স্বাস্থ্য

সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের জন্য প্রয়োজন সুস্থ (যকৃৎ) লিভার

cলিভার বা যকৃৎ শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি এক দিকে দেহের বিভিন্ন উপাদান তৈরির পাশাপাশি দেহ থেকে তিকর পদার্থগুলোকে ধ্বংস করে দেহকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। প্রয়োজনের সময় সঞ্চিত গ্লাইকোজেন থেকে গ্লুকোজ সরবরাহ করে। আরো আছে নানাবিধ কাজ। এটা ছাড়া জীবন চলতে পারে না। যকৃতের বিভিন্ন ধরনের রোগ-বালাই হতে পারে। জন্ডিস আমাদের মোটামুটি সবার পরিচিত যকৃতের রোগ। হতে পারে হেপাটাইটিস, সিরোসিস, ক্যান্সার। এ ছাড়াও অ্যাবসেস, লিভার ফেইলিউরসহ নানাবিধ অসুখ। অসুস্থ যকৃৎ নিয়ে কোনোভাবেই সুস্থ জীবনযাপন সম্ভব নয়। সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের জন্য প্রয়োজন সুস্থ যকৃৎ।

ওষুধ সেবনে সাবধান

আমাদের দেশে ওষুধ খুবই সহজলভ্য। যেকোনো ওষুধ গলির দোকান থেকে কিনতে পাওয়া যায়। হোক না কেন অ্যান্টিবায়োটিক। আমাদের দেশে চিকিৎসকের তো অভাব নেই। রোগ হলেই হাজার জন এসে হাজারখানেক ওষুধের নাম বলবে আপনাকে। আবার একটু অসুখ হলেই আমাদের চাই ওষুধ। বিনা কারণে ওষুধ সেবন করেন অনেকেই। যেমন একটু ব্যথা হলেই লাল রঙের গোল গোল ব্যথানাশক বড়ি ডাইকোফেনাক কে না সেবন করেননি। প্যারাসিটামল তো দুধ-ভাত। এর ফল কিন্তু ভালো নয়। ওষুধ যকৃতের মারাত্মক তি করতে পারে। প্রায় ছয় শতাধিক ওষুধ ও হারবাল সামগ্রী যকৃতের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এর মধ্যে ব্যথানাশক ট্যাবলেট ও প্যারাসিটামল প্রধান।

২০০৫ সালে ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির গবেষক অ্যানি লরসনের গবেষণায় জানা যায়, অ্যাকিউট লিভার ফেইলিউরের ৪২ শতাংশ কারণ অতিরিক্ত প্যারাসিটামল সেবন। সভ্য দেশ আমেরিকায় প্রতি বছর ২ হাজার জন মারা যায় অ্যাকিউট লিভার ফেইলিউরের কারণে। আর এর ৫০ শতাংশের পেছনে ওষুধ সেবন জড়িত। যকৃতের তি করার কারণে আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ওষুধ বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করে। গত কয়েক বছরে দুইটি ওষুধ নিষিদ্ধ করে। একটি হলো ব্যথানাশক ব্রোমফেনাক যেটি হাড়ের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতো অন্যটি ডায়াবেটিসের ওষুধ ট্রোগ্লিটাজন।

এ প্রতিষ্ঠানটি থাইরয়েড নামক গ্রন্থির চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রোপাইলথায়োইউরাসিল সেবনের েেত্র সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। তাই ওষুধ থেকে সাবধান। যকৃতের তি করতে পারে এমন ওষুধগুলোর মধ্যে আছে ব্যথানাশক ওষুধ, অ্যামোক্সাসিলিন, অ্যামায়োড্রোন, কোরপ্রোমাজিন, ইরাইথ্রোমাইসিন, ফুকোনাজন, জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল, অ্যাটোভ্যাসটেটিন, ক্যান্সারের ওষুধ, যক্ষ্মা রোগের ওষুধসহ বিভিন্ন হারবাল ওষুধ। রাস্তা-ঘাটে হকাররা বিভিন্ন ধরনের ওষুধ বিক্রি করে। এগুলো কিন্তু লিভারের তির অন্যতম কারণ। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন করবেন না।

জীবনের তরে মদপানকে না বলুন
মদ ও অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্য লিভারের মারাত্মক তি করে। মদপানে যকৃতে হতে পারে ফ্যাটি লিভার, অ্যালকোহোলিক হেপাটাইটিস। হতে পারে সিরোসিস অব লিভার, যেটি খুবই মারাত্মক একটি স্বাস্থ্য সমস্যা। অ্যালকোহল পানে যকৃৎ কোষে ইনফামেশন হয়ে ফাইব্রোসিস দেখা দেয় নষ্ট হয় যকৃতের আর্কিটেকচার। ফলে লিভার হারায় তার স্বাভাবিক কার্যমতা। অনেক েেত্রই লিভার সিরোসিস থেকে লিভারে ক্যান্সারও দেখা দিতে পারে। তবে এসব কোনো কিছুই হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেন স্ট্রোকের মতো সহসা ঘটে না। সিরোসিস আক্রান্ত রোগী বহু বছর পর্যন্ত কোনো রকম রোগের লণ ছাড়াই স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন।

