মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

২০৭১-সৈয়দ বোরহান কবীর

%e0%a6%b8%e0%a7%88%e0%a7%9f%e0%a6%a6-%e0%a6%ac%e0%a7%8b%e0%a6%b0%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a7%80%e0%a6%b0১. ২০৭১ সাল। পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত, আধুনিক, শান্তিময় এবং পরিবেশবান্ধব দেশটির স্বাধীনতার শতবর্ষ উদ্যাপিত হচ্ছে। দেশটির নাম বাংলাদেশ। শতবর্ষ আগে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এই দেশটি স্বাধীন হয়েছিল। স্বাধীনতার পর এই দেশটি ছিল ক্ষুধা দারিদ্র্যের প্রতীক। দুর্ভিক্ষের দেশ।  আজ এই দেশটি সারা বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষের একমাত্র ভরসাস্থল। সারা বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ দরিদ্র মানুষ বাংলাদেশ থেকে কোনো না কোনো সহায়তা পায়। ২৬ মার্চ দেশটির স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে শতবর্ষ পূর্তি শুরু হয়, ১৬ ডিসেম্বর দেশটির বিজয় দিবস দিয়ে বছরব্যাপী অনুষ্ঠানের শেষ হচ্ছে। সমাপনী অনুষ্ঠানে ধনী গরিব সব দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা এসেছেন। অনুষ্ঠানে ধনী গরিবের ভেদাভেদ করা হয়নি। বরং যেসব দেশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছিল তাদের আলাদা সম্মান দেওয়া হয়েছিল। অনুষ্ঠানে দারিদ্র্যে জর্জরিত ইউরোপের দেশগুলো থেকে সরকার প্রধানরা এসেছেন। গৃহযুদ্ধে বিভক্ত জর্জরিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এসেছেন। আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা পর্বের পর সবাই জাতির পিতার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করলেন। তারপর চা চক্র। চা চক্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কোনোভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটু কথা বলার কসরত চালাচ্ছেন। অনেক কষ্টে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি চলে এলেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে দেখে একটু ম্লান হাসি দিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কাছে চলে এসে শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন। প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘আমরা আপনাদের দরিদ্র মানুষের ত্রাণের জন্য যে এক হাজার কোটি টাকা দিয়েছিলাম, তাতে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে বলে জেনেছি।’ মুহূর্তেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের ফর্সা মুখটা লাল হয়ে গেল। বললেন ‘ম্যাডাম প্রাইম মিনিস্টার, দুর্নীতির কোনো অভিযোগ প্রমাণিত নয়।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাছাড়া আপনাদের দেশে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। গুম, হত্যা এগুলো কিন্তু বাংলাদেশ বরদাশত করে না।’ কাচুমাচু করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মাথা নাড়লেন। বললেন, ‘সামনে শীত, ত্রাণ সাহায্য না পেলে বহু মার্কিনি মারা যাবে।’ প্রধানমন্ত্রী একটু ভাবলেন, বললেন ঠিক আছে আপনি আমাদের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলুন। এর মধ্যেই তাকে প্রায় ধাক্কা দিয়েই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে চলে আসেন গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী। বললেন, বাংলাদেশের সাহায্যের জন্য গ্রিসের জনগণ কৃতজ্ঞ। সাহায্য একটু বাড়ালে ভালো হয়। এভাবে একে একে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষ  হলো। অনুষ্ঠান শেষ হলো আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শেখ হাসিনাকে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে। তিনি বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সূচনা করেছিলেন। যে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশ। আর এটা সম্ভব করেছে প্রাণশক্তিতে ভরা এদেশের অমিত সাহসী মানুষ।

