মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার লাইফ স্টাইল

‘হোমওয়ার্ক’-এর চাপ কতটা ভালো?

22মারুফ ইসলাম
স্কুলজীবন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে একটি শিশুর কাঁধে শুধু বইয়ের ব্যাগই চেপে বসে না; চেপে বসে আরেকটা জিনিস, অনেকটা জগদ্দল পাথরের মতো, তার নাম ‘হোমওয়ার্ক’। দীর্ঘ টিউশন–জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আজ অবধি একজন শিশুকেও খুঁজে পাইনি যে কিনা হাসিমুখে হোমওয়ার্ক করেছে। তবে এ বিষয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের রয়েছে বিপুল আগ্রহ। শিক্ষকেরা ক্লাসে একটি গণিতের সমাধান দেন আর হোমওয়ার্ক দেন পাঁচটি। এতে অবশ্য অভিভাবকেরা সন্তুষ্ট নন। তাঁরা চান আরও বেশি বেশি বাড়ির কাজ। একদিনের ঘটনা: ছাত্রের বাসায় গিয়েছি পড়াতে। দেখি ছাত্রটি জ্বরে শয্যাশায়ী। ছাত্রের মা বসতে বলে চা আনতে গেলেন। চা হাতে ফিরে এসে আলাপ শুরু করলেন এই বলে, ‘বাচ্চার নেশা তো শুধু টিভি দেখা আর ভিডিও গেমস খেলায়। আপনি কি ওরে হোমওয়ার্ক দেন না?’ মৃদু স্বরে বললাম, ‘স্কুলের টিচার তো অনেক হোমওয়ার্ক দেয়। এর বাইরে আমি আবার হোমওয়ার্ক দেব?’ ছাত্রের মা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বললেন, ‘ও মা! দেবেন না! চাপের মধ্যে না রাখলে ও কি মানুষ হবে?’
মানুষ হওয়ার পূর্বশর্ত যে ‘চাপ’, তা অবশ্য আমার জানা ছিল না। এই প্রথম এ রকম একটা ইউনিভার্সাল ট্রুথের মুখোমুখি হয়ে আমি খানিকটা বিপন্নবোধ করি। চোখের সামনে নিজের এক টুকরো শৈশব ভেসে ওঠে। সেটা যে প্রাগৈতিহাসিক কালের শৈশব, তা নয়। মাত্র বছর কুড়ি আগের কথা। তখন তো এত চাপ ছিল না। তাই বলে আমরা যে অমানুষ হয়ে গেছি, এমন অভিযোগ অবশ্য আজ অবধি কেউ করেনি।
তখনো হোমওয়ার্ক ছিল। অল্পবিস্তর। আমরা নিজেরাই সেসব সম্পন্ন করতে পারতাম। এখনকার অবস্থা বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়ের মতো। ক্লাসে কী পড়া হলো না–হলো, সেটা বড় কথা নয়, হোমওয়ার্ক দেওয়া চাই রাশি রাশি ভারা ভারা। ফলে স্কুল খোলা থাকার সময় তো বটেই, গ্রীষ্মকালীন ছুটি, শীতকালীন ছুটি, ঈদের ছুটি, পুজোর ছুটি ইত্যাদি যেকোনো ছুটির সময়েও শিশুদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে এন্তার বাড়ির কাজ।
সমস্যাটা বিদেশেও আছে। এ নিয়ে বিস্তর বিতর্ক উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত টাইম সাময়িকীর কিডস পাতায়। সেখানে একদল শিক্ষক-শিক্ষাবিদ-অভিভাবক বলছেন, হোমওয়ার্ক দেওয়া উচিত; তা না হলে শিশুদের পড়ালেখা করার ধারাবাহিকতা রক্ষা হয় না। শিশুরা পড়ালেখার চর্চা থেকে দূরে সরে যায়। একধরনের ‘স্টাডি গ্যাপ’ তৈরি হয়। পরে যখন স্কুল খোলে, তখন ওই শিশুদের স্টাডি গ্যাপ পূরণ করতে হিমশিম খেতে হয়। পড়ালেখায় মনঃসংযোগ করতে বেশি সময় লাগে। আর ছুটির মধ্যেও হোমওয়ার্ক করলে পড়ালেখার চর্চাটা অব্যাহত থাকে।
অপরদিকে আরেক দল শিক্ষক-শিক্ষাবিদ-অভিভাবক বলছেন, প্রতিদিন রুটিনমাফিক পড়ালেখা শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এতে শিশুর মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তাই মাঝেমধ্যে স্টাডি ব্রেক প্রয়োজন আছে। তাঁদের যুক্তি, অবকাশের ফলে শিশু আরও পূর্ণ উদ্যমে পড়ালেখা শুরু করতে পারে। তাই পড়ালেখার একঘেয়েমি কাটাতে মাঝেমধ্যে শিশুদের পরিপূর্ণভাবে ছুটি কাটাতে দেওয়া উচিত। এ সময় স্কুলের হোমওয়ার্ক না থাকাই ভালো।
