারার ডাঃ হাবিবা সুলতানাও মাস্কের ব্যাপক ব্যবহার ও প্রচারণা শুরু করেছেন।

ওয়েবসাইটে মাস্ক ফাউন্ডেশন
এখন যে কেউ পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকে www.maskfoundation.com এ একটি ক্লিক করলেই পেয়ে যান মাস্ক সচেতনতার প্রয়োজনীয় তথ্য আর যুক্ত হতে পারেন মাস্ক ফাউন্ডেশনের সাথে।

এমএসএফসি
মাস্ক ফাউন্ডেশন পরিচালিত এমএসএফসি হলো মাস্ক সেফটি ফার্স্ট ক্লাব যেখানে মাস্কের ব্যবহার বিধি নিয়ে মুক্ত আলোচনা করা হয়। তাছাড়া খাতা কলমে মাস্ক লেকচার ক্লাস নেওয়া, মাস্ক বিষয়ক লেখালেখির বিভিন্ন পত্রিকা সরবরাহ এবং দক্ষতা বাড়াতে ব্যক্তিগত সুরক্ষা গ্রহণের বিভিন্ন কৌশল ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে ল্যাপটপে দেখানো হয়। ফার্মারস অ্যাওয়ার্নেস বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে এখানকার সদস্যরা নিয়মিত টিমওয়ার্ক করেন। ক্লাবের প্রত্যেক সদস্যদের সঞ্চয়মুখী করতে প্রতি সেশনে প্রাইজবন্ড উপহার দেওয়া হয়। চাষীদের নিয়ে চলে মাস্ক কাউন্সেলিং। তাছাড়া কীটনাশক প্রয়োগের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কৃষিকাজে ব্যক্তিগত সুরক্ষাকারী অন্যান্য উপাদান যেমন- গ্লাভস, গগলস, অ্যাপ্রোন, গামবুট ইত্যাদি উপাদানের ব্যবহার বিধির উপর ফার্মারস ট্রেনিং করানো হয়।

পিপিএস
পিপিএস বা প্রোটেকটিভ পলিথিন সিস্টেম হলো চাষির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মাস্ক ফাউন্ডেশনের একটি বিস্ময়কর অবদান যা কৃষিবিদ মো হামিদুল ইসলাম উদ্ভাবন করেছেন। উন্নত বিশ্বে কৃষিতে স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কৃষিকর্মীদের বিনামূল্যে ব্যক্তিগত সুরক্ষাকারী উপাদান বা পিপিই সরবরাহ করা হয়। এসব পিপিই টিকসই এবং অতি উচ্চমূল্যে বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। সেখানে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে পিপিএস পদ্ধতিতে একজন চাষি মাত্র ১০-১২ টাকা মূল্যে নিজেকে সুরক্ষিত করে কীটনাশকের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ সারতে পারেন নিশ্চিন্তে ।

ভাষার আশা
বাংলাভাষাকে সম্মান দেখিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি এখন জাতিসংঘ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য এটা পরম গৌরবের- রক্ত শানিত ৫২’র অসীম অর্জন। মাস্ক ফাউন্ডেশন এবার বাংলাভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে দেখার আশা নিয়ে ‘বাংলা হোক সার্বজনীন ভাষা’ এই দাবীতে সেমিনার করেছে। এই দাবী মাস্ক সচেতনতার পাশাপাশি সকলকে ভাষা সচেতন করবার আর একটি বড় প্রয়াস।

বলে বিষমুক্তের কথা
মাস্ক ফাউন্ডেশন শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সুরক্ষা সুনিশ্চিতের কথাই বলে না- চাষীদের বিষমুক্ত থাকবার কথাও বলে। আর বিষমুক্ত থাকবার পূর্বশর্ত হলো বিষের ব্যবহার কমিয়ে আনা, বিষ বা কীটনাশক এড়িয়ে চলা, সর্বোপরি জৈব বালাইনাশক গ্রহণ করা। কৃষিতে জৈব বালাইনাশক এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা আইপিএম চর্চা যতো বাড়বে, স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও ততো সহজতর হবে। তাই চাষীদের মাঝে মাস্ক এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত সুরক্ষাকারী উপাদান নিশ্চিত করবার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনেও কারিগরি প্রশিক্ষণের উপর জোর গুরুত্ব দিয়ে চলেছে মাস্ক ফাউন্ডেশন।

স্বপ্ন বুননে কৃষিস্বাস্থ্য ক্লিনিক
চাষীর সুস্বাস্থ্যের প্রশ্নে ফ্রি ‘কৃষিস্বাস্থ্য ক্লিনিক’ পরিচালনার ভবিতব্য স্বপ্ন বুনে চলে মাস্ক ফাউন্ডেশন। এই কৃষিস্বাস্থ্য ক্লিনিক হবে চাষির ফার্ম হাউজ সংলগ্ন। চাষীদের ঝু্ঁকিপূর্ণ কাজের সময় সুরক্ষার কৌশল নিয়ে আলোচনা, প্রশিক্ষণ এবং চিকিৎসার যাবতীয় আধুনিক সুযোগ সুবিধা থাকবে এই বিশেষ ক্লিনিকে।

প্রত্যাশা যখন কৃষিস্বাস্থ্য
কৃষিস্বাস্থ্যকে ন্যাশনাল কারিকুলামে আবশ্যিক পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্তি দেখতে চান ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কৃষিবিদ মো. হামিদুল ইসলাম। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কৃষি-স্বাস্থ্য বিভাগ’ খোলার মাধ্যমে কৃষি-স্বাস্থ্যে উচ্চতর শিক্ষার দিক উন্মোচিত হবে, মাঠ পর্যায়ে তাদের সরকারি কর্ম কমিশনে নিয়োগ হবে এবং বৃহত্তর স্বার্থে কৃষি ও কৃষকের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে- এই তার প্রত্যাশা আর এই স্বপ্নেই এগিয়ে চলা।

মিলেছে পুরস্কার
কৃষি-স্বাস্থ্যে বিশেষ অবদান রাখায় ফাউন্ডেশনটির চেয়ারম্যান কৃষিবিদ মো হামিদুল ইসলামকে দেওয়া হয়েছে ‘হাসি সম্মাননা স্মারক -২০১৭। সম্প্রতি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিউম্যান অ্যাকটিভিটিজ অন সোস্যাল ইনিশিয়েটিভ বা হাসি নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাকে এই সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত করে।

শেষকথা শেষ নয়
মাস্ক ফাউন্ডেশন যদিও মাস্ক নিয়ে কাজ করে তথাপি মাস্ক নিয়ে কাজ করাটাই যেন এর শেষকথা নয়। প্রত্যেক মানুষের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সুনিশ্চিত করবার লক্ষ্যে এগিয়ে চলছে স্বেচ্ছাসেবী এই প্রতিষ্ঠানটি। কৃষিতে চাষীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কমপ্লিট সল্যুশনস দিতে চায় মাস্ক ফাউন্ডেশন- সেই লক্ষ্যে কাজও চলছে পুরোদমে।