মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও লাভ-ক্ষতি-ফরিদুর রহমান

%e0%a6%ab%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%b0-%e0%a6%b0%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের তাণ্ডবে আরো একবার আতঙ্কগ্রস্ত ও হতবিহ্বল হয়ে পড়েছে একাধিক গ্রামীণ জনপদের কয়েক হাজার মানুষ। বিবিসি বাংলার রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘হঠাৎ করে শত শত মানুষের মিছিল এবং সেই সঙ্গে ভাঙচুর হিন্দুদের আতঙ্কিত ও দিশাহারা করে তোলে।’ প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে, তারপর হবিগঞ্জ ও ছাতকে এবং এরপর গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দিরে হামলা, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের বাড়িঘরে লুটপাট ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে এবং ঘটে চলেছে। বুঝতে কষ্ট হয় না, এ শুধু মন্দিরে ঢুকে মূর্তিভাঙা নয়—অসাম্প্রদায়িক উদার গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গ।

নাসিরনগরে যে যুবকের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আপলোড করা একটি আপত্তিকর ছবিকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন ও পরে হামলার ঘটনা ঘটেছে তাকে এক দিন আগেই গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক অতীতে রামুতে ঘটে যাওয়া একই ধরনের ঘটনা ও তার ধারাবাহিকতার যে তাণ্ডব দেশবাসী দেখেছে, তাতে ফেসবুকে নতুন করে উন্মাদনা সৃষ্টির মতো অপতৎপরতা চালানোর দুঃসাহস জেলেপাড়ার অর্ধশিক্ষিত একজন যুবকের আছে কি না সে বিতর্কে না গিয়ে পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতার প্রশংসাই করা যায়। কিন্তু পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্ন কয়েক দিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ইসলামী চিন্তাবিদ ও পিসটিভির নিয়মিত বক্তা হিসেবে কথিত এক লেবাসধারী হুজুর তাঁর ভাষণে চিৎকার করে বলছেন, ‘আমরা মূর্তি ভাঙার জাতি—’ তার পরই তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন, ‘আপনারা কী মূর্তি ভাঙার দলে, না মূর্তি গড়ার দলে?’ টেলিভিশনের পর্দার বাইরে থেকে অসংখ্য মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, ‘আমরা মূর্তি ভাঙার দলে’। যেখানে প্রকাশ্যে ধর্মীয় জলসায়, ওয়াজ মাহফিলে মূর্তি ভাঙাকে উৎসাহিত করে উন্মাদনা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেখানে পুলিশ প্রশাসন নীরব কেন? আমাদের জানা মতে, পিসটিভি দেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেই টেলিভিশনের একজন উস্কানিদাতা বক্তাকে নিরস্ত করতে প্রশাসনের এত দ্বিধা কেন?

আসলে সর্বকালেই প্রশাসনের সরিষার মধ্যে লুকিয়ে থাকা ভূত তাদের স্বার্থসিদ্ধি, অর্থবিত্ত ও ক্ষমতার লভ্যাংশের হিসাব-নিকাশ করেই নড়াচড়া করে। যে দেশে মানুষ এখনো যুদ্ধাপরাধী রাজাকার সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে—এই অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে মাঠে নেমে পড়ে, সে দেশের পুলিশ কোন ভরসায় একদল ধর্মান্ধ মানুষকে প্রতিবাদ সমাবেশের নামে জমায়েতের অনুমতি দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে বসে থাকতে পারে! তারা কি চেয়েছিল দাঙ্গাবাজ দুর্বৃত্তরা নির্বিঘ্নে তাদের কাজ শেষ করে দেশব্যাপী আরেকটি তাণ্ডবের উদাহরণ সৃষ্টি করুক, যাতে সংখ্যালঘুরা আবার নতুন করে দেশ ছাড়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা শুরু করতে পারে? প্রশাসনের এই দিবানিদ্রা তাদের জন্য কতটা লাভজনক জানি না, ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য বিব্রতকর এবং দেশের জন্য চূড়ান্ত লজ্জার বিষয়।

কয়েক দিন ধরে ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে ও পত্রপত্রিকার সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্নজনের মন্তব্য ও বাখ্যা-বিশ্লেষণ থেকে মনে হয়েছে, এই হিংসাত্মক আক্রমণ আকস্মিক ইসলামী জোশের বহিঃপ্রকাশ নয়। এর পেছনে আছে তুলনামূলভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠীর মানুষকে বিতাড়িত করে ভূসম্পত্তি দখলের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। কয়েক ঘর অসহায় মানুষকে ভিটামাটি ছাড়া ও শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়া করা গেলে স্থানীয় শক্তিমানরা প্রশাসনের সহায়তা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ক্রমেই তাদের আগ্রাসী থাবা বিস্তার করে বাড়িঘর, দিঘি-পুকুর ও মন্দিরসহ দেবোত্তর জমিজমা সহজেই আত্মসাৎ করতে পারে। এই কূটবুদ্ধি প্রয়োগ করে বছরের পর বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হুমকিধমকি দিয়ে, কৃত্রিম ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির মাধ্যমে সন্ত্রাস ছড়িয়ে অগণিত মানুষকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। এবং সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধের আগে পর্যন্ত যতসংখ্যক ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ থেকে প্রতিবেশী দেশে পাড়ি জমিয়েছে তার প্রায় দ্বিগুণ।

গত কয়েক দশকের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে হত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাটের ঘটনা এবং দীর্ঘমেয়াদে জমিজমা দখলের ঘটনায় যারা লাভবান হয়েছে তাদের তালিকায় দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর স্থানীয় নেতার নাম উচ্চারিত হয়েছে। ২ নভেম্বরের পত্রিকার একটি শিরোনামে যখন লেখা হয়, ‘মন্দির ভাঙচুর : ইন্ধনে আওয়ামী লীগ নেতাও’, তখন বুঝতে বাকি থাকে না, রাজনৈতিক বিশ্বাস যাই হোক—দখল ও আত্মসাতের ব্যাপারে সবাই একজোট। কাজেই এসব সন্ত্রাসী হামলা শুধু জামায়াত-শিবির ও ধর্মান্ধ ইসলামী গোষ্ঠীর কাজ বলে দায় এড়ানোর দিন শেষ হয়ে গেছে।

লেখক: সাবেক উপমহাপরিচালক (অনুষ্ঠান) বাংলাদেশ টেলিভিশন



আজকের জনপ্রিয় খবরঃ

গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ:

  1. বুখারী শরীফ Android App: Download করে প্রতিদিন ২টি হাদিস পড়ুন।
  2. পুলিশ ও RAB এর ফোন নম্বর অ্যাপটি ডাউনলোড করে আপনার ফোনে সংগ্রহ করে রাখুন।
  3. প্রতিদিন আজকের দিনের ইতিহাস পড়ুন Android App থেকে। Download করুন

Add Comment

Click here to post a comment