২. রংপুরের কৃষক বিজয়ের শতবর্ষের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর, স্কাইপে তারা ক্ষেতের কৃষকের সঙ্গে কথা বললেন, ক্ষেতে একটু পানি ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিলেন। বলে রাখা ভালো ২০৫২ সাল থেকে বাংলাদেশ ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে না। বিশ্বের এক নম্বর বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা ২০৪১ সাল থেকে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উপায় নিয়ে কাজ করে। ২০৪৮-এ গোটা বাংলাদেশকে বৃষ্টির পানির আওতায় আনা হয়। বৃষ্টি হলে, বৃষ্টির পানি চলে যায় সংরক্ষণ ভাণ্ডারে। সারা দেশে এরকম ১০ কোটি রিজারভার গড়ে তোলা হয়েছে। এখন কেউ নদী, পুকুর এবং মাটির নিচের পানি ব্যবহার করে না। রিসাইক্লিং পদ্ধতিতে বৃষ্টির পানি দিয়ে কৃষি, খাবার পানিসহ সব পানির প্রয়োজন মেটানো হয়।

বাংলাদেশে জমি বিভাজন আর নেই। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে শুধু ফসলের মাঠ। সারা বছর এখানে নানা রকমের শস্য উৎপাদিত হয়। প্রত্যেক কৃষি জমির মালিক ভারচুয়াল ডাটা এবং স্যাটেলাইটের সাহায্যে তার জমির ফসলের খোঁজখবর নেন। বিশ্বের অন্যতম সেরা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনবদ্য আবিষ্কারে গত ২০ বছর ধরে বাংলাদেশের কৃষিতে জৈব সার ছাড়া আর কিছুই ব্যবহার হয় না। ইউরিয়া, ফসফেটসহ কৃত্রিম সার ব্যবহার না করে, মানুষ ও পশুর বর্জ্য দিয়ে পরিবেশবান্ধব সারই কৃষির চেহারা পাল্টে দিয়েছে। কৃষক স্যাটেলাইটে জেনে নেন, আবহাওয়ার খবর। সে অনুযায়ী তিনি কৃষি শ্রমিকদের পরামর্শ দেন। কৃষি শ্রমিকরা অধিকাংশই বিদেশি। বেশির ভাগই মধ্যপ্রাচ্যের হতদরিদ্র রাষ্ট্র থেকে এসেছে। এদের ওপর অনেক দয়া হয় কৃষক রহমতের। বাবার কাছে শুনেছেন প্র-পিতামহ মধ্যপ্রাচ্যের এক দেশের কাজ করত। তার সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হতো। এক সময় অত্যাচারে কষ্টে তার প্র-পিতামহ মারা যান। এ জন্য রহমত কোনো বিদেশি শ্রমিকের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন না। বরং তিনি সব সময় বিদেশি কৃষি শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা চিন্তা করেন। কারণ রহমত জানে বাংলাদেশকে পাল্টে দিয়েছে এদেশের মানুষ। তাই মানুষকে অবহেলা করতে নেই।

৩. চট্টগ্রামের শিল্পপতি ওমর। বিশ্বের একশো একুশটি দেশে তার শিল্পকারখানা। প্রায় এক কোটি লোক এসব শিল্পে কাজ করে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সব কারখানার সঙ্গে তিনি ভারচুয়াল কনফারেন্স করেন। বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব কৌশল এখন সারা বিশ্বের আরাধ্য। ২০৫০ সাল থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে শুধু সৌরশক্তি এবং পানি ব্যবহার করে। কয়লা ও গ্যাস ব্যবহার করে পরিবেশ বিনাস করার আত্মঘাতী প্রবণতা বন্ধ করে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ওমর কোনো কারখানায় গ্যাস, তেল বা কয়লা ব্যবহার করে না। ওমর সব দেশে প্রযুক্তি হস্তান্তর করে ফ্যাক্টরিগুলো করেছেন। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের শতবার্ষিকী উপলক্ষে তার পোশাক শিল্পগুলোতে বিশেষ নক্্শার পোশাক তৈরি করা হয়েছে। লাল-সবুজের সমন্বয়ে এই পোশাক এখন বিশ্বে জনপ্রিয়তার শীর্ষে।

