মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

অনুমতি ছাড়া বিএনপি কি রাজনীতিও করবে না?-কাজী সিরাজ

কাজী সিরাজ

দেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ সংকুচিত করে কারোরই কোনো লাভ হয় না। অন্যের পথ আটকে দিয়ে নিজের পথ সাময়িক সুগম রাখা যায়, কিন্তু দীর্ঘদিন তা সম্ভব হয় নয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতি হচ্ছে সমন্বয়, সমঝোতার রাজনীতি। অন্যের অধিকার নিশ্চিত থাকলেই নিজের অধিকার ভোগে কোনো অন্তরায় সৃষ্টি হয় না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-সমাজে বহুমত, বহুপথ থাকবেই। এই বহু মত-পথের পাশাপাশি চলা বা সহাবস্থান গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য বিনাশ করলে বিনাশ হয় গণতন্ত্র।  গণতন্ত্র বিনাশ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বহুত্ববাদী সমাজ ও রাষ্ট্র।

বিএনপি ৭ নভেম্বর উপলক্ষে জনসভা করতে চেয়েছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। তারা অনুমতি পায়নি। মাত্র ক’দিন আগেই সেখানে ২০তম জাতীয় কাউন্সিল করেছে আওয়ামী লীগ। তাদের অনুমতি ঘরে পৌঁছে দিয়ে এসেছে পুলিশ প্রশাসন। সরকারি দল বলে কথা! শুধু তাই নয়, অফিসিয়ালি ১০ হাজার পুলিশ-র‌্যাব সদস্য দুই দিনব্যাপী সে কাউন্সিল পাহারা দিয়েছে। এর বাইরেও সাদা পোশাকে ছিল অনেক। রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে আরও যেসব সুবিধা ভোগ করা যায় সব সুযোগই নিয়েছে তারা। অথচ বিএনপিকে সেখানে সমাবেশ করতে দেওয়া হলো না। যে অজুহাতে বিএনপির অনুমতি প্রার্থনা বাতিল করা হয়েছে, তা আমলে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। আরও কয়েকটি সংগঠন একই দিন একই স্থানে সমাবেশ করার অনুমতি চেয়েছে বলে কাউকেই অনুমতি না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে ডিএমপির পক্ষ থেকে। এটি যে খোঁড়া একটি অজুহাত হিসেবে দাঁড় করা হয়েছে তা না বোঝার মতো নির্বোধ আর এখন নেই এ দেশের মানুষ। প্রথমত, বিএনপি আগে অনুমতি চেয়েছে। প্রায়োরিটি তাদের। অন্য যারা অনুমতি চেয়েছে তারা সবাই সরকার সমর্থক বা সরকারের অনুগত সংগঠন। বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, বিএনপিকে সমাবেশ করতে না দেওয়ার গ্রাউন্ড তৈরি করার জন্য নাটকটি সাজানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিএনপি তাদের নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করার অনুমতিও চেয়েছে বিকল্প হিসেবে। সেখানে কিন্তু অন্য কোনো সংগঠন একই দিন সমাবেশ করার অনুমতি চায়নি। তাও দেওয়া হলো না কেন? তৃতীয়ত বলা হয়েছে, বিএনপি দিবসটি পালন করতে চেয়েছে ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে। তারা বরাবরই এই নামেই দিবসটিকে গৌরবান্বিত করে উদযাপন করে। অপরদিকে সরকারপক্ষ দিবসটি পালন করে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে। বলা হয়েছে, দিবসটি বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করতে দেওয়া হবে না। এটা সরকারদলীয় তরফের কথা। দিবসটি কে বা কোন দল কীভাবে পালন করবে তা নিজ নিজ দলের রাজনৈতিক মূল্যায়নের বিষয়। ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারা এর ভিন্ন মূল্যায়ন করতেই পারে। জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ দিবসটি কীভাবে গ্রহণ বা বিবেচনা করছে সেটাই বড় কথা। ৭ নভেম্বরের তিনটি পক্ষ আছে ১. বিএনপি এবং বিএনপি সংশ্লিষ্ট পক্ষ ২. সরকার ও সরকারদলীয় পক্ষ ৩. জাসদ ও তাদের সমর্থক পক্ষ। জাসদ দিবসটি সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দিবস হিসেবে পালন করে। খণ্ডিত এক টুকরা জাসদের নেতা হাসানুল হক ইনু মন্ত্রী থাকলেও দিবসটির মূল্যায়নে শাসক দল আওয়ামী লীগ, এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও একমত নন। তারা একে ‘মুক্তিযোদ্ধা-সৈনিক হত্যা দিবস’ মনে করেন