মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

হত্যা-নির্যাতন মুক্তচিন্তাকে রুদ্ধ করতে পারে না-ড. হারুন রশীদ

%e0%a6%a1-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a8-%e0%a6%b0%e0%a6%b6%e0%a7%80%e0%a6%a6বিজয়ের মাস ডিসেম্বর চলছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বাঙালি যখন দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে, ঠিক তখনই পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামসরা মেতে ওঠে বুদ্ধিজীবী নিধনের নির্মম হত্যাযজ্ঞে।

তারা প্রথিতযশা লেখক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, বুদ্ধিজীবীদের বাসাবাড়ি থেকে ধরে এনে নির্মম পাশবিকতায় হত্যা করে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে লাশ ফেলে রাখে। পুড়িয়ে দেওয়া হয় দৈনিক ইত্তেফাক ও সংবাদের অফিস।   ইত্তেফাকের সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, আবু তালেব, সংবাদের শহীদুল্লা কায়সার, পূর্বদেশের আ ন ম গোলাম মোস্তফা, সাপ্তাহিক ললনার নির্বাহী সম্পাদক মোহাম্মদ আক্তার, ‘স্টপ জেনোসাইড’খ্যাত সাংবাদিক চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান, সাহিত্য পত্রিকা শিলালিপির সম্পাদক সেলিনা পারভীনের মতো সাংবাদিক ব্যক্তিত্বকে তারা হত্যা করে। শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরের অনেক সাংবাদিককেও হত্যা করা হয় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে। তাঁদের সাহসিকতাকে ভয় করত পাকিস্তানি বাহিনী আর তাদের এ দেশীয় দোসররা। সেটাই তাঁদের জন্য কাল হয়েছিল।

দুই.

একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতে অপারেশন সার্চলাইটের নামে নারী-পুরুষ, ছাত্র, শিক্ষক, আবালবৃদ্ধবনিতা, পুলিশ-শ্রমিক অর্থাৎ নির্বিচারে নিরীহ বাঙালি হত্যায় মেতে ওঠে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা। এর আগে তারা ঢাকা থেকে সব বিদেশি সাংবাদিককে বহিষ্কার করে নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু বিবিসির সায়মন ড্রিং, এপির তৎকালীন পাকিস্তানের ব্যুরো চিফ আরনল্ড জেটলিন, ফ্রান্সের বিখ্যাত ফটোগ্রাফার মাইকেল লরেন্টের মতো কয়েকজন অকুতোভয় সাংবাদিক জীবনের মায়া ত্যাগ করে থেকে যান তৎকালীন হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে। পরদিন পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের নির্মমতা তারা নিজ চোখে অবলোকন করেন এবং বিশ্ববাসীকে জানান।

মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করা সাহসী সেসব সাংবাদিকের পাঠানো সংবাদ ও ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে গোটা বিশ্ব জানতে পারে এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের কথা। সেদিন যদি তাঁরা জীবনের এত বড় ঝুঁকি না নিতেন, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানি বাহিনী জ্বালাও-পোড়াও ও নির্মম হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যে ‘পোড়ামাটি নীতি’ গ্রহণ করে তা এত তাড়াতাড়ি এবং বিশদভাবে জানতে পারত না বিশ্ববাসী। ফলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠন সম্ভব হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত, ভুটানসহ বিশ্বের মুক্তিকামী দেশ বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। উল্লেখ্য, মাইকেল লরেন্ট বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ছবির জন্য পুলিত্জার পুরস্কারও লাভ করেন।

তিন.

বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে ১৪ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন মানিক সাহা, হুমায়ুন কবির বালু, শামছুর রহমান, দীপঙ্কর চক্রবর্তী প্রমুখ। দুঃখজনক হচ্ছে, জোট আমলে নিহত প্রায় কোনো সাংবাদিকেরই হত্যার বিচার হয়নি। যে কয়টির হয়েছে তার আসামিদের বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে প্রকারান্তরে হত্যাকারীদের রক্ষা করা হয়েছে।

মানিক সাহা। খুলনার নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক। সংবাদ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা জীবনের শুরু। কাজ করেছেন বিবিসির সংবাদদাতা, একুশে টেলিভিশনের খুলনা বিভাগীয় প্রতিনিধি হিসেবে। এরপর যোগ দেন ইংরেজি দৈনিক নিউএজে। ২০০৪ সালের ১৪ জানুয়ারি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের খুলনা মহানগর শাখার সম্মেলন। স্বভাবতই সংবাদকর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে উত্তেজনা। ওই দিন সকালেই বাসা থেকে বের হন মানিক সাহা। সারা দিন ব্যস্ত থাকেন সম্মেলনসহ নানা কাজে। যথারীতি প্রেস ক্লাবে আসেন। এরপর কাজ সেরে বাসায় যাওয়ার জন্য  রিকশায় ওঠেন।   কিছুদূর যেতেই কে যেন তাঁকে থামায়। এর পরই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ। আশপাশের জায়গা কেঁপে ওঠে। কোথায় এমন শব্দ হলো—দেখার জন্য প্রেস ক্লাবে বসে থাকা সাংবাদিকরা ছুটে আসেন। সবাই হতবাক। নিজের চোখকেও তাঁরা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কী ভয়ংকর দৃশ্য। উপুড় হয়ে পড়ে আছে মানিক সাহার  দেহ। মাথাটি যেন শরীর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। রক্তে সয়লাব চারদিক। দ্রুত খবর ছড়িয়ে পড়ে। বেদনায় মুষড়ে পড়েন সবাই। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার সারা দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে অত্যাচার-নির্যাতন চালায় তার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন মানিক সাহা। ধারণা করা হয়, এ কারণেই তাঁকে করুণ মৃত্যুবরণ করতে হয়।

চার.