ওমরের প্রত্যেকটা কারখানা যেন একেকটা বিশাল ফাইভস্টার হোটেল। এখানে কোয়ালিটি কন্ট্রোলের কাজ করে চুয়েটের আবিষ্কার ‘ফ্যাক্টরি রোবট’। ওমর বিজয়ের শতবার্ষিকীতে ঘোষণা করেন, তার ফ্যাক্টরির লাভের দশ শতাংশ ইউরোপ, আমেরিকার ও মধ্যপ্রাচ্যের দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য দান করবেন। ওমর শুনেছেন, এক সময় বাংলাদেশের মানুষও অনেক গরিব ছিল, না খেয়ে থাকত। বাংলাদেশকে বলা হতো বটমলেস বাসকেট। ওমর হাসেন। জাতির পিতা এবং তার কন্যা আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শেখ হাসিনার ছবিতে স্যালুট করেন। আর নিজেই বিড় বিড় করে আবৃত্তি করেন ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই’। ওমরের মতো এরকম শতাধিক বাঙালি শিল্পোদ্যোক্তাদের হাতেই আজ শিল্পোন্নত বাংলাদেশ। বিশ্বের শিল্প খাতে বাংলাদেশের অবদান ২১ ভাগ।

বাংলাদেশে ২০১৬ থেকে যে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল, তা শুধু প্রযুক্তিনির্ভর ছিল না। বরং মানবশক্তির সঙ্গে প্রযুক্তির মেলবন্ধন ছিল এই শিল্প বিপ্লবের মূল সূর। এ জন্যই মেশিন আর হাতের বৈরিতা হয়নি হয়েছে সক্ষতা। বাংলাদেশের শিল্পবিপ্লব মানুষের জয়গান।

৪. বাংলাদেশের সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যেন অতুলনীয় স্থাপত্যের এক অনুপম প্রদর্শনী। একে তো বিজয়ের শতবার্ষিকী, অন্যদিকে এ সময় বাংলাদেশের অপূর্ব আবহাওয়ার কারণে পর্যটক উপচে পড়ে। পর্যটক আসেন ব্রাজিল, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক ও চীনের মতো উন্নত দেশগুলো থেকে। বাংলাদেশ বিমান বায়ুচালিত। এটাও বিশ্বের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের আবিষ্কার। বাতাসকে শক্তি বানিয়ে বিমান চালানোর এই আবিষ্কার বিশ্বে পরিবেশ রক্ষায় অনন্য অবদান রেখেছে। সিলেটের সুনামগঞ্জে যে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্রাজিলের পর্যটক আলবার্তো পেরেইরা নামলেন, তা মনে হবে লেক। শাপলা ফুটে আছে চারপাশে। ইমিগ্রেশন চেক করে তিনি উঠলেন এক সোলার পাওয়ার সসারে। আকাশ থেকে বাংলাদেশটা যেন একটা ছবি, সবুজ আর সবুজ। রাঙ্গামাটির পাঁচতারা হোটেলে নামলে তাকে দেওয়া হলো অর্গানিক গ্রিন টি। তাকে বলা হলো বাংলাদেশে স্বাগতম। কিন্তু এই দেশে পরিবেশ বিনাশী কোনো কাজ আইনত নিষিদ্ধ। গাছের পাতাও ছেঁড়া যাবে না। পেরেইরা ভাবলেন, আহারে আমার দেশটা কবে এমন হবে।

বাংলাদেশে সব যানবাহন সৌরবিদ্যুৎ চালিত অথবা বাষ্পচালিত। কোথাও কোনো দূষণ নেই, ময়লা নেই। হোটেল রুমে বসে আলবার্তো ‘বাংলাদেশের ইতিহাস বইটা নিয়ে মগ্ন হলেন। অবাক বিস্ময়ে জানলেন, একশ বছর আগে এই দেশটা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে গরিব দেশগুলোর একটি। অনাহারে মানুষ মারা যেত, প্রাকৃতিক দুর্যোগে থাকত অসহায়…। রুম সার্ভিসের বেলে সম্বিত ফিরল তার। ছেলেটা মার্কিন নাগরিক। এখানে তিন বছর ধরে কাজ করে। আলবার্তো তাকে জিজ্ঞেস করল, এখানে কেমন লাগে। ছেলেটি উচ্ছ্বাসিতভাবে জানাল, খুব ভালো। আলবার্তো তাকে জানাল এদেশের কোন জিনিসটা ভালো। উত্তরে বেল বয় ছেলেটা বলল, ‘মানুষ’। এখানকার মানুষ অনেক ভালো, অতিথিপরায়ণ, সহানুভূতিপ্রবণ।

