[widgets_on_pages id=3][widgets_on_pages id=2]
Default

স্থানীয় এমপিসহ ১৬ জনকে চিহ্নিত করেছেন সাঁওতালরা

qগাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে হামলার ঘটনায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় এমপিসহ ১৬ জনকে চিহ্নিত করেছেন সাঁওতালরা। এদের কেউ হামলার ইন্ধনদাতা, কেউ পরিকল্পনাকারী, কেউ আবার প্রত্যক্ষভাবে হামলা ও অগ্নিসংযোগে অংশ নিয়েছে।
সাঁওতাল নেতারা জানান, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তারা এ তালিকা প্রশাসন, আদিবাসী ও মানবাধিকার সংগঠনসহ যেখানে প্রয়োজন সেখানেই সরবরাহ করবেন।
সাঁওতালদের অভিযোগ, হামলায় সরাসরি ইন্ধন দিয়েছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ, শাপমারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাকিল আকন্দ বুলবুল, কাটাবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম রফিক ও মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ প্রধান।
এর মধ্যে শাপমারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাকিল আকন্দ বুলবুল ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। রংপুর সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল আওয়াল ছিলেন ঘটনার অন্যতম পরিকল্পনাকারী। আগুন দেয়ার সময় সুগার মিলের গার্ড ভুলু, আলম ও লতিফ এবং ওয়াচম্যান বাবলুকে চিনতে পেরেছেন সাঁওতালরা।
এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ফুকু হোসেন, রুহুল আমিন, মিজানুর রহমান, হেলাল, লখিমুদ্দিন, নুরুল ও মানাজ নামে কয়েকজন পুলিশের সামনেই আগুন দিয়েছে।
এই তালিকা কীভাবে তৈরি করা হয়েছে- জানতে চাইলে সাঁওতাল নেতা ভির্জিলিউস হেমরম বলেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও ঘটনা পর্যালোচনা করেই এ তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে হামলাকারীদের অধিকাংশই বহিরাগত। তারা সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ ও ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আকন্দ বুলবুলের ভাড়া করা সন্ত্রাসী।’
সাঁওতালরা জানান, চার মাস ধরেই তাদের উচ্ছেদ করতে সুগার মিল কর্তৃপক্ষ ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ইন্ধনে পুলিশ ও দুর্বৃত্তরা তাদের ওপর হামলা চালায়। অথচ কোনো ঘটনাতেই তারা মামলা করতে পারেননি। উল্টো পুলিশের করা তিন মামলার হুলিয়া মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির নেতারা।
তারা বলেন, হামলা-মামলা করেও তাদের উচ্ছেদ করতে না পেরে আখ মাড়াইয়ের নাম করে ৬ নভেম্বর পরিকল্পিতভাবে তাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের ওপর গুলি ছুড়েছেন। তারাও তীর-ধনুক নিয়ে হামলা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছে। এতে তিনজনের মৃত্যু হয়।
তাদের দাবি, স্থানীয় সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদের সন্ত্রাসী বাহিনীর পাশাপাশি রংপুর সুগার মিলের নিরাপত্তা কর্মীরা অন্তত এক হাজার ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। বাগদা ফার্মে যেখানে তাদের বসতি ছিল সেখানে এখন কোনো ঘরবাড়ির চিহ্ন পর্যন্ত নেই। সেখানে ঘর ছিল এটা বোঝারও কোনো উপায় নেই। এখন সেখানে চলছে চাষাবাদের কাজ। দেয়া হচ্ছে কাঁটাতারের বেড়া।
স্থানীয়রা জানান, চেয়ারম্যান শাকিল আকন্দ বুলবুল সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি। অথচ হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী তিনি।
টাটু টুডু নামে এক সাঁওতাল বলেন, সুগার মিলের জমির ইজারা না পেয়ে তিনি সাঁওতাল ও বাঙালিদের একত্র করে সুগার মিলের কাছ থেকে জমি উদ্ধারে আন্দোলন শুরু করেন। নির্বাচনের আগে এ নিয়ে ব্যাপক তৎপর ছিলেন তিনি। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি এ আন্দোলন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন।
