মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

অদ্ভুত ভোট আগন্তুকদের চোখে-সাইয়েদ কাশুয়া ও ইউয়ান লি

hilary-tramp‘বাবা, আমি নিশ্চিত, আমাদের জীববিজ্ঞানের শিক্ষকের ধারণা আমি ইহুদি’। আমার মেয়ে কয়েক সপ্তাহ আগে আমাকে এ কথা বলে। ‘কী বলছ তুমি? কেন?’ আমি বিস্ময় ব্যক্ত করেছিলাম। মেয়ে উত্তর দিয়েছিল, জানি না। এই বছরের শুরুর দিকে স্যার যখন জানতে চাইলেন আমি কোত্থেকে এসেছি, বললাম জেরুজালেম থেকে। এ থেকেই তিনি ধরে নিয়েছেন, আমি ইহুদি। কারণ ওই ঘটনার কিছুদিন পর তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন ইহুদিদের ‘কোশের’ খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে আমার ভেজিটারিয়ান হওয়ার কোনো যোগসূত্র আছে কি না। চলতি মাসে তো তিনি আমাকে ‘হ্যাপি রোশ হাশানা’ বলে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

আমি বললাম, ‘তুমি টিচারকে শুধরে দাওনি? তোমার উচিত ছিল।’ মেয়ে উত্তর দিল, ‘কেন বাবা? আমি তো কোনো ভুল বলিনি? তবে কেন ক্ষমা চাওয়া শুরু করতে হবে? এ ছাড়া ফিলিস্তিন-ইসরায়েল বিষয়টি বোঝানো আমার পক্ষে সহজও নয়।’

মেয়ে তার শিক্ষককে শুধরেও দেবে না, আবার হুমকি দিয়েছে শিক্ষকের বাড়ির কাজও করবে না। তখন আমি বললাম, ঠিক আছে, আমি স্কুলে গিয়ে তোমার শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলব। তাঁকে বুঝিয়ে বলব, আমরা ইসরায়েলের মুসলিম নাগরিক ছিলাম। আমি শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করতে যখন বেরোচ্ছি, আমার স্ত্রী বাধা দিলেন—‘সত্যিই তুমি যাবে? নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করলে ভালো হয় না?’

কিন্তু আমি বের হলাম। পথের দুই পাশে দেখতে দেখতে যাচ্ছি, বাড়ির লনগুলোতে কোনো প্রার্থীর নাম বা প্রতীক আছে কি না। অনেক দূর গিয়ে এক জায়গায় দেখলাম কাঠের কারুকাজ করে বড় হরফে T-R-U-M-P লেখা। মহল্লায় এ ছাড়া নির্বাচনের কোনো আলামতই চোখে পড়ল না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এক বন্ধু, যে আমেরিকায় কয়েক দশক ধরে আছে, তার ভাষ্য হচ্ছে, ‘এবারের পরিস্থিতি অস্বাভাবিক। নির্বাচনের শেষ মূহূর্তে এসে অন্যবার পোস্টারে-প্রতীকে সব ছেয়ে যায়। গাড়ির বাম্পারে স্টিকার লাগানো হয়। মানুষ উৎসবের আমেজ নিয়ে পছন্দের প্রার্থীর প্রতি সমর্থনের কথা অন্যদের জানায়। এ বছর সব বদলে গেছে।’

আমাদের এই শহরটি রক্ষণশীল ধাঁচের, সংখ্যাধিক্য রিপাবলিকানদের। এবার সম্ভবত স্পর্শকাতর পরিস্থিতির কারণেই বেশির ভাগ বাসিন্দা তাঁদের পছন্দের প্রার্থীর ব্যাপারে প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। এই কলেজ টাউনে বিদেশি ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্যও অনেক। তাঁরা সমর্থন করছেন এমন একজন প্রার্থীকে, যিনি সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থানের পক্ষে খুবই সোচ্চার। হিলারি ক্লিনটনেরও অনেক সমর্থক আছেন শহরে। তবে তাঁরাও প্রকাশ্যে কোনো প্রতীক বা পোস্টার লাগিয়ে সমর্থন ব্যক্ত করা থেকে বিরত রয়েছেন। সম্ভবত ট্রাম্প শিবিরের ক্ষোভের কারণ হতে পারে এমন কোনো আচরণের ঝুঁকি তাঁরা নিতে চাইছেন না।