৫. বিজয় দিবসের পরদিনই বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সাতটি (জি-৭) দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশে। বিশ্বের সবচেয়ে নয়নাভিরাম শহর ফরিদপুরে। দেশগুলো হলো— বাংলাদেশ, ভারত, চীন, ব্রাজিল, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভিয়েতনাম। এরা সবাই বাংলাদেশের বিজয় শতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাংলাদেশ এসেছিলেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে গ্রুপ সেভেনের বৈঠকে প্রথমেই ইউরোপজুড়ে দুর্ভিক্ষ এবং গৃহযুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদী সহিংসতায় সহস্রাধিক মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানায় গ্রুপ সেভেন। বৈঠকে অবিলম্বে গৃহযুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী গৃহযুদ্ধ নিরসনে নিয়োজিত শান্তিরক্ষা বাহিনীতে আরও বাঙালি সৈন্য বাড়ানোর অনুরোধ করেন। উত্তরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর দুই কোটি পঞ্চাশ লাখ সদস্য শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত। তিনি সমঝোতা এবং ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ দর্শনের আলোকে আপস ফর্মুলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, বর্ণবাদী সরকারগুলোর ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে হবে। চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, বর্ণবাদী তত্পরতা বন্ধ না করলে মার্কিন ও ইউরোপে সাহায্য বন্ধ করতে হবে। সভায় মধ্যপ্রাচ্যের দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশগুলোর জন্য বাংলাদেশ দশ লাখ কোটি টাকার নগদ সহায়তার ঘোষণা দেন। আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর চা চক্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী একটু খোঁচা দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার কি মনে হয় না আপনি মধ্যপ্রাচ্যে সাহায্যের ব্যাপারে একটু বেশি হাতখোলা।’ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী স্মিত হাসেন। বলেন, ‘আপনার কি মনে হয় না, ইউরোপ আর আমেরিকার কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের এই দুর্দশা। আর ইউরোপ আমেরিকার সংকট তো তাদের নিজেরই সৃষ্টি।’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী মাথা নাড়েন, ‘তা বটে। কিন্তু এক সময় মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের প্রচুর শ্রমিক কাজ করত। সে জন্য’…. ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কথা শেষ করার আগেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেটা তো আপনার দেশেরই বেশি ছিল। আমাদের লোকজন কাজ করত। জীবনের সব আনন্দ স্বপ্ন উজাড় করে দিয়ে পরিশ্রম করেছে।’ ভারতের প্রধানমন্ত্রীও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ কি জানেন? উত্তরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন ‘এদেশের মানুষ’। ভারতের প্রধানমন্ত্রী সম্মতিসূচক মাথা নাড়েন।

