মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

শিশু ও নারী নির্যাতন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা চাই-ড. সুলতান মাহমুদ রানা

ড. সুলতান মাহমুদ রানাআমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। এর প্রতিবাদে মানববন্ধন ও শাস্তির দাবির ঘটনাও নিয়মিত হয়। সাময়িকভাবে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় শুরু হলেও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কখনোই হয় না। আর শাস্তি না হওয়ার পরিণতিতে বাংলাদেশে ধর্ষণ, নির্যাতন, অতঃপর হত্যার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। নারী ধর্ষণের পাশাপাশি ইদানীং শিশু ধর্ষণের মাত্রাও অতিমাত্রায় বেড়েছে। বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দেওয়া এক তথ্যে জানা গেছে, ধর্ষকদের টার্গেট শিশু ও কিশোরী। অর্থাত্ সাত থেকে ১২ বছরের শিশুরা বেশি ধর্ষিত হচ্ছে। যে বয়সে তারা পুতুল খেলে, ধর্ষণ কী তা-ও জানে না, বোঝার মনমানসিকতাও গড়ে ওঠেনি, সে বয়সেই তাকে ধর্ষিত হতে হচ্ছে। দুই বছরের শিশু থেকে শুরু করে যেকোনো বয়সের নারীদের এমন নির্মমতার শিকার হতে হয়। আসকের তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মোট ৫১২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৩২৫টি শিশু ধর্ষিত হয়েছে। উল্লেখ্য, শিশু ও নারীদের পাশাপাশি শারীরিক প্রতিবন্ধীরাও যৌন কিংবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে অহরহ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর এই ৯ মাসে ধর্ষিত ৩২৫টি শিশুর মধ্যে ৩১ জন শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী।

প্রায়ই খবর পাওয়া যায়, বাবাকে কিংবা স্বামীকে বেঁধে রেখে তাঁদের চোখের সামনে মেয়েকে কিংবা স্ত্রীকে ধর্ষণ করা হচ্ছে। কিন্তু এসবের প্রতিকার কী? যেকোনো মা-বাবা তাঁদের কন্যাসন্তান নিয়ে রীতিমতো অসহায় হয়ে পড়েছেন। এসব বখাটের মূলোত্পাটন করার সময় এসেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্বল শ্রেণির মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হয় বলে মামলা-মোকদ্দমা হয় না বললেই চলে। আবার কোনো ক্ষেত্রে মামলা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা নিষ্পত্তি হয়ে যায় বিভিন্ন কারণে। গত ১১ সেপ্টেম্বর রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় নবম শ্রেণির এক ছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হলে তাকেই বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেন প্রধান শিক্ষক। এ ঘটনায় মামলা হলে ধর্ষণকারীরা মামলার বাদীকে হুমকি প্রদর্শন করে। প্রশাসনের সহযোগিতায় ছাত্রীটির বিদ্যালয়ে যাওয়া শুরু হলেও ওই প্রধান শিক্ষক ও ধর্ষণকারী কিংবা হুমকি প্রদর্শনকারীদের শাস্তি হয়নি।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের বাইরেও এমন ঘটনা রয়েছে অনেক। লোকলজ্জা কিংবা মানসম্মানের ভয়ে অনেকেই ধর্ষণের বিষয়টি নিয়ে উচ্চবাচ্য করতে চায় না। ফলে গণমাধ্যমে সেসব খবর প্রকাশিত হয় না। এ কারণে দেশে কত নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে তার প্রকৃত হিসাব পাওয়া কঠিন। আর এভাবে প্রতিনিয়ত ধর্ষণের ফলে আত্মহত্যার প্রবণতাও বেড়েছে অনেক। গত দুই দশকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ও শিশু সুরক্ষায় বাংলাদেশে আইনি কাঠামো শক্তিশালী হয়েছে; নেওয়া হয়েছে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ। কিন্তু সামগ্রিক বিবেচনায় ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণে স্পষ্টত নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। বরং ভয়াবহতা ও নৃশংসতা বেড়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে প্রতিবছরই আগের বছরের তুলনায় ধর্ষণের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ইদানীং আমরা দাবি করি, আমাদের সমাজ এগিয়েছে, আধুনিকতা এসেছে। কিন্তু সমাজের কতিপয় মানুষের কর্মকাণ্ডে সমাজ ক্রমেই কলুষিত হয়ে উঠছে। এমনকি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিদ্যমান সমাজব্যবস্থায় সহিংসতার শিকার অনেক নারী ও শিশু চাইলেও আইনের আশ্রয় নিতে পারে না। ফলে সহিংসতার শিকার হয়েও তারা তা সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে।

গত ৪ নভেম্বর কালের কণ্ঠের সম্পাদকীয়ের তথ্যানুসারে নোয়াখালীতে অধ্যক্ষের কক্ষে ঢুকে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে তাঁকেসহ তিন শিক্ষককে হত্যার হুমকি দেয় ওই প্রতিষ্ঠানেরই দুই ছাত্র। শিক্ষকদের ‘অপরাধ’ তাