মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

স্মৃতি আর সৃষ্টিতে হুমায়ূন-সালেহ চৌধুরী

123১৩ নভেম্বর হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন। এই ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর হুমায়ূন যদি বেঁচে থাকতেন তাঁর বয়স হতো ৬৮ বছর। সে আর এমনকি বয়স, বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির এই যুগে! স্বল্প আয়ের আমাদের এই দেশেও তো গড় আয়ু এ সীমা ছাড়াতে চলেছে। হুমায়ূন তো এখনো থাকতেই পারতেন আমাদের মধ্যে। নতুন থেকে নতুনতর রচনায় ঋদ্ধ করতে পারতেন আমাদের সাহিত্যের ভাণ্ডার।

এ সবই অর্থহীন জল্পনা। জানি। জীবন অঙ্কের হিসাব মানে না। চাওয়া-না চাওয়ার ধার ধারে না। আমাদের বিবেচনায় অযৌক্তিক, তেমন একটা সীমায় ইতিরেখা টানাই যেন তার রীতি। মরণশীল মানুষ এ নিয়ে আহাজারি করতে পারে কিন্তু এ ধারা বদলানোর শক্তি কারো নেই।

জন্মদিনের অনুষ্ঠান সামনে নিয়ে লিখতে বসেও চলে যাওয়ার কথাই বড় করে মনে আসছে। আমি একেও অহেতুক মনে করি না। হুমায়ূন ছিলেন এক মহান দাতা। অজস্র ধারায় তিনি দান করে গেছেন। আমরা দুহাত আর প্রাণভরে তা গ্রহণ করেছি। সেই দেওয়া-পাওয়ার স্রোত থেমে গেছে, এই ভাবনা আনন্দের উপলক্ষেও বিষাদের প্রলেপ বোলায়। তাঁকে হারিয়ে তাঁর জন্মদিনে আমি নিখাদ আনন্দে মেতে উঠতে পারি না। আমাদের চাওয়া তো ফুরিয়ে যায়নি।

সব অন্ধকারের যেমন একটা শেষ থাকে, তেমনি সব দুঃখের সঙ্গেও থাকে উত্তরণের কিছু না কিছু উপায়। আমি নিজের জন্য তেমনি একটা পথ খুঁজে নিয়েছি। তা হচ্ছে, ওঁকে কাছে পাওয়ার, ওঁর কাছ থেকে কিছু পাওয়ার ইচ্ছা যখন প্রবল হয়ে ওঠে, আমি চেষ্টা করি হুমায়ূন-সাহিত্যে ডুব দিতে। একজন স্রষ্টাকে খুঁজে পাওয়ার প্রকৃষ্ট স্থান তো তাঁর সৃষ্টিই। সাগরে প্রতি ডুবেই মুক্তা মেলে না। তবে হুমায়ূন-সাহিত্যে ফিরে গেলে প্রতিবারই নতুন নতুন প্রাপ্তিতে মন ভরে ওঠে।

ব্যাপারটা কেমন তা বোঝাতে আরেকজন বরেণ্য লেখকের কথা বলি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এসেছেন। তাঁকে ঘিরে আড্ডা বসেছে হুমায়ূনের বাসায়। হুমায়ূনের বাসায় আড্ডা, উপস্থিত সবাই হুমায়ূন-সাহিত্য নিয়ে কথা বলছিলেন। বিশিষ্ট মেহমানের কাছে নিজেকে জাহির করার উদ্দেশ্যে একজনকে ছাড়িয়ে উঠছিল অন্যের কণ্ঠ। আর কথাগুলো এমন—আহা, ওই গল্পের সেই ঘটনাটা, কী তার চমক! ইত্যাদি ইত্যাদি।