৬. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি। বিদ্যুৎ নেই দুই ঘণ্টা। ম্যানহাটনের ফিফথ এভিনিউতে আশ্রয়শিবিরে বাংলাদেশের চিকিৎসক ডা. জালাল চিকিৎসা দিচ্ছেন বর্ণবাদী দাঙ্গায় গুরুতর আহত কয়েকজনকে। জো রবাট গুরুতর আহত। তার মাথা ফেটে গেছে। জরুরি অপারেশন করা দরকার। ডা. জালাল তার স্যাটেলাইট কানেকটিভিটিতে (এক ধরনের আধুনিক ফোন) যোগাযোগ করলেন বাংলাদেশের সঙ্গে। জানালেন দ্রুত বিদ্যুৎ দরকার। ডা. জালালকে জানানো হলো ৫ সেকেন্ডের মধ্যে বিদ্যুৎ পাবে। বিদ্যুৎ এলো। চারপাশে অসংখ্য আহত মানুষের আর্তচিৎকার। বাংলাদেশের চিকিৎসক দল দ্রুত চিকিংসা শুরু করল। আহতদের অধিকাংশই কালো মানুষ। সাদারা দল বেঁধে তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। মারা গেছে শতাধিক। সারা রাত ধরে ডা. জালাল এবং তার দল আহতদের সেবা করলেন। সকাল নাগাদ জো রবাটের জ্ঞান ফিরল। ডা. জালাল তার পাশে দাঁড়ালেন। জো কৃতজ্ঞতার হাসি ছড়িয়ে বলল— ‘থ্যাঙ্ক ইউ অ্যান্ড ইয়োর কান্ট্রি’। ডা. জালাল গর্বিতভাবে বললেন ‘ইউ আর ওয়েলকাম’। রবাট জানতে চাইল, বাংলাদেশ শুনেছি শান্তির দেশ, কোনো হানাহানি নেই, সন্ত্রাস নেই।’ ডাক্তার তার পাশে বসলেন। ব্যান্ডেজ দেওয়া মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন ‘শোন, ৫০-৬০ বছর আগে বাংলাদেশেও এমন ঘটনা ঘটত।’ কিন্তু সে সময় আমাদের প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাস দমনে কঠোর হন। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নিয়েছিলেন। আজ তার ফল আমরা পাচ্ছি।’ জো রবাট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ওই সময়ে আমাদের এখানে একজন বেসামাল লোক প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন, তারপর আস্তে আস্তে আমরা এখানে।’ তিনি বললেন, ‘জান তো একসময় এখানে জাতিসংঘের সদর দফতর ছিল। হানাহানি আর সহিংসতায় এটা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ভারতে। একসময় নিউইয়র্ক শহর ঘুমাত না। আজ এটা অন্ধকারেই থাকে।’ রবাট জানতে চাইল কীভাবে বদলে গেল বাংলাদেশ। উত্তরে ডা. জালাল গৌরবের হাসি দিয়ে বলেন, মানুষের অফুরান শক্তি আর আত্মবিশ্বাসে।

৭. পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ততম, চিত্তাকর্ষ শহর ঢাকা। ঢাকার গুলশান হলো বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এলাকা। ঢাকা নেভার স্লিপ। প্রকৃতি আর আধুনিকতার এক অনবদ্য মেলবন্ধন ঘটেছে এই শহরে। গত দশ বছরে এই শহরে একটিও অপরাধ হয়নি। এমনকি একটি চুরিও না। এই শহরের লেকে প্রমোদ ভ্রমণের চেয়ে বড় বিনোদন পৃথিবীতে কম আছে। নানা বর্ণের নৌকায় ভ্রমণ করা যায়। উদভ্রান্ত এক তরুণ তেমনি এক নৌকায় বসে আছে। তাকে বিমর্ষ লাগছে। নৌকায় অন্যরা যখন লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করছে, তখন সে আনমনা। হঠাৎ সে বিদ্যুত্স্পৃষ্টের মতো থমকে গেল। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল, নড়তে পারছে না। নৌকায় উপস্থিত সবাই বুঝল তার ওপর স্যাটেলাইট থেকে জ্যামার বসানো হয়েছে। সে কোনো খারাপ কাজ করার চিন্তা করেছিল। নৌকা বনানী লেক স্টেশনে নামতেই তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুজন সদস্য ধরল। স্ক্যানার দিয়ে তার শরীরে পরশ বুলিয়ে দিতেই সে আবার স্বাভাবিক হলো। দুই পুলিশ কর্মকর্তা তাকে ধরে নিয়ে গেল। নৌকায় উপস্থিত বিদেশিরা বুঝতেই পারল না কী হয়েছে। নৌকায় বসা এক তরুণকে বিদেশি পর্যটক জিজ্ঞাসা করল কী হলো ব্যাপারটা। তরুণটি বলল, বাংলাদেশ পর্যবেক্ষণ করছে ১০০টি স্যাটেলাইট টাওয়ার। এই টাওয়ারে আছে ‘এমজেড আই’ যন্ত্র। এটা হলো মাইন্ড রিডার এবং বডি জ্যামার। এই দেশে যে কোনো মানুষের মন যখন অপরাধপ্রবণ হয় তখন তা ‘এমজেডআই’-এর মাইন্ড রিডার মেশিনে ধরা পড়ে। এটা ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বডি জ্যামার দিয়ে তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়। এরপর পুলিশ তাকে নিয়ে যায়, সংশোধন করে ছেড়ে দেয়।’ কথাগুলো বলার সময় তরুণের চোখ ঠিকরে গৌরবের দ্যুতি বেরুচ্ছিল।’ বিদেশি বস্ফািরিত চোখে জিজ্ঞাসা করল ‘এম জেড আই’ মানে কি? ‘মুহম্মদ জাফর ইকবাল। বাংলাদেশের একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী।’ তরুণের উত্তর। ‘তিনি কি এই যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন?’ বিদেশি জানতে চায়? ‘না, তিনি তরুণদের উজ্জীবিত করতেন, অনুপ্রাণিত করতেন বিজ্ঞান শিক্ষায়, গণিত শিক্ষায়। বিদেশের দামি চাকরি ছেড়ে তিনি বাংলাদেশে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞানে শিক্ষকতা শুরু করেন। তার অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল তরুণ বিজ্ঞানী কুড়ি বছর আগে এই যন্ত্র আবিষ্কার করে। ১৫ বছর ধরে এর বাণিজ্যিক ব্যবহার চলছে। ওই তরুণরা মুহম্মদ জাফর ইকবালের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এর নাম দিয়েছে ‘এম জেড আই’। এখন তাই অপরাধশূন্য বাংলাদেশ। বিদেশি নিজেও যেন এই দেশে এসেছে ভেবে গর্ব অনুভব  করে।

