মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

প্রাইভেট-টিউশনি ও সহায়ক বই কি বৈধতা পাচ্ছে?-ড. সুলতান মাহমুদ রানা

আমরা জানি, এরই মধ্যে শিক্ষা আইন-২০১৬ প্রণয়নের উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সরকার। গত এপ্রিলে জনসাধারণের মতামতের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খসড়া শিক্ষা আইনে বর্ণিত বিধানাবলি দেখে অনেকটা আশার সঞ্চার হয়েছিল।

কিন্তু উপরোল্লিখিত প্রতিবেদনটি পড়ে শিক্ষা আইন-২০১৬ নিয়ে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ শিক্ষা আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর যে কয়টি বিষয়ে আন্দোলন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, সেগুলোর বিষয়ে নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আর এ কারণেই শিক্ষা আইন পাস হবে কি না এমন আশঙ্কার চেয়ে শিক্ষা আইন পাস হলেও আইনে উল্লিখিত ধারাগুলো যথাযথভাবে কার্যকর হবে কি না কিংবা যথাযথ কার্যকর আইন পাওয়া যাবে কি না সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। উল্লেখ্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এরই মধ্যে খসড়াটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে।

দীর্ঘদিন থেকে কেন প্রাইভেট-টিউশনি ও কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে এবং কিভাবে করতে হবে তা নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কিন্তু এবার আইন অনুযায়ী বৈধতা পেতে যাচ্ছে কোচিং-টিউশনি ও সহায়ক বই। এর আগে অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কক্ষ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে কোচিং বাণিজ্যের লাইসেন্স পেয়েছে সংশ্লিষ্টরা। সারা দেশে যখন কোচিং বন্ধের তোড়জোড় শুরু হয়, তখনই ভাড়া বাসায় কোচিং বন্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করলে প্রকারান্তরে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কক্ষ ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে রমরমা কোচিং বাণিজ্য শুরু হয়েছিল। যা এখন আরো ব্যাপকতা পেয়েছে। কিন্তু শিক্ষা আইনের চূড়ান্ত খসড়ায় কোচিং-প্রাইভেট বন্ধ না করে প্রাইভেট টিউশনসহ ছায়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির জন্য সরকার আলাদা নীতিমালা বা বিধি প্রণয়ন করবে। ছায়া শিক্ষা বলতে সরকারি বা স্বীকৃতি পাওয়া বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে কোনো ব্যক্তি বা শিক্ষকের উদ্যোগে একাধিক শিক্ষার্থীকে কোনো প্রতিষ্ঠানে বা কোনো নির্দিষ্ট স্থানে অর্থের বিনিময়ে পাঠদান কার্যক্রমকে বোঝাবে। আর এ বিধানটি কার্যকর হলে কারো বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে এটি মূলত শিক্ষা আইনের মাধ্যমে কোচিং বাণিজ্য পুরোপুরি বৈধতা পেয়ে যাবে।

এর আগে নানাবিধ নির্দেশনা ও সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও কোচিং বাণিজ্য বন্ধ না হওয়ার পেছনের প্রথম ও প্রধান কারণ ছিল বিদ্যমান নীতিমালা ও নির্দেশনার দুর্বলতা কিংবা তা বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা।

রমরমা কোচিং বাণিজ্য বন্ধে ২০১২ সালের ২০ জুন কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নীতিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নীতিমালায় বলা হয়, সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নিজ প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। তবে তাঁরা নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধানের অনুমতি সাপেক্ষে অন্য স্কুল, কলেজ ও সমমানের প্রতিষ্ঠানে দিনে সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে নিজ বাসায় পড়াতে পারবেন। কোনো কোচিং সেন্টারের নামে বাসা ভাড়া নিয়ে কোচিং বাণিজ্য পরিচালনা করা যাবে না। বাস্তবে এ ধরনের নির্দেশনা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এগুলো প্রকৃতপক্ষে অবাধে কোচিং বাণিজ্য করার জন্য শিক্ষকদের লাইসেন্স প্রদান করা। কারণ প্রতিষ্ঠানপ্রধানের অনুমতি সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক রমরমা কোচিং বাণিজ্যের সুযোগ পেয়ে যান। তবে সরকার যেখানে বারবার নির্দেশনা ও নীতিমালা জারি করে কোচিং বাণিজ্য নিয়ে নির্বাক হয়ে গেছে, সেখানে এমন ক্ষুদ্র পরিসরে প্রাইভেট টিউশনির ঘটনা নিয়ে অবাক হওয়ার কোনো অবকাশ নেই।

জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়নের পর আমরা অনেকেই ভেবেছিলাম যে শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটবে। স্বাভাবিকভাইে মনে করেছিলাম গাইড বই থাকবে না, কোচিং থাকবে না। শিক্ষায় যথাযথ সৃজনশীলতা আসবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এখন গোটা শিক্ষাব্যবস্থাই অনেকটা কোচিং কিংবা প্রাইভেটনির্ভর হয়ে উঠেছে। ভর্তি কোচিং থেকে শুরু করে নানাবিধ কোচিংয়ের সাইনবোর্ড রাস্তার ধারে ঝুলতে দেখি। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ শুনি, কিছু শিক্ষক শ্রেণিকক্ষেও গাইড বই কেনার নির্দেশনা দিয়ে থাকেন শিক্ষার্থীদের। এমনকি কাউকে কাউকে প্রকাশকের কাছ থেকে কমিশন নিয়ে ক্লাসে গাইড বইয়ের বিজ্ঞাপন করার কথাও শুনে থাকি।

শিক্ষা আইন-২০১৬ প্রণয়নের লক্ষ্যে গত এপ্রিল মাসে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৩০০ মতামত পায় মন্ত্রণালয়। বেশির ভাগ মতামত কোচিং ও গাইড বই বন্ধের সুপারিশ। ওই সময় ওয়েবসাইটে প্রচারিত খসড়া আইনের ৫৪(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকার প্রাইভেট টিউশনি ও কোচিং বন্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে। ’ এবং ৫৪ (৪) ধারায় এ জন্য দণ্ডেরও উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু চূড়ান্ত খসড়া আইনে প্রাইভেট-টিউশনির বৈধতার পাশাপাশি কোনো প্রকাশক বা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি কেবল সহায়ক পুস্তক বা ডিজিটাল শিখন-শেখানো সামগ্রী প্রকাশ করতে পারবেন মর্মে একটি বিধান রাখার তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। প্রথম দিকে কোচিং ও গাইড বই বন্ধের অন্যতম পদক্ষেপ হিসেবে শিক্ষা আইন-২০১৬ প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে ধরে নিলেও বাস্তবে তা শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন আইনে ভালো কিছু নির্দেশনা কিংবা কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও কিছু দুর্বলতায় তা কার্যকারিতার সংকটে পড়ে। বাংলাদেশে এ রকম বহু আইন আছে, যেগুলোর কার্যকারিতা তো দূরের কথা, আইন লঙ্ঘনের ঘটনা নাকের ডগায় এসে ঘুরলেও তার প্রতিকার কিংবা প্রতিরোধ কোনোটি পাওয়া যায় না। আমরা প্রায়ই লক্ষ করে থাকি, সময়ে-অসময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড। সেগুলোর যথাযথ বিচার দেশের ফৌজদারি আইনে করা সম্ভব হলেও তা অনেক ক্ষেত্রেই হয় না। আমাদের দেশে নানাবিধ কোচিং বাণিজ্য রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে সরাসরি সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষক, পুলিশ অফিসার, ডাক্তারসহ সমাজের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি জড়িত থাকেন। আর সরকারি কর্মকর্তাদের কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়টি কতটুকু যুক্তিযুক্ত, তা বিবেচনায় রেখে প্রাইভেট-টিউশনি ও সহায়ক বই প্রকাশসংক্রান্ত যথাযথ বিধান শিক্ষা আইনে লিপিবদ্ধ হওয়া উচিত।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

sultanmahmud.rana@gmail.com

Add Comment

Click here to post a comment