অবশ্যই হুমায়ূন ছিলেন একজন দক্ষ কথাকার। তাঁর রচনায় কথা বা গল্পাংশের প্রাধান্য থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। সবাই সেই গল্পের শাখা-প্রশাখায় পাক খাচ্ছিলেন।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্ভবত বিরক্ত বোধ করলেন। তাই নীরব শ্রোতা হয়ে না থেকে একসময় সরব হয়ে উঠলেন। বললেন, ‘মনে হচ্ছে আপনারা হুমায়ূন পড়েননি। শুধু গল্পের সিঁড়ি ভেঙেছেন। হুমায়ূন পড়ি আমি। গল্প আর চমকের আড়ালে অনেক কিছু খুঁজে পাই।’

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো বোদ্ধা আমি নই, তবে তাঁর এই মতের সঙ্গে আমি একমত। ব্যক্তির যেমন বাইরের আর অন্তরের রূপ স্বতন্ত্র, তেমনি সাহিত্যেরও দুটি রূপ আছে—বাইরের অবয়ব আর ভেতরের সত্য। আর এই দুইয়েরই কত ভাগ, কত চমক! শিল্প মাত্রের সম্পর্কেই এ উক্তি সমান সত্য। তবে হ্যাঁ, তার শর্ত একটা আছে। সে শর্তটা হচ্ছে তাকে সার্থক সৃষ্টি হতে হবে।

আর হুমায়ূনের সৃষ্টির সার্থকতা নিয়ে এখন আর কে প্রশ্ন তুলবেন? যখন তাঁর চলে যাওয়ার চার বছর পরও অমর একুশে বইমেলায় তাঁর বইয়ের চাহিদাই সবাইকে ছাড়িয়ে যায়? এ উক্তির সঙ্গে এ কথাটা মনে রাখতে হবে, চালাকি বা মেকি চমক দিয়ে পাঠককে একবার প্রতারিত করা সম্ভব হলেও এই প্রতারণা অব্যাহত রাখা যায় না। আদত সত্য সামনে উঠে আসবেই। সারবস্তু আছে বলেই সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হুমায়ূন সাহিত্যের কদর বেড়ে চলেছে।

আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা কিছু বলি। গত কয়েকটি মাস প্রয়োজনের তাগিদেই আমাকে হুমায়ূনের কিছু বই ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়েছে। দেখলাম, ওতে প্রয়োজন মেটানোর স্বস্তির চেয়ে আনন্দের পাল্লা মোটেই হালকা থাকেনি। প্রতি পাঠে পেয়েছি তৃপ্তির নতুনতর উপাদান।

একসময় অভিযোগ ছিল শুধু মধ্যবিত্ত জীবনের পরিমণ্ডলেই হুমায়ূনের বিচরণ। কথাটি আংশিক সত্যও বটে। নিম্ন ও উচ্চবিত্তের কিছু ছবি তিনি আঁকলেও সংখ্যায় তা কম। মধ্যবিত্ত থেকে খসে পড়াদের কিছু দেখাও হুমায়ূনে মেলে, তবে তাঁর মনোযোগের বড় আকর্ষণ তারা নয় কিন্তু তাতে কি? শেক্সপিয়ার তো প্রধানত রাজকীয় পরিমণ্ডলই এঁকেছেন। তাতে কি তিনি বাতিল হয়ে গেছেন? আদতে চরিত্রের এই বাইরের পরিচয়ের সীমা ছাড়িয়ে তার অন্তরের গভীরতম প্রদেশে নেমে মানবসত্য আর জীবনসৌন্দর্য উদ্ঘাটনই তো শেক্সপিয়ারকে অমর করে রেখেছে। মধ্যবিত্তের চরিত্র অবলম্বনে হুমায়ূনও তো একই কাজ করেছেন। আবার মধ্যবিত্ত বলে যাদের চিহ্নিত করি, তারা সবাই কি একে অন্যের প্রতিরূপ? আদতে সে তো বৈচিত্র্যের বিশাল ভাণ্ডার। হুমায়ূন-সাহিত্যে তাই বৈচিত্র্যের এমন রমরমা উপস্থিতি।

