মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

সব বীরকন্যাকে স্বীকৃতি দিন-লায়লা নাজনীন হারুন

%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a7%9f%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%80%e0%a6%a8-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a8গৌরবদীপ্ত বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। স্বাধীনতা অর্জনের বিজয়।

বাঙালি জাতির ইতিহাসে এ বিজয় স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে আছে। এ গৌরবের বিজয় চিরভাস্বর।

এ বিজয় অর্জন করতে গিয়ে যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। হাতের মুঠোয় করে বিজয় ছিনিয়ে এনে যাঁরা স্বাধীন দেশে ফিরে এসেছেন, তাঁদের সশ্রদ্ধ অভিবাদন। একাত্তরের সেই অকুতোভয় আর অগ্নস্ফুিলিঙ্গের মতো বীর যোদ্ধারা আজ কিভাবে বেঁচে আছেন, সে খবর কি আমরা জানি? একটু পেছনে ফিরে তাকালেই দেখা যায় সেই একাত্তরের তারুণ্যদীপ্ত মুখগুলো, যাঁরা প্রিয় জীবনটি বাজি রেখে সম্মুখসমরে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিলেন, অকাতরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশমাতৃকার ডাকে—হয় স্বাধীনতা না হয় শহীদ, মধ্যখানে আর কিছু ছিল না। পরিবার-পরিজন কোনো কিছুই তাঁদের বেঁধে রাখতে পারেনি। দেশের স্বাধীনতার জন্য তখন সব কিছুই তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল।

আজ তাঁরা বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। রোগ-শোকে একাকার জীবন। কারো কারো আর্থিক সংগতি নেই দুই বেলা খেয়ে-পরে চিকিৎসা করানোর। তাঁদের কয়জনের খোঁজ আমরা রেখেছি? কোনো কোনো কন্যাদায়গ্রস্ত বাবা মেয়ের বিয়ে দিতে পারছেন না, ছেলেমেয়ের পড়ার খরচটুকু চালাতে পারছেন না অনেক অভাগা বাবা। স্বামী হয়ে অসুস্থ বৃদ্ধ স্ত্রীর চিকিৎসা দূরে থাক তাঁকে পরার জন্য একটি কাপড় পর্যন্ত কিনে দিতে পারছেন না। স্বাধীন দেশে স্বাধীনতার এমন সাধ কি তাঁরা পেতে চেয়েছিলেন? এ জন্যই কি জীবনসহ সব কিছুর মায়া ত্যাগ করে তাঁরা যুদ্ধ করেছিলেন?

এসব বলে শেষ করা যাবে না। এবার দেখা যাক ১৯৭১ সালের সেই বীরকন্যারা (বীরাঙ্গনা) আজ কেমন আছেন? বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে, গঞ্জগ্রামের পর্ণকুটিরের নিভৃত কোণে মানবেতর জীবন যাপন করা এসব নারী কিভাবে বেঁচে আছেন, তার কতটুকু আমরা জানি? হ্যাঁ, ইদানীং সরকারিভাবে তাঁদের কাউকে কাউকে মুক্তিযোদ্ধার সম্মানসহ ভাতা প্রদান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এটাই কি যথেষ্ট?

আমরা দেখেছি অশেষ কষ্টে ছাওয়া এই বীরকন্যাদের যাপিত জীবনের করুণ চিত্র। গত পাঁচ বছরে নারী সংগঠন ‘চেষ্টা’ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে দেখেছে কি অন্তহীন বেদনা আর কষ্ট নিয়ে তাঁরা জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁদের অভিমানের কথা তাঁরা বলতে চান না। তবে তাঁদের জোরালো অভিযোগ একটাই—যারা তাঁদের এমন করেছে সেই নরপিশাচদের চরম শাস্তি দিতে হবে; আর সেটা যেন তাঁরা মৃত্যুর আগে দেখে যেতে পারেন। রাজশাহীর পুঠিয়ার একজন বীরকন্যা, বয়স ৬৫, তিনি বলছিলেন, তাঁর স্বামীকে বেঁধে রেখে তাঁর সামনে মেয়েকে, মেয়ের সামনে মাকে যারা শারীরিকভাবে চরম অপমান করেছিল তাদের শাস্তি তিনি মৃত্যুর আগে দেখে যেতে চান। জানি না এখনো সেই কদাকার নরপশু বেঁচে আছে কি না? সেদিন শেরপুর (নালিতাবাড়ী) সোহাগপুরের বিধবাপল্লীতে গিয়ে ওদের মুখ থেকে আরো রোমহর্ষক কিছু বীভৎস ঘটনার কথা জানা গেল। এসব শুনলে আগে চোখে কষ্টের জল এসে যেত। কিন্তু এখন ঘৃণায় মুখে শুধু থুথুই আসে না, ধিক্কার জানানোর নিকৃষ্ট ভাষাটুকুও খুঁজে পাই না।