ব্যাপারটা অনেকটা এ রকম ধরা যাক আমাদের লিভারটা একটা আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট যাতে সব আধুনিক সুযোগ-সুবিধাই বিদ্যমান। এই অ্যাপার্টমেন্টের একটি কল নষ্ট থাকতে পারে কিংবা নষ্ট থাকতে পারে পুরো পানির সাপ্লাই লাইন অথবা আরো বেশি কিছু। ঠিক একইভাবে সিরোসিসেও লিভারে সামান্য কোনো সমস্যা দেখা দিতে পারে কিংবা সমস্যাটি হতে পারে অনেক বড় কিছু। একটা পানির কল নষ্ট হলে যেমন অ্যাপার্টমেন্টের অধিবাসীদের কোনো সমস্যা হয় না তেমনি কম্পেনসেটেড বা আর্লি সিরোসিসেও রোগাক্রান্ত ব্যক্তির কোনো অসুবিধা হয় না বললেই চলে। রোগের লক্ষণ আর কষ্টগুলো দেখা দেয় ডিকম্পেনসেটেড বা অ্যাডভান্সড সিরোসিসে যখন ওই অ্যাপার্টমেন্টটির নষ্ট পানি সরবরাহ লাইটটির মতো লিভারেও বড় ধরনের গোলযোগ দেখা দেয়। আমাদের দেশে হেপাটাইটিস বি, সি, ফ্যাটি লিভারের মূল কারণ হলেও পশ্চিমা দেশগুলোতে বেশির ভাগ লোকই অ্যালকোহল পান করে বলে সিরোসিসের মূল কারণ অ্যালকোহল। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন অ্যালকোহল পানকারীর একজন লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হন। সাধারণত ১০ বছর পান করার পর দেখা দেয় এ সমস্যা। তাই মদপান ছাড়–ন আজই এখনই।

খাবারে হন পরিমিত
অনেকই আছেন যাদের তিনবেলা গোশত না হলে চলে না। তাদের জন্য দুঃসংবাদ। অতিরিক্ত আমিষজাতীয় খাবার খেলে দেহে টক্সিন তৈরি হয়। এটি তি করে লিভারের। আবার অতিরিক্ত শর্করাজাতীয় খাবার যেমন ভাত, রুটি, আলু খেলে তা যকৃতে চর্বি আকারে জমা হয়ে হতে পারে ফ্যাটি লিভার। এটিও দেহের জন্য মারাত্মক। ডায়াবেটিস, ডিজলিপিডেমিয়া (রক্তে চর্বি বেশি থাকা), মেদ-ভুঁড়ি, উচ্চরক্ত চাপ আর হাইপোথাইরয়ডিজম, অ্যালকোহল পান ফ্যাটি লিভারের প্রধাণ কারণ। পাশ্চাত্যে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত প্রায় ৩০ শতাংশ রোগী পরে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হন।

এ দেশেও ফ্যাটি লিভারজনিত লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের রোগী পাওয়া যায়। হেপাটোলজি ফাউন্ডেশন ইন্টারন্যাশনাল ঠিক করে দিয়েছে প্রতিদিনের শর্করা ও আমিষের পরিমাণ। দেহের আধা কেজি ওজনের জন্য সর্বোচ্চ আধা গ্রাম আমিষজাতীয় খাবার খাওয়া যেতে পারে। সে হিসেবে ৭০ কেজি ওজনের ব্যক্তির জন্য সর্বোচ্চ ৭০ গ্রাম আমিষজাতীয় খাওয়া যাবে। অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার বাদ দিতে হবে। লবণের পরিমাণ কমাতে হবে। বাদ দিতে হবে প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিমাণ। ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন-বি, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ যকৃতের কার্যদতা বাড়ায়। সালাদ, শিম, বাদাম, ইয়োগার্ট বা দধি, শাকসবজি, ফলমূল, ফুলকপি, সয়াবিনে এ উপাদানগুলো প্রচুর পরিমাণে থাকে। ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ খাবার যকৃতকে তিকর পদার্থ ধ্বংস করতে সাহায্য করে। কিন্তু সাবধান ভিটামিন-এ ও ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ খাবার থেকে। এ দু’টি ভিটামিন অতিরিক্ত পরিমাণে হলে যকৃতের তির কারণ হতে পারে।

