মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

সরকার ও দলে নেতৃত্বদানের রেকর্ড-বিমল সরকার

বিমল সরকারইংরেজ আমলে ১৮৮৫ সালে মুম্বাই (সাবেক বোম্বাই) শহরে সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস নামে একটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। সত্যিকার অর্থে এটিই উপমহাদেশের প্রথম রাজনৈতিক দল। এর প্রথম সভাপতির পদ অলংকৃত করেন প্রখ্যাত বাঙালি ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। পরবর্তী সময়ে মুসলমানদের উদ্যোগে এবং প্রধানত তাদের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে গঠন করা হয় সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ নামে আরো একটি দল। ১৯০৬ সালে ঢাকায় গঠিত এ দলের প্রথম সভাপতি ছিলেন নবাব ভিকারুল মুলক। বড় ও ঐতিহ্যবাহী হিসেবে এ দুটি দলই উপমহাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অবশ্য বর্তমানে মুসলিম লীগ বলতে গেলে একেবারে ম্রিয়মাণ। অন্যদিকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দুই বছর পর ১৯৪৯ সালে ঢাকায় গঠিত হয় পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (বর্তমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ)। মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এর প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই ষাটের দশকে আন্দোলন, সংগ্রাম এবং ১৯৭১ সালে ভয়াবহ এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। এ সময় আওয়ামী লীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭৫ সালে সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭৮ সালে গঠন করা হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। জিয়াউর রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। ১৯৮৬ সালে গঠন করা হয় জাতীয় পার্টি। এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। স্বাধীন ভারতে কংগ্রেস ও পাকিস্তানে মুসলিম লীগ এবং স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি বিভিন্ন সময় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছে। আমাদের দেশে বর্তমানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন। কমবেশি সব দলেরই রয়েছে আলাদা পরিচয়, ইতিহাস ও ঐতিহ্য।

বাংলাদেশের বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বয়স যথাক্রমে ৬৭ ও ৩৯। জাতীয় পার্টিও ৩১ বছরে পদার্পণ করেছে। আর ভারতের ঐতিহ্যবাহী ও সবচেয়ে পুরনো দল কংগ্রেসের বয়স ১৩১। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ১৩১ বছরের মধ্যে উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে একেবারে সোনিয়া গান্ধী পর্যন্ত অন্তত ৮৭ বার ৬২ জন ব্যক্তি কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কংগ্রেস সভাপতিদের দীর্ঘ এ তালিকায় রয়েছে ৯ জন মুসলিম, চারজন মহিলা ও হরিজন সম্প্রদায়ভুক্ত একাধিক ব্যক্তির নাম। হিসাব করলে দেখা যাবে, সভাপতি হিসেবে কংগ্রেসের নেতৃত্ব দিয়েছেন গড়ে একেকজন প্রায় দুই বছর করে। অবশ্য বর্তমান সভাপতি সোনিয়া গান্ধী ১৯ বছর ধরে কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সভাপতি হিসেবে এত বেশি দিন দায়িত্ব পালন করার আর কোনো দৃষ্টান্ত কংগ্রেসের ইতিহাসে নেই।

আওয়ামী লীগের ৬৭ বছরের ইতিহাসে মওলানা ভাসানী থেকে শেখ হাসিনা পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন অন্তত সাতজন। সবচেয়ে বেশি দিন, টানা ৩৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। আর প্রতিষ্ঠার ৩৯ বছরের মধ্যে জিয়াউর রহমান থেকে খালেদা জিয়া পর্যন্ত মোট তিনজন বিএনপির চেয়ারম্যান বা চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ৩৩ বছর ধরে সমাসীন। প্রথম তিনি চেয়ারপারসন হন ১৯৮৪ সালে। অন্যদিকে এরশাদ শুরু থেকেই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। আত্মপ্রকাশের পর একে একে ৩১টি বছর অতিক্রান্ত করেছে দলটি। এরশাদই দলের চেয়ারম্যান। এসব দলের প্রধানরা দলের সাংগঠনিক নেতৃত্বের পাশাপাশি রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন; একমাত্র কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী ছাড়া। শেখ হাসিনা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী—খালেদা জিয়াও। এদিক দিয়ে সোনিয়া গান্ধী ব্যতিক্রম। কংগ্রেসের মধ্য থেকে বারবার অনুরোধ করা হলেও সরকারপ্রধান হতে তিনি কখনো রাজি হননি।

আধুনিক গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলে পরিচিত ব্রিটেনের কথাই ধরা যাক। লক্ষ করলে দেখা যাবে ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ কিংবা লেবার পার্টিতে গত ৪০ বছরে অন্তত ছয়-সাতবার নতুন দলপ্রধান নির্বাচিত হয়েছেন। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের একদিক দিয়ে পরম সৌভাগ্যবানই বলতে হবে। পৌনঃপুনিকভাবে তিনবার সরকারপ্রধান হওয়া, সরকারপ্রধানের পাশাপাশি দলেরও প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এবং দলীয় প্রধান হিসেবে একাধিক্রমে ৩১ বছর, ৩৩ বছর বা এরও বেশি সময় পদে থাকা; উপমহাদেশ তো বটেই, সারা দুনিয়ায় এ রকম আর কয়টি দৃষ্টান্ত আছে কিংবা আদৌ আছে কি না আমার জানা নেই। জর্জ ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে বারাক ওবামা পর্যন্ত ২২৬ বছরে (১৭৮৯-২০১৬) মোট ৪৪ জন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই ৪৪ জনের মধ্যে ফ্রাংকলিন ডেলানো রুজভেল্টই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি তিনবার (১৯৩৩-১৯৪৫) প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকেই (১৯৩৯-১৯৪৫) তাঁর তৃতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার অন্যতম প্রধান কারণ বলে বিবেচনা করা হয়। রুজভেল্টকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার-টাইম প্রেসিডেন্ট’ বলা হয়। আমেরিকার প্রেসিডেন্টদের মধ্যে আর কারো এত দীর্ঘ সময় হোয়াইট হাউসে অবস্থান করার সৌভাগ্য হয়নি।

বাংলাদেশে একদিক থেকে ২০১৬ সালকে সম্মেলনের বছর বলা যায়। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এরই মধ্যে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সম্মেলন-অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। উভয় দলের নেতাকর্মীরা প্রধান হিসেবে যথাক্রমে খালেদা জিয়া ও এইচ এম এরশাদকেই বহাল রেখেছে। গত ২২ ও ২৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শেখ হাসিনা বারবার অনিচ্ছা প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকেই দলীয় প্রধান করা হয়েছে। পরিবর্তনের প্রত্যাশা অপূর্ণই থেকে যাচ্ছে।

লেখক : কলেজ শিক্ষক



আজকের জনপ্রিয় খবরঃ

গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ:

  1. বুখারী শরীফ Android App: Download করে প্রতিদিন ২টি হাদিস পড়ুন।
  2. পুলিশ ও RAB এর ফোন নম্বর অ্যাপটি ডাউনলোড করে আপনার ফোনে সংগ্রহ করে রাখুন।
  3. প্রতিদিন আজকের দিনের ইতিহাস পড়ুন Android App থেকে। Download করুন

Add Comment

Click here to post a comment