একজন বীরকন্যা বললেন, ১৯৭১ সালের সেই তালমাতাল একদিনে তাঁর স্বামীকে মেরেই শুধু ক্ষান্ত হয়নি; হানাদার আর রাজাকাররা অল্প বয়সী এ মায়ের কোল থেকে তাঁর এক বছরের শিশুপুত্রটিকে এক থাবায় নিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়। আল্লাহর অশেষ রহমতে শিশুটি গিয়ে পড়ে একটি গাছের মগডালে। সেখানে আটকে থেকে শিশুটি বেঁচে যায়। এই অল্প বয়সী মাকে সারা রাত ধরে অত্যাচার করে করে রক্তবন্যায় ভাসিয়ে দিয়ে অচেতন অবস্থায় ফেলে রেখে যায় নরপশুরা। মেয়েটির জ্ঞান ফিরে এলে তাঁর শিশুপুত্রটিকে নিজের কোলে জীবিত ফিরে পেয়ে যেন নতুন জীবন পান সেই সব হারানো মা। এমনি হাজারও ঘটনা, হাজারও কষ্টের কথা এই বীরকন্যাদের জীবনের সঙ্গে অষ্টপ্রহর জড়িয়ে আছে, সারা জীবন ধরে বললেও হয়তো শেষ হবে না। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার যখনই ক্ষমতায় আসীন হয় তখনই দেশের জনগণ অনেক কিছু আশা করে। অন্য কোনো সরকার কখনোই মুক্তিযোদ্ধা ও বীরকন্যাদের কথা ভাবেনি। তাঁদের জন্য কিছু করতে হবে বলেও মনে করেনি। তখন মুক্তিযোদ্ধা ও বীরকন্যাদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। সে সময়ের কথা না বলাই ভালো। সরকার ছাড়া আরো বেসরকারি যে সংস্থাগুলো আছে তাদেরও আরো ব্যাপকভাবে এগিয়ে আসতে হবে, তাদের কর্মকাণ্ড আরো প্রসারিত করতে হবে।

নারী সংগঠন ‘চেষ্টা’ নীরবে কাজ করে যাচ্ছে জীবন সায়াহ্নে দাঁড়ানো এসব বীরকন্যার মুখে একটু হাসি ফোটানোর জন্য। কিন্তু এই সংগঠনটির সামর্থ্য অনেক কম। সমাজের মহান ও বিত্তবানরা এগিয়ে এলে কাজটি আরো সহজতর হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

আশার কথা, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার এখন তাঁদের পুনর্বাসনের কর্মকাণ্ড হাতে নিয়েছে। সবার আগে প্রয়োজন বাংলাদেশের সব বীরকন্যাকে আগে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া, তা না হলে মৃত্যুর আগে তাঁদের দুচোখে জমে থাকা সারা জীবনের অভিমানের অশ্রুজল কখনো শুকাবে না।

বিজয় দিবসের প্রাক্কালে এসে বারবার বলতে চাই, বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা ভালোভাবে, গৌরবের মহিমায় সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকুন। কোনো মুক্তিযোদ্ধা ও বীরকন্যাকে যেন আর্থিক অনটনে থেকে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করতে না হয়, তাহলে সব প্রাপ্তি, সব অর্জন ম্লান হয়ে যাবে। আমরা বীরের জাতি আমরা পৃথিবীর বুকে বিজয়ের গৌরব নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই। কোনো অবহেলায় যেন আমাদের চির উন্নত শির সামান্য হেলে না পড়ে, আমাদের সবার লক্ষ্য সে দিকেই।

লেখক : কণ্ঠশিল্পী ও লেখক

Advertisements

Add Comment

Click here to post a comment