মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

স্মৃতিতে অনন্য এক কালজয়ী মানুষ-দিল মনোয়ারা মনু

123কবি সুফিয়া কামাল আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় জননী সাহসিকা। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় প্রায় ২৫ বছরের। দেশপ্রেম, ভালোবাসা, সততা, দৃঢ়তা, প্রজ্ঞা ও সহিষ্ণুতার অনন্য সমন্বয় এই চরিত্রটির কাছ থেকে যা শিখেছি তা জীবনে এক পরম পাওয়া।

নারীমুক্তি ও নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করে তিনি যে প্রজ্ঞা ও সাহসের পরিচয় দিয়েছেন নারীর মুক্তিকে মানবমুক্তি হিসেবে বিবেচনা করে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে, জাতির বিবেক হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন তাঁর সেই নির্ভীক নিরন্তর কর্মপ্রয়াস, চিত্তের গভীর দীপ্তি সংঘাতে-সংকটে আমাদের পথ দেখিয়েছে।

কবি সুফিয়া কামাল জীবিতকালেই ইনস্টিটিউশনে পরিণত হয়েছেন। রবিশালে শায়েস্তাবাদের অবরোধবাসিনী এই মানুষটি সম্পূর্ণ নিজের মেধা ও সাহসকে পুঁজি করে বাঙালিত্বের প্রতিভূ হিসেবে বিশ্বসভায় নিজের আসন করে নিলেন। চেকোস্লোভাকিয়ার সংগ্রামী নারী পদক, লেনিন পদকে ভূষিত হয়ে শুধু নিজেকে নয়, সমগ্র দেশকে, দেশের মানুষকে মহিমান্বিত করলেন। তাঁকে আবিষ্কার তাই নব নব পর্যায়ে, নব নব সময়ে।

মনে পড়ে হবিগঞ্জের কথা। কচিকাঁচার মেলা থেকে সেখানে গিয়েছি আমরা সম্মেলনে অংশ নিতে। জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে আমাদের অবস্থান। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত খালাম্মাকে ঘিরে সর্বস্তরের মানুষের আনন্দ-উল্লাস। যেন এক বর্ণাঢ্য উৎসব। কত সহজে সব রকম, সব বয়সের মানুষকে আপন করে নেওয়া যায়, এ যেন তাঁর অপূর্ব নিদর্শন। এই মধুর সময় অতিক্রান্তের পর ফিরে আসার সময় শোকের ঘন বিষাদের ছায়া সবার প্রাণ ছুঁয়ে যায়। অন্তরের সব দরদ মিশিয়ে কচিকাঁচারা তাঁকে খালাম্মা ডেকে আনন্দ ও তৃপ্তি পেতেন।

ওদের আদর করে কাছে টেনে নিয়ে আবৃত্তি ও গান শুনতেন। তিনি হেঁটেছেন কচিকাঁচাদের সঙ্গে মাইলের পর মাইল। বগুড়ায় অনুষ্ঠিত উত্তরবঙ্গ কচিকাঁচার সম্মেলনে তিনি রেলস্টেশন থেকে হেঁটে মিছিলে অংশ নিয়ে হল প্রাঙ্গণে সমবেত হলেন। মানিকগঞ্জের চারিগ্রাম সম্মেলনের জন্য তিনি হেঁটেছিলেন প্রায় দুই মাইল। তার পরও ক্লান্তি  ছিল না এতটুকুও। শ্রীমঙ্গল কচিকাঁচার মেলার সম্মেলনে কচিকাঁচারা আয়োজন করেছিল এক পিকনিকের। টিলার ওপর আয়োজিত এই পিকনিকে খালাম্মা ছিলেন মধ্যমণি। তর তর করে সিঁড়ি ভেঙে তিনি বারবার ওঠানামা করলেন এই টিলায়। খাসিয়া দলপতির ঘরে বসে সবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কথা বললেন। ডিসেম্বরের কনকনে শীতেও তিনি এভাবে হেঁটে হেঁটে অংশ নিতে দ্বিধা করতেন না। বরিশাল জেলা কচিকাঁচা সম্মেলনে যোগ দিতে যাওয়ার পথে স্টিমারের ডেকে কচিকাঁচাদের সঙ্গে প্রায় সারা রাত গান ও কবিতা শুনে কাটিয়ে দিলেন। দাদাভাই ঢোল বাজালেন। কেবিন রইল তালাবদ্ধ।

এ দেশের অধিকারবঞ্চিত ও নির্যাতিত নারীদের সংগঠন হিসেবে মহিলা পরিষদকে পরিপূর্ণভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর যে উদ্বেগ ও ব্যাকুলতা লক্ষ করেছি, তা ভোলার নয়। মহিলা পরিষদের নিজস্ব একটি বাড়ি হোক—এই ছিল তাঁর একান্ত চাওয়া এবং সেই বাড়িকে কেন্দ্র করে হাজারো কার্যক্রম বিকশিত ও ফলপ্রসূ হোক—এ স্বপ্ন তিনি সব সময় দেখতেন। তাই তো ভবন উদ্বোধনের দিন তাঁর চোখেমুখের উপচে পড়া সেই আনন্দ সবাইকে ছুঁয়ে গেছে। তিনি বলেছিলেন, আজ পায়ের নিচে মাটি হয়েছে। দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে সব অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারবে আমার মেয়েরা। এমনি ব্যাকুলতা ছিল তাঁর কচিকাঁচা ভবন নিয়েও। এই ভবনের উদ্বোধনের দিন দাদাভাইয়ের অনুরোধ উপেক্ষা করে অসুস্থ শরীরে তিনি দেয়াল ধরে ধরে দোতলা, তিনতলা ঘুরে ঘুরে দেখলেন। বেশ কিছুক্ষণ ছাদে বসলেনও। সেদিনও তাঁর মধ্যে একধরনের জয় করার আনন্দ দেখেছি। সুফিয়া কামাল নারীর অধিকার আদায়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে সর্বোপরি রাজনৈতিক আন্দোলনে ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতির বিবেক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত সম্মান। বাংলাদেশের নারীদের তিনি অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছেন। মেরুদণ্ড শক্ত করে দাঁড় করিয়েছেন। বাংলাদেশ ইউনিফর্ম কোডের জন্য যে আন্দোলন দেখা যাচ্ছে তার পশ্চাতে রয়েছে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা। তিনি নারী-পুরুষের এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের সমানাধিকার নিয়ে লড়াই করেছেন। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।