বিদেশিদের ভয়ের কারণ অবশ্যই আছে, আমাদের মতো মুসলমান হলে তো কথাই নেই। শহরে চাপা আতঙ্ক এমনভাবে আমাদের জাপটে ধরেছে, ব্যক্তিগতভাবে আমিও এখনো বুঝতে পারছি না কার বিজয় আমাদের প্রত্যাশা করা উচিত।

ট্রাম্প বিজয়ী হয়ে হোয়াইট হাউসে ঢুকতে পারলে তাঁর কট্টর সমর্থকরা কি নমনীয় আচরণ করবে? কিংবা ট্রাম্প হেরে গেলে কি তাঁর সমর্থকরা প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হবে এই বলে : তোমরাই আমেরিকাকে আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছ। কিংবা আমাদের কি ডেমোক্র্যাটদের পক্ষেই থাকা উচিত, যারা বিশ্বাস করে সবর্জনীনতায়, সংবিধানের মৌলিক মূল্যবোধকে সুরক্ষার চেষ্টা করে?

স্কুলে যাচ্ছি আর ভাবছি, সম্ভবত আমার মেয়েই ঠিক বলছে এবং আমাদের মুসলিম পরিচয়টা গোপন রাখা উচিত, অন্তত নির্বাচনটা হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। আমাদের ইসরায়েলি পাসপোর্ট রয়েছে, পরিস্থিতির অবনতি কাজে লাগাতে পারব। পরক্ষণেই মনে হলো, কী বোকা আমি! পরিস্থিতির অবনতি যদি হয়ই, ইহুদি পরিচয়ও কি আমাকে রক্ষা করতে পারবে?

নির্বাচনগুলো এমনই নিষ্ঠুর, আমাদের মনের গভীরে থাকা ভয়গুলোকে জাগিয়ে তোলে। আমি তখন আমার প্রতিবেশীদের সন্দেহ করি, সন্তানের শিক্ষককে সন্দেহ করি। রেস্টুরেন্টে যাদের সঙ্গে আড্ডা মারি, যাদের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করি, একসঙ্গে বেজবল খেলা দেখি—কেউই সন্দেহের বাইরে নয়। ফলে এক ধরনের অপরাধবোধ আমাকে পেয়ে বসেছে। যাদের সঙ্গে আমি বসবাস করে আসছি, তাদের আন্তরিকতা, তাদের ভালোবাসার ওপর আমি ভরসা রাখতে পারছি না। রাজনীতিবিদরা আমাদের ঘৃণা ও অবিশ্বাসের জগতে ঠেলে দিয়েছেন এবং আমি তাঁদের খেলা মেনে নিয়েছি। নিজের ওপর আমার রাগ হচ্ছে, ঘেন্না হচ্ছে। যে খেলা বিভেদ তৈরি করে, নির্দোষ মানুষকে শত্রু করে তোলে, সে খেলা মনে মনে যে মেনে নিয়েছিলাম, এ ছিল আমার অপরাধ।

স্কুলে শিক্ষকদের কক্ষে ঢুকতে যাওয়ার মুহূর্তেও নিজেকে বলছিলাম, আমি আসলে এ সুন্দর স্থানে বাস করছি। ‘সালুম’! মেয়ের জীববিজ্ঞানের শিক্ষক আমাকে অভিবাদন জানালেন, যেন আরেকবার প্রমাণিত হলো, স্থানীয় বাসিন্দারা আসলেই দয়ালু প্রকৃতির। উত্তর দিলাম ‘সালুম’। তারপর আমার মেয়ের শিক্ষাগত অর্জন, সাফল্য নিয়ে আমাদের আন্তরিক আলাপচারিতা হলো।

এর পরও আমি আমার মুসলমান পরিচয় নিয়ে একটিও কথা বলতে পারিনি, বারবার মনে হয়েছে, সাবধান থাকাই ভালো। বিদায় মূহূর্তে আমরা করমর্দন করেছি এবং সাধারণ ইসরায়েলিদের মতোই বলেছি, ‘সাব্বাত সালুম’; যদিও দিনটি ছিল সোমবার।

দুই. ১৯৯৬ সালে আমি নিজের দেশ চীন ছেড়ে আমেরিকা আসি। তখন নির্বাচনী ডামাডোল। আইওয়ায় দেখলাম বাড়িঘরের সামনে লনগুলোতে বড় বড় হরফে লেখা ক্লিনটন-গোরে কিংবা ডোল-কেমপের নাম, কিংবা তাঁদের প্রতীক। আজও ভুলিনি—আমেরিকানরা নির্ভয়ে তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করছে দেখে আমি কতটা বিস্মিত হয়েছিলাম! পরের নির্বাচনগুলোও কোনো না কোনো কারণে আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে; তবে একটা জিনিস আজও বদলায়নি : চীনকে নিয়ে এখানকার মানুষের ভাষ্য। সেই চিরশত্রু!

