মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

১০ টাকার চাল, মানবিকতা ও রাজনীতি-মোস্তফা কামাল

মোস্তফা কামালদুস্থ-হতদরিদ্রদের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ চলছে সারা দেশে। মহতি এই উদ্যোগ নিয়ে সারা দেশে যা চলছে, তাতে লজ্জায় মুখ ঢাকতে হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা কেন যে নিজেরাই নিজেদের পায়ে কুড়াল মারছেন আর কেনই বা তাঁরা শেখ হাসিনাকে বিব্রত করছেন, তারও কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না।

২০০১ সালে নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা এক নির্বাচনী জনসভায় মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় গেলে ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়াব।’ ব্যস, শুরু হয়ে গেল রাজনীতি। বাস্তবতা বড় কঠিন! ১০ টাকায় দেশের মানুষকে যে চাল খাওয়ানো সম্ভব নয়, সেটা শেখ হাসিনাও ভালো করেই জানতেন। বাজারে যখন মোটা চালের কেজিই ৪০-৪৫ টাকা, তখন তিনি ১৬ কোটি মানুষকে ১০ টাকা দরে চাল খাওয়াবেন কিভাবে? কিন্তু মুখের কথা তো গুলির মতো। একবার মুখ থেকে বের করলে তা আর ফেরানো যায় না।

শেখ হাসিনার সেই বক্তব্য নিয়ে বিএনপি তখন মাঠের রাজনীতি বেশ গরম করেছিল। আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার চালিয়েছিল। কিন্তু কথাটি মনে রেখেছিলেন শেখ হাসিনা। সবাইকে না হোক, হতদরিদ্রদের তো খাওয়ানো যায়! তাই তিনি হতদরিদ্রদের ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণের উদ্যোগ নিলেন। তাঁর মূল লক্ষ্য হচ্ছে, দেশ থেকে দারিদ্র্য দূর করা। তিনি বলেছেন, দেশে কোনো দরিদ্র থাকবে না। কেউ অনাহারে মারা যাবে না।

শেখ হাসিনা দেশের গৃহহীনদের তালিকা তৈরির জন্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন। গৃহহীনদের তিনি ঘর দেবেন। এসব মানবিক উদ্যোগ ব্যক্তি শেখ হাসিনারই শুধু নয়, তাঁর সরকারের ভাবমূর্তিকেও উজ্জ্বল করেছে। কিন্তু তা আবার ম্লান করে দিচ্ছেন তাঁর দলীয় নেতাকর্মীরা। চাল বিতরণ নিয়ে তাঁরা যা করছেন তা অবিলম্বে বন্ধ করা না হলে সরকারের জন্য বুমেরাং হবে।

আমরা শুরু থেকেই দেখে আসছি, ১০ টাকার চাল নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা চালবাজি করছেন। তাঁদের চালবাজিতে বঞ্চিত হচ্ছে হতদরিদ্র মানুষ। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী, বিত্তবান শ্রেণি, ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার, ডিলার সবাই পাল্লা দিয়ে চাল লুটপাট করছেন। কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। কোনো কোনো জায়গায় চাল নিয়ে নয়ছয় করার অপরাধে কিছু লোককে গ্রেপ্তার করা হলেও পরক্ষণেই তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

সরকার রাজনীতি করুক আর যা-ই করুক, দুঃসময়ে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণের সিদ্ধান্তটি খুবই সময়োপযোগী। কিন্তু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন। তারা ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে পেরে উঠছে না। স্থানীয় নেতাদের উচিত ছিল কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রশাসনকে সর্বতোভাবে সহায়তা করা। অথচ সহযোগিতার পরিবর্তে তাঁরা অসহযোগিতা তো করছেনই, উপরন্তু ১০ টাকার চাল দুস্থ-হতদরিদ্রদের দেওয়ার পরিবর্তে নিজেরাই লুটে খাচ্ছেন।

আমরা দেখেছি, প্রধানমন্ত্রী বারবার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের হুঁশিয়ার করেছেন। চাল লুটপাট করলে কঠোর শাস্তির ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই তাঁদের রোখা যাচ্ছে না। চালই যেন তাঁদের লুটপাটের প্রধান টার্গেট! তাঁদের কাছে শেখ হাসিনার আবেগ কিংবা মানবিকতার কোনো মূল্য নেই। তাঁদের একমাত্র ধান্দা নিজেদের আখের গোছানো। সেটা পারলেই হলো। তাতে কারো মানবিকতা যদি ভূলুণ্ঠিত হয়, হবে!

এর আগের লেখায়ও আমি উল্লেখ করেছি, আগেকার দিনে আবেগ, মানবতা ও মানবিকতার মূল্যই সবচেয়ে বেশি ছিল। নিজে খাবে আর প্রতিবেশী অভুক্ত থাকবে, তা হতো না। কিছু কর্তব্য মানুষ পালন করত। মহান সৃষ্টিকর্তা কিন্তু এ বিষয়ে বারবার মানুষকে সতর্ক করেছেন। আবার প্রকৃতিও মানবতার কথাই বলছে। সেখানে নিষ্ঠুরতা বা প্রতিশোধপরায়ণতার কোনো স্থান নেই।

অথচ পত্রিকার পাতা ওল্টালেই চোখে পড়ে নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা আর প্রতিশোধপরায়ণতার খবর! কেন মানুষ দিন দিন অমানুষে পরিণত হচ্ছে? একটা শিশুর ওপর নিষ্ঠুরতা চালিয়ে কী আনন্দ! তারা কি তাদের সন্তান, ভাইবোনের দিকে একবারও তাকায় না? যারা অন্যের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করে, তাদের সন্তানরাও তো একইভাবে নিষ্ঠুরতার শিকার হতে পারে। তখন তাদের কী অনুভূতি হবে? আসলে তাদের অনুভূতি বলে কিছু নেই!