সাঁওতালদের অভিযোগ অস্বীকার করে শাপমারা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান শাকিল আকন্দ বুলবুল বলেন, ভূমি উদ্ধার আন্দোলনে আমি যুক্ত হয়েছিলাম না বুঝে। পরে বুঝতে পেরে আমি আন্দোলন থেকে সরে আসি। ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত থাকলেও হামলার সঙ্গে তার কোনো যোগসূত্র নেই বলে দাবি করেন তিনি।
রংপুর সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল আওয়াল বলেন, আগুন দেয়ার ঘটনার সঙ্গে মিল কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। কোনো গার্ড সেখানে আগুন দেননি। তাদের ঘর-বাড়িতে লুটপাট করার মতো কিছু ছিল না।
স্থানীয় সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ অভিযোগের বিষয়ে বলেন, তিনি ঘটনার সময় গোবিন্দগঞ্জে ছিলেন না। হামলার সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাকিল আকন্দ বুলবুলকে দায়ী করেছেন।
কাটাবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, আপনি তদন্ত করে দেখেন। এ ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। মহিমাগঞ্জ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ প্রধানও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
৩০ থেকে ৪০ জন নিখোঁজ : সাঁওতালদের উচ্ছেদের ১০ দিন পরও অনেককেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। সাঁওতাল নেতা ভির্জিলিউস হেমরম বলেন, প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন নিখোঁজ। তারা কোথায় আছেন আমরা জানি না। সাঁওতালদের দাবি, তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও লাশ গুম করার ঘটনাও ঘটতে পারে।
মাদারগঞ্জ গির্জার সামনে কথা হয় সীতা পাহাড়ির সঙ্গে। ৪ মাস আগে তিন ছেলেকে নিয়ে বাগদা ফার্মে বসতি স্থাপন করেছিলেন তিনি। হামলার পর থেকে ছেলে বাবুল, স্বপন ও সুমনকে খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি। ছেলেরা বেঁচে আছে নাকি মরা গেছে কিছুই তিনি জানেন না।
সিলিনা মান্দি নামে আরেক সাঁওতাল জানান, তার স্বামী মুন্টু মুরুমকে খুঁজে পাচ্ছেন না।
সরেজমিন দেখা গেছে, মাদারপুর ও জয়পুর মৌজার পাশ দিয়ে দেয়া হচ্ছে কাঁটাতারের বেড়া। বুধবারও সেখানে কাজ চলছিল।
অন্যদিকে মাদারপুর গির্জার সামনে ঘর হারানো সাঁওতালরা অর্ধাহারে, অনাহারে দিনাতিপাত করছেন। বেলা ১১টার দিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সীমিত ত্রাণ দেয়া হয়। এ সময় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তারা ত্রাণ সংগ্রহ করেন।
গাইবান্ধা পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনার পেছনে প্রভাবশালী কোনো মহলের ইন্ধন থাকলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।
হামলার পর আসামি হন ভুক্তভোগীরা : পূর্বপুরুষের কাছ থেকে জোরপূর্বক অধিগ্রহণ করা কিছু জমি দখল করে জুলাই মাসে বাগদা ফার্মে বসতি গড়ে তোলেন সাঁওতাল ও বাঙালিরা। তারপর তিন দফা তাদের উচ্ছেদের চেষ্টা করা হয়। সর্বশেষ ৬ নভেম্বর বাড়িঘরে আগুন দিয়ে তাদের উচ্ছেদ করা হয়। এসব ঘটনায় তিন মামলায় সাঁওতালদেরই আসামি করা হয়েছে। হুলিয়া নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির নেতারা।
এ বিষয়ে ভূমি উদ্ধার কমিটির সহ-সভাপতি ফিলিমন বাসকে বলেন, চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে। এলাকায় যেতে হচ্ছে লুকিয়ে। হামলার শিকার হয়েও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করা সম্ভব হচ্ছে না।

Add Comment

Click here to post a comment