এবারকার এই ভোট মৌসুমে দেখলাম ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের সবচেয়ে উঁচু গলার নিন্দুক। বিশ্বের উষ্ণায়নকেও তিনি মনে করেন চীনা হোক্স। ‘চীন ডলারের দর ধসিয়ে দিচ্ছে’ কিংবা ‘চীন আমাদের দেশকে পিগি ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করছে’—বলার সময় যে উপাত্ত তাঁর মাথায় থাকে সেগুলো সবই বস্তাপচা, প্রাচীন।

লেখক হওয়ার আগে আমি বিজ্ঞানী ছিলাম। দুটি পেশার জন্যই প্রশ্নকরণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, অনুমানে ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। প্রশ্নের টানে প্রশ্ন আসে। একইভাবে ভিত্তিহীন অনুমান থেকে মিথ্যাকেই মানুষ একসময় সত্য বলে জ্ঞান করতে শুরু করে।

এবারের নির্বাচন যেসব ধারণাকে সামনে নিয়ে এসেছে, তার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী হচ্ছে এই ভাবনাটি যে ‘আমেরিকান’ ও ‘আদারস’ তথা অন্যদের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। এই ‘অন্য’রা হচ্ছে অভিবাসী, সংখ্যালঘু এবং ক্ষুদ্র ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোক। ভাবনায় সাম্প্রদায়িকতা এতটাই এখন বেড়ে গেছে যে ফক্স নিউজের একটি প্রতিবেদনের পর নিউ ইয়র্কের চায়না টাউনের মানুষকে প্রতিবাদে রাস্তায় নামতে হয়। অতি দেশপ্রেম উসকে দিয়ে আমেরিকাকে ঘরে-বাইরে লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

চীনকে নিয়ে ট্রাম্পের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি দেখে আমারও মনে পড়ে প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ে সত্তর ও আশির দশকে আমি কী পড়েছিলাম। আমাদেরও মগজ ধোলাই করা হতো এই বলে : ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিরন্তর চীনকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।’

চীন ও আমেরিকা এই দেশ দুটি স্বাভাবিক শত্রু দেশ বলতে যা বোঝায় তা নয়। কিন্তু কিছু বিশ্বাস থেকে মানুষ পরস্পরকে দোষারোপ করছে। এখন যে আমিরকান নারী নিউ ইয়র্কের রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের একজন চীনা বংশোদ্ভূত আমেরিকানকে বলছে ‘গো ব্যাক টু চায়না’, হতে পারে তিনি সেই নারী বিগত সত্তরের দশকে পেইচিংয়ে মার্কিন স্পাইয়ের খোঁজে মধ্যরাতে ঘরদোরে হানা দেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজন করেছিলেন।

হৃদয়ে বিভেদের বীজ থাকলে অন্যদের নন-আমেরিকান বা ‘আদারস’ সাব্যস্ত করা কঠিন কিছু নয়। সমস্যা হচ্ছে, ট্রাম্প নির্বাচনে যদি হারেনও, তাঁর উসকে দেওয়া বিভেদের বিষ আমেরিকার গণতন্ত্রকে বিষাক্ত করবে।

লেখক : সাইয়েদ কাশুয়া ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং অধ্যাপক; কিছুদিন আগে বেরিয়েছে তাঁর বই ‘নেটিভ : ডিসপাটেস ফ্রম অ্যান ইসরায়েলি-প্যালেস্টিনিয়ান লাইফ। ইউয়ান লি লেখক; ফেব্রুয়ারিতে বেরোচ্ছে তাঁর গ্রন্থ ‘ডিয়ার ফ্রেন্ড, ফ্রম মাই লাইফ আই রাইট টু ইউ ইন ইউর লাইফ’। ‘স্ট্রেনজারস অন এ স্ট্রেঞ্জ ইলেকশন’ শীর্ষক পাতায় তাঁদের লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

ভাষান্তর : গাউস রহমান পিয়াস

Add Comment

Click here to post a comment