কেন এই বিতর্ক? গত বছরের ৯ ডিসেম্বর টাইম কিডসে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, বিতর্কের সূত্রপাত নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যের প্রিন্সটন পাবলিক স্কুলের এক আইন থেকে। স্কুল কর্তৃপক্ষ আইন করে ওই স্কুলে হোমওয়ার্ক নিষিদ্ধ করেছে।
এবার অন্য এক খবরে চোখ বোলানো যাক। ৫ নভেম্বর এএফপি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ‘হোমওয়ার্ক বন্ধে অভিভাবকদের হরতালের হুমকি’ শিরোনামে। বিস্তারিত পড়ে জানা গেল, ঘটনাটি ঘটেছে স্পেনে। সে দেশের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের প্রায় ১২ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের সংগঠন স্প্যানিশ অ্যালায়েন্স অব প্যারেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (সিইএপিএ) এ হরতালের হুমকি দিয়েছে। সিইএপিএর প্রেসিডেন্ট হোসে লুই পাথস বলেছেন, শিশুদের পাঠক্রমবহির্ভূত অন্যান্য চর্চায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে ‘অবশ্যকরণীয় এই সাপ্তাহিক বাড়ির কাজ’।
তবে শেষ পর্যন্ত স্পেনের স্কুলগুলোতে হোমওয়ার্ক বন্ধ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে ফলোআপ সংবাদ খুঁজতে গুগলে আরও তল্লাশি চালাই। আশাব্যঞ্জক কোনো খবর মেলে না, কিন্তু চমকপ্রদ কিছু তথ্য পাই। যেমন আন্তর্জাতিক সংস্থা অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) তাদের প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্টের (পিআইএসএ) আওতায় ২০১২ সালে একটি শিক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ৩৮টি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এতে দেখা যায়, যে দেশগুলোয় শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি বাড়ির কাজ দেওয়া হয়, তাদের মধ্যে স্পেন পঞ্চম। এ তালিকায় স্পেনের আগে রয়েছে রাশিয়া, ইতালি, আয়ারল্যান্ড ও পোল্যান্ড। বাড়ির কাজের গড় সময় সপ্তাহে ৪ দশমিক ৯ ঘণ্টা ধরে পিআইএসএর ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, স্পেনে সপ্তাহে সাড়ে ছয় ঘণ্টা ‘হোমওয়ার্ক’ করতে হয়। ফিনল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় সবচেয়ে এগিয়ে। কিন্তু তাদের হোমওয়ার্কের পেছনে সপ্তাহে ব্যয় করতে হয় তিন ঘণ্টারও কম সময়। প্রতিবেদনটি এই বলে শেষ করেছে, স্পেনে শিক্ষার্থীদের ওপর হোমওয়ার্কের বাড়তি চাপ তাদের কোনো উপকারেই আসছে না। উল্টো গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ের পরীক্ষায় তারা অপেক্ষাকৃত কম নম্বর পাচ্ছে।
এসব ঘটনা থেকে বাংলাদেশ কি কোনো শিক্ষা নেবে? বলার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি এখনো সেকেলে। সমাজ গভীরভাবে বদলে গেছে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ এখনো বদলায়নি। মানুষ করার অভিপ্রায়ে শিশুদের আমরা আর কত ‘চাপের’ মধ্যে রাখব?

মারুফ ইসলাম: শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

Advertisements

Add Comment

Click here to post a comment