সাদামাটাভাবে শুরু করে হুমায়ূন গল্পের জাল ছড়িয়ে যান। পরিবেশ কিংবা চরিত্র—কারো বিস্তারিত বর্ণনায় হুমায়ূন যান না। ঘটনা আর সংলাপের পাখায় ভর করে তিনি উড়ে চলেন অনায়াস ভঙ্গিতে। পাঠক বুঝতেও পারেন না, কখন তিনি গল্পের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়েছেন। সহজ ভঙ্গির শিল্পনৈপুণ্য উপভোগের ক্ষেত্রে সহজ হলেও উপলব্ধির জন্য কিছু প্রস্তুতি কিংবা শিল্প-অভিজ্ঞতা আবশ্যিক। সাধারণ পাঠক আমার চেয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে আলাদা বস্তু। মূল বস্তু।

ওর বিরুদ্ধে সর্বশেষ অভিযোগ যা আমার কানে এসেছে তা হচ্ছে, খেয়ালি মানুষ হুমায়ূন খেয়ালিপনা দিয়েই লেখা শুরু করেন। আর একসময় খামখেয়ালির মতো লেখায় সমাপ্তি টেনে দেন। অর্থাৎ যৌক্তিক উপসংহারে আর যান না। এ কথার অন্য অর্থ যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে, হুমায়ূন নিজ লেখার প্রতি মমতা বা দায়িত্বশীল নন। এর চেয়ে ভ্রমাত্মক বা মারাত্মক অভিযোগ আর কিছু হয় না।

সৃষ্টির প্রতি মমত্ব আর দায়িত্ববোধই শিল্প-সার্থকতার নিয়ামক। এতে ফাঁক বা ফাঁকির কোনো অবকাশই নেই। হুমায়ূন আর যাই করুন, সৃষ্টিতে কখনো ফাঁকি দেননি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হুমায়ূন কখনো প্রকাশিত রচনায় ঘষামাজা করতেন না। সে এ জন্য যে তার প্রয়োজনই তিনি বোধ করতেন না। কেননা যা করেছেন, জেনে-বুঝেই করেছেন। এই উপলব্ধিতে চিড় ধরলেই শুধু নতুন করে ঘষামাজার প্রশ্ন আসত। একবার অন্তত হুমায়ূন তা করেছেন। ‘নীল অপরাজিতা’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হলে তাঁর মনে হলো, কিছু চরিত্রের প্রতি তিনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে দ্বিতীয় সংস্করণেই বইটির অনেক কিছু পালটে দিলেন। ভূমিকায় তার স্বীকৃতিও স্থায়ী করে রাখলেন।

উপসংহার প্রসঙ্গ দিয়েই এই নিবন্ধে ইতি টানছি। হ্যাঁ, তাঁর অনেক বই পড়েই মনে হতে পারে, আরো কিছু বলা যেতে পারত। হুমায়ূন অমনটা মনে করতেন না বলেই নটে গাছটি মুড়িয়ে দেওয়া পর্যন্ত এগোননি। এর মূলে আছে পাঠকের প্রতি তাঁর আস্থা। আর শুধু আনন্দ দেওয়াই নয়, তাকে কিছু ভাবতে বাধ্য করা।

জন্মদিনে তাঁর স্মৃতি আর সৃষ্টিতে আমি তাই এক অনন্য শিল্পীকে কাছে পাই। ঘটে আত্মিক পরিতৃপ্তি।

লেখক : সাংবাদিক



আজকের জনপ্রিয় খবরঃ

গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ:

  1. বুখারী শরীফ Android App: Download করে প্রতিদিন ২টি হাদিস পড়ুন।
  2. পুলিশ ও RAB এর ফোন নম্বর অ্যাপটি ডাউনলোড করে আপনার ফোনে সংগ্রহ করে রাখুন।
  3. প্রতিদিন আজকের দিনের ইতিহাস পড়ুন Android App থেকে। Download করুন

Add Comment

Click here to post a comment