না। এক্ষেত্রে বিএনপির সঙ্গে তাদের একটা মিল আছে। এটা সত্য যে, ৭ নভেম্বর বিএনপির জন্য আশীর্বাদ। সেদিনের অভ্যুত্থানটি সংঘটিত না হলে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার রাজনীতিতে বিস্ময়কর উত্থান হতো না, বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটিরও জন্ম হতো না। ৭ নভেম্বরের একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অবশ্য আছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে (বিদেশে থাকায় দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেঁচে যান) হত্যার পর খোন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রীদের নিয়েই (সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, আবদুস সামাদ আজাদসহ হাতেগোনা ক’জন বাদ দিয়ে) নতুন সরকার গঠিত হলেও কার্যত শাসন ক্ষমতার মূল ছড়ি ঘোরাতো অভ্যুত্থানকারী ফারুক-রশিদের নেতৃত্বাধীন ‘মেজর’ গ্রুপ। তারা ক্যান্টনমেন্টে যেত না। বঙ্গভবনেই তারা ঘাঁটি গেড়েছিল। এটা সেনা শৃঙ্খলাবিরোধী। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ তার কিছু অনুগামী নিয়ে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর একটি অভ্যুত্থান ঘটান। ক্ষমতা সংহত করার লক্ষ্যে বঙ্গভবনে নানা দেন-দরবারে ব্যস্ত থাকেন তিনি এবং তার সঙ্গীরা। মেজর গ্রুপের সঙ্গে একটা আপসরফা করেন খালেদ মোশাররফ। তিনি মেজর গ্রুপকে ‘সেফ এক্সিট’ দিয়ে দেশের বাইরে লিবিয়ায় পাঠিয়ে দেন। ৬ নভেম্বর তিনি খোন্দকার মোশতাককে হটিয়ে বিচারপতি সায়েমকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণের বন্দোবস্ত করেন। মোশতাক জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করলেও তিনি সেনাবাহিনীতে ছিলেন কার্যত তৃতীয় ব্যক্তি। তার ওপর ছিলেন প্রেসিডেন্টের সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল ওসমানী এবং তিন বাহিনী সমন্বয়ে গঠিত কমান্ডের সর্বোচ্চ কর্তা মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান। ব্রিগেডিয়ার খালেদ যখন বঙ্গভবনে তার ক্ষমতা সংহতকরণে ব্যস্ত ছিলেন, তখন তার মূল কনস্টিটিউয়েন্সি সেনানিবাসে শুরু হয়ে যায় তাকে উত্খাতের গোপন প্রচেষ্টা। জিয়া তখন খালেদের হাতে বন্দী। ২ নভেম্বর গভীর রাতে খালেদের অভ্যুত্থান স্ট্র্যাটেজির অংশ হিসেবে ওই রাতেই তাকে বন্দী করা হয় তার বাসভবনে। খালেদের ভাগ্য মূলত নির্ধারিত হয়ে যায় ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বরের একটি মিছিলে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হয়ে মিছিলটি শেষ হয় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। মিছিলে নেতৃত্ব দেন খালেদ মোশাররফের মা, তার ভাই লীগ নেতা রাশেদ মোশাররফ এবং বেগম মতিয়া চৌধুরী। সেনানিবাসে তখন তত্পর কর্নেল (অব.) তাহের পরিচালিত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা, জাসদের গণবাহিনী। তারা ঘটনাটি ব্যবহার করে ষোলআনা। মুহূর্তে সেনানিবাসের ভিতরে-বাইরে বিদ্যুত্গতিতে ছড়িয়ে পড়ে যে খালেদ ভারতের পক্ষে ও ইন্ধনে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। ব্যস! ৬ তারিখ সন্ধ্যা থেকেই পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। জাসদের গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সর্বনাশা এক স্লোগান তোলে যে, ‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই, সুবেদার মেজরের ওপর অফিসার নাই।’ শুরু হয় সেনা অফিসার হত্যা অভিযান। সে রাতেই খুন হন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা ও কর্নেল হায়দার। এরা ছিলেন খালেদের সঙ্গী। এ ছাড়াও নিহত হন মেজর আনোয়ার, লে. কর্নেল আজিম, মেজর মহিউদ্দিন, ক্যাপ্টেন খালেক, ক্যাপ্টেন আনোয়ার, লে. সিকান্দার, লে. মুস্তাফিজ, কর্নেল ওসমানের স্ত্রী, কর্নেল মুজিবের স্ত্রী মেজর চেরী, মেজর করিম এবং বিটিভির অফিসার মনিরুজ্জামান।