বাদ দিতে হবে অতিরিক্ত চা, কফি পান। মসলাযুক্ত ও লবণযুক্ত খাবার, চর্বিযুক্ত খাবার ও রিচ ফুড পরিহার করতে হবে। ফাস্টফুড থেকে দূরে থাকুন। ওজন রাখুন নিয়ন্ত্রিত। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করুন। সিডেন্টারি বা আয়েশি জীবনযাপনকে না বলতে শিখুন। পানি পান করতে হবে প্রয়োজন মতো। কম পরিমাণে পানি পান করলে দেহে রক্তের ঘনত্ব বাড়ে। ফলে যকৃৎ ঠিকমতো তিকর পদার্থগুলোকে ধ্বংস করতে পারে না। তাই পানি পানের বিকল্প নেই। অনেকে মনে করেন, আট গ্লাস পানি পান করলেই বুঝি আর দরকার নেই। তা কিন্তু নয়। পানি পান করতে হবে এমন পরিমাণে যেন প্রসাবের পরিমাণ দেড় লিটার হয়।

টিকা নিন, সুস্থ থাকুন
যকৃতের মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করে হেপাটাইটিস-বি ও হেপাটাইটিস-সি ভাইরাস। এ ভাইরাস দুটো রক্ত পরিসঞ্চালন, অনিয়ন্ত্রিত যৌনমিলন, লালারস, আক্রান্ত মায়ের মাধ্যমে গর্ভের সন্তানে ছড়াতে পারে। হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসআক্রান্ত মায়ের সন্তানের জনেঅর পরপর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা প্রায় ৯০ শতাংশ, তবে মায়ের দুধের মাধ্যমে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস ছড়ায় না। কিন্তু গর্ভস্থ শিশুর হেপাটাইটিস-সি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। শরীরে ঢোকার আগেই প্রতিহত করুন ভাইরাসকে।

দেহে অন্যের রক্ত দেয়ার প্রয়োজন হলে ভাইরাস স্ক্রিনিং অবশ্যই করাবেন। হেপাটাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত নেয়া যাবে না কোনোভাবেই। পরিহার করুন একাধিক ব্যক্তির সাথে যৌনমিলন। অবৈধ যৌনমিলনে হয়তোবা কনডম ব্যবহার করলেন কিন্তু লালারস থেকে নিজেকে রা করবেন কিভাবে? ধর্ম মেনে চলুন। হেপাটাইটিসে আক্রান্ত মায়েরা গর্ভবতী হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। গর্ভের শিশুকে হেপাটাইটিসমুক্ত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন তারা। হেপাটাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির রেজার, ব্লেড ব্যবহার করবেন না। তবে সামাজিক মেলামেশা যেমন হ্যান্ডশেক বা কোলাকুলি এবং রোগীর ব্যবহার্যসামগ্রী যেমন গ্লাস, চশমা, তোয়ালে, জামা-কাপড় ইত্যাদির মাধ্যমেও এ রোগ ছড়ায় না। হেপাটাইটিস-বি প্রতিরোধ করার জন্য টিকা থাকলেও হেপাটাইটিস-সি প্রতিরোধে নেই কোনো টিকা। এ ক্ষেত্রে পরিবর্তিত জীবনযাত্রা আপনাকে প্রতিরোধ করবে। হেপাটাইটিস-বি প্রতিরোধে টিকা নিন। প্রথম টিকা দেয়ার এক-দুই মাস পর দ্বিতীয় টিকা ও ছয় মাস পর তৃতীয় টিকা নিন। গত বছর থেকে সরকারিভাবে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিতে এ টিকা দেয়া হচ্ছে। হেপাটাইটিস-বি ও সি ছাড়াও আছে হেপাটাইটিস-এ, হেপাটাইটিস-ই। এ দুটোই পানিবাহিত। তাই পানি ফুটিয়ে পান করুন।

যকৃতের একটি আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য হলো এটি নিজে নিজে বৃদ্ধি পেতে পারে। যকৃতের কোনো অংশ নষ্ট হলে কোষগুলো বিভাজিত হয়ে আবার নতুন কোষ তৈরি করে নষ্ট অংশকে সারিয়ে তুলতে পারে। তাড়াতাড়ি যকৃতের সমস্যা চিহ্নিত করে চিকিৎসা করালে সুস্থ হয়ে ওঠা সম্ভব। আবার চিকিৎসা করাতে দেরি করলে কিছুই করার থাকে না। তাই সমস্যা দেখা দিলে বসে না থেকে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। মাঝে মাঝে চেকআপ করতে পারেন লিভারের।

ভিডিও: সৈনিকরা মজা করে বানরের কাছে বন্দুক দিয়ে কীভাবে বিপদ ডেকে আনলো দেখুন চরম বিনোদন (ভিডিও)

Add Comment

Click here to post a comment