দীর্ঘ এক যুগ পর মানিক সাহা হত্যা মামলার রায় হয়েছে সম্প্রতি। রায়ে আদালত ১১ আসামির মধ্যে ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। খালাস পেয়েছে দুই আসামি, তবে বিস্ফোরক মামলায় সাক্ষ্যের অভাবে কোনো আসামির সাজা হয়নি। সাজাপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গত বুধবার দুপুর দেড়টায় খুলনা বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ এম এ রব হাওলাদারের আদালত এ রায় দেন। খুব সংগত কারণেই স্বজনরা এই রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। হত্যা মামলার রায়ে বিচারক তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছেন, তদন্তে দুর্বলতা ছিল। এমন আলোচিত একটি মামলার তদন্তেও যদি দুর্বলতা থাকে এবং সেই সুযোগে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে। বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে যে সাংবাদিকদের হত্যা করা হয়েছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেসব হত্যার সুষ্ঠু বিচার হবে—এটাই আশা করে দেশের মানুষ।

পাঁচ.

সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। নোবেলজয়ী লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, যিনি পেশায় একজন সাংবাদিক, তিনি তাঁর এক লেখায় বলেছেন, ‘সাংবাদিকতা বিশ্বের এক নম্বর পেশা’। একজন ন্যায়নিষ্ঠাবান  সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে সত্য তুলে আনা। এ জন্য সংবাদপত্রকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। সংবাদপত্রের দর্পণে সরকারের কাজের প্রকৃত চিত্র প্রতিফলনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। সাংবাদিকতা বিপন্ন হলে গণতন্ত্রও বিপন্ন হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের তিনটি শাখা বা স্তম্ভ। নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগ। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণমাধ্যম হচ্ছে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ—ফোর্থ এস্টেট। সংবাদপত্রকে দ্বিতীয় পার্লামেন্টও বলা হয়ে থাকে।

একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং তথ্যের অধিকার যখন স্বীকার করে নেওয়া হয় তখন প্রকারান্তরে এটাও মেনে নেওয়া হয় যে সব চিন্তা, সব মতামত কিংবা সংবাদ সবার অনুকূলে যাবে না। এ জন্য যারা পাবলিক ফিগার কিংবা সমাজে যাদের সুনাম-দুর্নাম রয়েছে তাদের নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হবেই। এ জন্য সাধারণের তুলনায় তাদের সহ্যশক্তি একটু বেশি থাকাই বাঞ্ছনীয়। এ জন্যই বলা হয় পরমতসহিষ্ণুতাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এর উল্টোটাই পরিলক্ষিত হয়।

ছয়.

সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে, ‘অসির চেয়ে মসি শক্তিশালী’। কিন্তু  বিশ্বজুড়ে আজ যেন অসি শক্তিরই দাপট। সাংবাদিকতা মানেই যেন নির্যাতন, ঝুঁকিপূর্ণ জীবন। এর কোনো দেশ-কাল-পাত্র নেই। এই সরকার, সেই সরকারের ভেদ নেই। সব দেশেই সব সরকারের আমলে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। একটি কথা মনে রাখা দরকার, সাংবাদিকরা নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেন ইতিবাচক পরিবর্তনের আশায়। কিন্তু অন্যপক্ষ এটাকে ভালোভাবে নেয় না। অথচ পরমতসহিষ্ণুতা ছাড়া গণতন্ত্রের বিকাশ অকল্পনীয়। পরমতসহিষ্ণুতার নিজেরই একটি শক্তি আছে, যা অগণতন্ত্রের বিপক্ষে দুর্দমনীয় ও অব্যর্থ। এ কারণে অহিষ্ণুতা এবং দোর্দণ্ড প্রতাপশালীদের বিপক্ষে সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। যত দিন সভ্যতা থাকবে, ভালো এবং মন্দের দ্বন্দ্বও থাকবে তত দিন। এ কারণে মন্দকে উজিয়ে ভালোর দিকে অভিযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে সত্য সন্ধানব্রতী নিষ্ঠাবান সাংবাদিকদের। যত বাধাই আসুক না কেন ‘নিকষে সোনার রেখা’ অঙ্কন করাই তো একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব। আর এভাবেই দেখা মিলবে আলোর। দূর হবে অমানিশার অন্ধকার।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

harun_press@yahoo.com

Advertisements

Add Comment

Click here to post a comment