এই হত্যাকাণ্ডই শাসকদল আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধা-সৈনিক হত্যাকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করছে এবং দিবসটির মূল্যায়নও করছে সেভাবে। জাসদ জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে, তাকে ব্যবহার করে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিল। বিচক্ষণ সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান কর্নেল তাহের আর জাসদের পাতা ফাঁদে পা দেননি। ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান সংঘটনে জিয়ার কোনো ভূমিকা ছিল না, তিনি তখন ছিলেন বন্দী। অভ্যুত্থান সফল হওয়ার পর ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ ও তাহের-ইনুর নেতৃত্বাধীন গণবাহিনী সদস্যরা তাকে মুক্ত করে। কাজেই ওই রাতের এবং তার আগের জেলখানায় চার নেতা হত্যাকাণ্ডে তার সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায় না। এ ব্যাপারে তার ওপর দোষারোপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে হয়। খালেদের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ উত্ফুল্ল হয়েছিল এই কারণে যে, তারা আবার এই অভ্যুত্থানের ‘রথে’ সওয়ার হয়ে ক্ষমতারোহণের স্বপ্ন দেখেছিল। ৭ নভেম্বর তাদের সে স্বপ্ন ভেঙে দেয়। জাসদ যা চেয়েছিল তাদের সে স্বপ্নও ভেঙে যায়। জেনারেল জিয়াউর রহমান পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান না ঘটালেও এই দিবসটিই তাকে রাজনীতির পাদ-প্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছে। ক্ষমতার কোনো সুপ্ত বাসনা থাকলে তা চরিতার্থকরণের সুযোগ এনে দেয়। দিবসটি প্রকৃত অর্থে সিপাহি জনতার অভ্যুত্থান ছিল কিনা সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক এন্থনি মেসকারেনহাসের একটি চাক্ষুষ বর্ণনায়। ‘বাংলাদেশে : এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, ‘উল্লসিত কিছু সৈনিক আর বেসামরিক লোককে কতগুলো ট্যাংক নিয়ে ঢাকা শহরের মধ্যবর্তী এলাকায় চলাচল করতে দেখা যায়। এবার এই ট্যাংক দেখে লোকজন ভয়ে না পালিয়ে ট্যাংকের সৈনিকদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে রাস্তায় নেমে আসে এবং উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে। চার দিন ধরে তারা মনে করেছিল যে, খালেদ মোশাররফকে দিয়ে ভারত তাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা খর্ব করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে (রেডিও-টিভি ৩ নভেম্বর থেকে কার্যত বন্ধ ছিল। মিডিয়া বন্ধ থাকায় সবাই ছিল অন্ধকারে। সংবাদপত্রও কোনো খবর দিতে পারছিল না)। এতক্ষণে তাদের সে দুঃস্বপ্ন কেটে গেল। জনতা সৈনিকদের দেশের ত্রাণকর্তা বলে অভিনন্দিত করল। সর্বত্রই জওয়ান আর সাধারণ মানুষ খুশিতে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি শুরু করে। রাস্তায় নেমে সারা রাতভর তারা স্লোগান দিতে থাকে— আল্লাহু আকবর, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ ইত্যাদি। অবস্থা দেখে মনে হয়েছিল, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের গণজাগরণের মতো জনমত আবার জেগে উঠেছে। এটা ছিল সত্যিই এক স্মরণীয় রাত।’ এন্থনি মেসকারেনহাসের বর্ণনা আর বিএনপির মূল্যায়ন হু-বহু এক। কাজেই ৭ নভেম্বরের তাত্পর্য বিএনপির কাছে যেমন অন্যদের কাছে তেমন না হওয়ারই কথা। ৭ নভেম্বর ছিল ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের ঘটনার ধারাবাহিকতা। ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ আর লাভবান পক্ষের মূল্যায়ন দুরকম হবেই। যেহেতু সমগ্র বিষয়টি একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা, যার যার অবস্থান থেকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলতেই পারে, চলতে দেওয়া উচিত। সরকার পক্ষের বক্তব্য রাখার অনেক দরজাই খোলা। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার তারা পুরামাত্রা ব্যবহার করেছে। জাসদ নেতারাও (সরকারের পার্টনার) জিয়াকে ‘মীরজাফর’ বলে গালি দিয়ে ঝাল মিটিয়েছে। বিএনপিকেই শুধু তাদের কথা বলতে দেওয়া হলো না। গণতন্ত্রের জন্য এটা একটা খারাপ দৃষ্টান্ত। সভা-সমাবেশ করা মানুষের সংবিধানসম্মত অধিকার। বিএনপির এই নাগরিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। হাস্যকর বিষয় হচ্ছে, ৮ নভেম্বর ২ ঘণ্টা আগে ৪ ঘণ্টার জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনে বিএনপিকে একটা সভা করার অনুমতি দিয়েছিল ডিএমপি। বিএনপি যদিও তা প্রত্যাখ্যান করেছে, সভাটি যদি তারা করত তাহলে সেখানে তারা কী বলত? বিএনপি তো দিবসটিকে ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবেই বর্ণনা করত। এর অর্থ তো দাঁড়ায়, বিএনপি তার কথা যা বলার তা বলতে পারত। তাহলে তাদের কথা তারা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা নয়াপল্টনে বললে অসুবিধা কী ছিল? বিএনপি-জামায়াত জোট যখন ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদেরও সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়ার, অনুমতি না দেওয়ার অভিযোগ করছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু ‘তুমি খারাপ বলিয়া আমি ভালো হইতে পারিব না কেন?’ আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের কথা বলে, গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ে দলটির অবদানও অনেক। মনে হচ্ছে তা থেকে স্খলন ঘটেছে। মনে রাখা দরকার ক্ষমতা কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়। গণতন্ত্রের সৌরভ বিনাশ করলে কোনো একদিন আওয়ামী লীগকেও তার পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, লীগ সরকার বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করার অনুমতি দেবে না। তারা ৭ নভেম্বর উপলক্ষে ১৩ নভেম্বরের জন্য আবারও সমাবেশের অনুমতি চেয়েছে। যদি অনুমতি না মেলে তাহলে কী করবে বিএনপি? আমাদের মনে আছে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে যখন আওয়ামী লীগ সভা-সমাবেশের অনুমতি পেত না, তারা বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিনা অনুমতিতেই সমাবেশ করত। পুলিশ সমাবেশ ভেঙে দিত, কিছু গ্রেফতার করত। তার প্রতিবাদে আবার সমাবেশ ডাকত তারা। আবারও পুলিশি অ্যাকশন হতো। আবার কর্মসূচি আসত। বিএনপি কি সরকার বা ডিএমপি ‘দয়া করে’ অনুমতি না দিলে জিন্দেগিতে আর সভা-সমাবেশ করবে না? খালি বিবৃতিবাজি আর ব্রিফিংবাজি? আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকার সময় সব বাধা ডিঙিয়ে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে পারার কারণ, তাদের নেতৃত্বের কমিটমেন্ট, সংগঠনের শক্তি, সব স্তরের নেতা-কর্মীদের দলানুগত্য, সততা ও সাহস। সর্বোপরি ওপর থেকে সংগঠনের পরিচর্যা। বিএনপির সমস্যা হচ্ছে সাংগঠনিক দুর্বলতা, সৎ সাহসের অভাব। নেতাদের এক সময় ছিল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা-তখন মাঠে নেমেছেন, ঝুঁকি নিয়েছেন, এখন ক্ষমতায় থাকাকালে এত পেয়েছেন যে, হারানোর ভয়ে অস্থির থাকেন সারাক্ষণ। আন্দোলন গড়ার সৎ সাহস এমন ‘নেতাদের’ থাকে না। তাদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আছেন ৫৯৬+উপদেষ্টামণ্ডলীর ৭৩+সহসভাপতি ৩৫+স্থায়ী কমিটির ১৭ (২ পদ খালি)=৭২১ জন। এই ৭২১ জন একটা মিছিল শান্তিপূর্ণ বের করলেও তো ভালো একটা মিছিল হতে পারে। বেগম জিয়াসহ সবাই একসঙ্গে হোক না গ্রেফতার। তাহলে কি রাজনীতির চেহারা বদলে দেওয়া যায় না? গণতান্ত্রিক আচরণ করার জন্য সরকারকে একটা চাপের মধ্যে ফেলা যায় না? নিজেরা নামবেন না, অন্যদের নামতে হুকুম দেবেন, তাতে কি হয়? অন্যদের ঠেকা পড়েছে? তারা কি এমপি হবে? মন্ত্রী হবে? বড় কোনো পদ পাবে? নেতারা না নামলে ‘তারা’ কেন নামবে মাঠে?  সরকার অনুমতি দিলেই ‘নেতারা’ মাঠে নামবেন নতুবা নয়, তাহলে সরকার অনুমতি না দিলে বিএনপি ‘নেতারা’ কি রাজনীতিকেও ছুটি দেবেন?

রাজনীতিতে জেল-জুলুম, মামলা-মোকদ্দমার ভয় সব সময়ই ছিল। এসব মেনেই রাজনীতি করতে হয়। সরকারি অনুমতি ছাড়া বিএনপি ‘নেতারা’ রাজনীতি করতে যদি এত ভয় পান, রাজনীতি থেকে ঘোষণা দিয়ে বিদায় নিলেই পারেন।  যাদের কিছু হারানোর কোনো ভয় নেই, সাহস মনে আছে, বুকে বল আছে তাদের কাছে দায়িত্ব ছেড়ে দিলে তারা কিছু করতে পারে কিনা দেখা যায়।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

ই-মেইল : kazi.shiraz@yahoo.com

Add Comment

Click here to post a comment