৮. অস্ট্রেলিয়ার কয়েকটি শহরে ব্যাপক সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অস্ট্রেলিয়া সফর অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার স্বার্থে এই মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সরকারের মতামত চেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ক্যাবিনেট ল্যাবে সব মন্ত্রীর সঙ্গে ভারচুয়াল কনফারেন্সে বসেছেন। বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনার শেষ, অস্ট্রেলিয়া সফর এজেন্ডা এলো। প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ থামলেন। ১০ মিনিটের জন্য মিটিং স্থগিত করলেন। সব স্ক্রিন বন্ধ হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ থামলেন। প্রধানমন্ত্রী কনফারেন্স রুম থেকে বেরুলেন, হঠাৎ স্মৃতি আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। চলে গেল ৫৫ বছর আগে। যখন তিনি মাত্র ৬ বছরের শিশু। ক্রিকেটপাগল বাবার আদুরে কন্যা। বাবা দিনরাত কী পরিশ্রম করতেন, তার একমাত্র মেয়েকে খুশি করার জন্য। মেয়েটি সন্ধ্যা থেকে অপেক্ষা করত বাবা কখন আসবে। যেদিন বাংলাদেশের ক্রিকেট থাকত, সেদিন বাসায় যেন উৎসব। মেয়েকে কোলে দিয়ে বাবার ক্রিকেট উদযাপন। সব সময় বাবা মেয়েকে জিজ্ঞাসা করত ‘মা আজ কে জিতবে’। মেয়ে অবলীলায় বলত ‘বাংলাদেশ’। বাংলাদেশ জিতলে বাবা কাঁদত, আনন্দের কান্না। মেয়ের জন্য গিফট। আর হারলে বাবার চেহারার দিকে তাকানো যেত না। এরকম একটা সময়ে অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। তারা এলো না। তারা জানাল বাংলাদেশে যাওয়া অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের জন্য নিরাপদ নয়। বাংলাদেশের জন্য ছিল সেদিনটা চরম অপমানের, দুঃখের। বাবার খুব মন খারাপ ছিল সেদিন। শুধু বাবার কেন প্রতিটি বাঙালিই সেদিন কষ্ট পেয়েছিল। আজ সেই অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ যাবে কিনা, সে নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আকাশের দিকে তাকালেন। মনে হলো তার বাবার সঙ্গে কথা বলছেন, কিংবা বাবার মতো অসংখ্য ক্রিকেটপাগল বাঙালির সঙ্গে, যারা সেদিন আহত হয়েছিল, অপমানিত হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী চোখ মুছলেন, স্যাটেলাইটে সিগন্যাল পাঠালেন কনফারেন্স ওপেন করার জন্য। সবাই যেখানে আছে সেখান থেকে কনফারেন্সে অংশ নিচ্ছেন। আলোচনায় অধিকাংশ মন্ত্রী অস্ট্রেলিয়ায় না যাওয়ার পক্ষে। প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করালেন ২০১৫ সালের কথা। যখন অস্ট্রেলিয়া এলো না তখন আমাদের পূর্বসূরিদের কেমন লেগেছিল। কী কষ্ট পেয়েছিল এদেশের ক্রিকেটপাগল মানুষ। প্রধানমন্ত্রীর আবেগতাড়িত ভাষণের পর সবাই রাজি হলো। বলা হলো, বায়োনিক স্পেসশিপের কাভারেজ দেওয়া হবে বাংলাদেশের সব খেলায়। এই স্পেসশিপ দশমিক শূন্য এক সেকেন্ডের মধ্যে অপরাধ সংঘটিত এলাকায় অপরাধ বন্ধের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা আমাদের একসময় অবজ্ঞা করেছে অবহেলা করেছে আমরা তাদের সম্মান দেখাব।’ এটাই মানুষের ধর্ম।