নিজের মধুর আচরণ দিয়ে সবাইকে আপন করে নেওয়ার যে শিক্ষা তাঁর চরিত্রকে মহিমান্বিত করেছে। কালজয়ী এই মানুষটি বেঁচে থাকবেন তাঁর সবটুকু ভালোবাসা ও মর্যাদা নিয়ে। মনে পড়ে, নরওয়ে থেকে একটি শিশু প্রতিনিধিদল এসেছিল ঢাকার কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলার আমন্ত্রণে। খালাম্মার বাসায় বেশ কিছু সময় কাটানোর পর এই প্রতিনিধিদলের নেতা মি. আনকোর বলেছিলেন, তিনি সাধারণ কিন্তু অনেক বড়। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেও বাইরের দেশের এই মানুষেরা তাঁর বিশালত্বকে অনুভব করতে পেরেছিলেন। পঞ্চাশের শেষ ও ষাটের দশকের শুরুটা খালাম্মার কেটেছে মহিলা সমিতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে।

যত দিন বেঁচে ছিলেন গভীর মমত্ববোধ নিয়ে এর সব কাজ পর্যালোচনা করতেন। বেগম ক্লাবের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখেছি তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। স্বাধীনতার পর রোকেয়ার স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য তাঁর যে চেষ্টা ও ব্যাকুলতা তা ভোলার নয়। সমাজের সব অন্যায় অসংগতির বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ ও সুন্দর শুভকাজে একাত্ম হওয়া, তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে আজীবন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। এই অকুতোভয় সাহসী নেত্রীর স্থান কি কখনো পূরণ হবে? খালাম্মাকে নিয়ে গিয়েছিলাম আমাদের এলাকার এক বিখ্যাত গ্রাম কলাকোপায়। কলাকোপা বালিকা বিদ্যালয়ের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে তাঁর যাওয়া। শুধু স্কুল ঘিরেই নয়, সারা নবাবগঞ্জ থানায় যেন উৎসবের সাড়া পড়ে যায়। স্কুলের ছাত্রী-শিক্ষকদের সঙ্গে বিরাট মিছিলে অংশ নেওয়া, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের পাশাপাশি তিনি কলাকোপার হিন্দু জমিদারদের অপূর্ব স্থাপত্য নিদর্শনসমৃদ্ধ প্রাসাদ, পুকুর, বাগানবাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখলেন। গ্রামের হিন্দু-মুসলমান তরুণী, মহিলারা তাঁর চারপাশ ঘিরে বসতেন। বয়স্করা তাঁর হাতের তৈরি পান খেতেন। মহিলারাও খালি হাতে আসতেন না। নানা ধরনের পিঠে, পায়েস, নলেন গুড়, খেজুরের রস সঙ্গে নিয়ে আসতেন। খালাম্মা মিষ্টি হেসে পরম আন্তরিকতার সঙ্গে এসব নিজ হাতে সবাইকে পরিবেশন করতেন। এই কোমল-নরম মানুষটিও জাতীয় পর্যায়সহ যেকোনো সময় প্রয়োজনে কি কঠোর হতে পারতেন তার বহু উল্লেখযোগ্য ঘটনা আমাদের জানা আছে।

কবি সুফিয়া কামাল বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি ধারার সঙ্গে জড়িত। তিনি অধিকারবঞ্চিত নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, শিশুদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ, কল্যাণকামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, আইনের সংস্কার, নতুন আইন তৈরি, ফতোয়াবিরোধী বিবৃতি, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতৃত্বসহ আন্তর্জাতিক নারী ও শান্তি সম্মেলনে বহু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। দেশ-বিদেশে সাহিত্য সম্মেলনেও তিনি ছিলেন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি সব শাখায়ই ছিল তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য বিচরণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বেগম রোকেয়া, কাজী নজরুল ইসলাম তাঁকে মূল্যায়ন করেছেন নানাভাবে। আইয়ুবের সামরিক শাসনামলে অনেক সংগ্রামী বুদ্ধিজীবী মাথা নত করেছেন কিন্তু এই মানুষটি সব সময়ই অবিচল উন্নত শির। চরিত্রের এই দৃঢ়তার কারণেই তিনি মুক্তবুদ্ধি ও জাতির বিবেকের প্রতীক হিসেবে আজ সমাদৃত।

সমাজের জমাট বাঁধা অন্ধকার তাড়াতে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যে দীপশিখা তিনি প্রজ্বলিত রাখার সংগ্রাম করে গেছেন সেই সংগ্রাম আমরা অব্যাহত রাখব। কেবল সুফিয়া কামালের আদর্শিক সমাজ বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন সম্ভব। তিনি বেঁচে থাকুন আমাদের কর্মযজ্ঞে।

লেখক : সাংবাদিক ও নারী অধিকারকর্মী

Add Comment

Click here to post a comment