কেউ অন্যায় করলে প্রকৃতির নিয়মেই তাকে শাস্তি ভোগ করতে হয়। আর দুনিয়ার নিয়মেও অন্যায়কারীর শাস্তি হয়। কিন্তু কারো ওপর জুলুম করার অধিকার কারো নেই। দরিদ্রের হক থেকে তাকে বঞ্চিত করার অধিকার কারো নেই। কিন্তু অবাক হই তখনই, যখন দেখি ভিক্ষুকের তালিকায় বিত্তবান আওয়ামী লীগ নেতার নাম! যে নির্লজ্জ নেতা ভিক্ষুকের তালিকায় নাম ঢুকিয়েছেন, জনসমক্ষে তাঁর বিচার করে জানিয়ে দেওয়া উচিত, অন্যায়কারীর কোনো ক্ষমা নেই। কিন্তু আমরা কার্যক্ষেত্রে কী দেখছি?

১০ টাকার চাল নিয়ে চালবাজির খবর প্রতিনিয়তই গণমাধ্যমে আসছে। অথচ কারো বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। শুধু তর্জন-গর্জন শোনা যাচ্ছে। কিছু কিছু জায়গায় চালবাজদের গ্রেপ্তারের খবর আমরা পত্রিকার পাতায় দেখছি। কিন্তু কারো বিরুদ্ধে শাস্তি হয়েছে কি না তা এখনো দেখা যায়নি। কারো শাস্তি হলেও তা হয়তো আমাদের জানার বাইরে।

একটা সময় ছিল, চোর-ডাকাতও সন্তানদের কাছে তাদের পেশার কথা গোপন রাখত। কারণ সন্তানরাও যদি তাদের পেশায় যোগ দেয়! কেউ নেশাখোর হলে সন্তানদের সামনে নেশা করত না। যদি সন্তানও নেশাখোর হয়! এখন সন্তানকে নিয়েই চুরি-ডাকাতি কিংবা নেশা করে। যারা চালবাজির সঙ্গে জড়িত তাদের খবর কিন্তু সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। তাদের ভাইবোন, সন্তানরাও জেনে যাচ্ছে যে তার পিতা অথবা ভাই চালবাজিতে জড়িত। এরা তখন মুখ দেখায় কী করে!

নিজের কথাই বলি, কেউ আমার প্রতি অন্যায়-অবিচার করলে তার পাল্টা হিসেবে প্রতিশোধ নেওয়ার মনোবৃত্তি পোষণ করি না। বিশ্বাসও করি না। প্রকৃতির বিচার বলে একটা কথা আছে। প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে চলে। অন্যায় করলে প্রকৃতিই তাকে শাস্তি দেয়। এ ধরনের হাজারো উদাহরণ দেওয়া যাবে। কাজেই প্রতিশোধ নেওয়ার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।

আমি ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে অনেক দেখেছি, কোথাও আমি অন্যায়-অবিচারের শিকার হয়েছি; পরে দেখা গেছে, যারা আমার ওপর অন্যায় করেছে, তারা শাস্তি পেয়েছে। কেউ আমার ওপর মানসিক নিপীড়ন চালিয়েছে। পরে তিনিও মানসিক নিপীড়নে পর্যুদস্ত হয়েছেন। এটাই প্রকৃতির বিধান।

পরজগতে কী হবে সে আলোচনা বাদ দিচ্ছি। দুনিয়াতেই যে অন্যায়কারীর শাস্তি হয় তা কিন্তু আমরা দেখে আসছি। চালবাজদের বিচারও হয়তো অন্যভাবে হবে। সে দৃশ্যও আমরা দেখব। আবার তাঁরা নিজেরাও তা টের পাবেন। তবে আমরা খুশি হতাম, যদি সরকার তাঁদের বিচার করত! সরকার নির্বিকার বসে আছে কী কারণে তা বুঝতে পারছি না।

সরকারের ভাবভঙ্গি দেখলে মনে হয়, তারা কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। কিংবা দেখেও না দেখার ভান করছে। নাকি হতদরিদ্রদের নামে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের ফুলেফেঁপে মোটাতাজা হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে!

১০ টাকার চাল নিয়ে কেউ রাজনীতি করুক সেটা যেমন আমরা দেখতে চাই না, আবার সেই চাল লুটপাট হোক সেটাও চাই না। এ ইস্যুতে পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিরোধ কামনা করি। আমরা আশা করি, সরকারও কঠোরভাবে ও আন্তরিকতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে। এই কর্মসূচি সফল হলে নিশ্চিতভাবে দেশের সামগ্রিক দারিদ্র্য বিমোচনে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

একই সঙ্গে বলতে চাই, মানুষের মানবিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারে সরকার, গণমাধ্যম, গণমান্য ব্যক্তিবর্গ, নাগরিকসমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবারের ভূমিকা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে পরিবারকে উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবারের কেউ অন্যায় করলে পরিবারের সদস্যরাই তার ভুল শোধরাতে পারে। পরিবার ব্যর্থ হলে প্রতিবেশীর সহায়তা নিতে পারে। তাতেও ব্যর্থ হলে আইনের আশ্রয় নিতে পারে।

প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে শিক্ষকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। এ বিষয়ে পাঠ্যপুস্তকে বিশেষ অধ্যায় সংযোজন করা যেতে পারে, যাতে শিক্ষার্থীদের ভেতরে মানবিক গুণাবলি তৈরি হয়। গণমাধ্যম সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিতে পারে। নাটক-সিনেমাতেও মানবিকতার বিষয়টি অগ্রাধিকার পেতে পারে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

mostofakamalbd@yahoo.com

Add Comment

Click here to post a comment