৯. মিটিং শেষ করে প্রধানমন্ত্রী তার রুমে গেলেন। কটা দিন খুব ব্যস্ততায় কেটেছে। শতবর্ষ উদযাপন, বিদেশি অতিথিদের সময় দেওয়া ইত্যাদি। আজ অনেক দিন পর এক টুকরো অবসর। এই অবসরে আবার প্রধানমন্ত্রী ছোটবেলায় চলে গেলেন। রোজ সকালে স্কুলে যাওয়ার জন্য বেরুতেন বাবার সঙ্গে। বলা যায় বাবার গলা জড়িয়ে স্কুলে যেতেন। রাস্তায় থাকত তীব্র যানজট। অস্থির হয়ে ছোট্ট মেয়েটি বাবাকে বলত ‘বাবা বাংলাদেশ কবে উন্নত হবে।’ বাবা বলত ‘২০৪১ সালে বা তার আগেও।’ বাবা কখনো আশা হারাননি সব সময় মেয়েকে বলবেন ‘বাংলাদেশ সবার সেরা। একদিন এদেশ সবচেয়ে উন্নত হবে।’ মেয়েটি অবাক বিস্ময়ে বাবার কথা শুনত। প্রধানমন্ত্রী একাই হাসেন। চোখে জল আসে। তার বাবার মতো অসংখ্য বাবা, অসংখ্য মা যাদের পরিশ্রম, দেশের প্রতি ভালোবাসা আর গভীর আত্মবিশ্বাস বাংলাদেশকে আজ বিশ্বের সবচেয়ে সম্পদশালী দেশে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের সাফল্যগাথা হলো আসলে অসংখ্য সাধারণ মানুষের অসাধারণ গল্পের যোগফল।  বাবা কখনো প্রমিজ ব্রেক করেননি।

বাংলাদেশ সেরা হবে এই প্রমিজটাও সত্যি হয়েছে। বাংলাদেশ আজ পরিপূর্ণ। বাংলাদেশের আরেক নাম পূর্ণতা। কোথায় বাবা? মনে পড়ে তার মায়ের কথা। মা বলেছিল, আমরা মরে গেলে প্রজাপতি হয়ে তোমার আশপাশে থাকব। যখন দেখবে দুটো প্রজাপতি পাশাপাশি তখন বুঝবে এটাই আমরা। প্রধানমন্ত্রী বারান্দায় যান। অনেক পাখি আছে। ফুল ফুটে আছে বাগানে। এর মধ্যেই দুটো প্রজাপতি পাশাপাশি একটা ফুলের ওপর বসে আছে।  প্রধানমন্ত্রী হেসে ফেলেন, নিজের অজান্তেই বলে ওঠেন ‘জয় বাংলা’।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।

ইমেইল : poriprekkhit@yahoo.com

Add Comment

Click here to post a comment



সর্বশেষ খবর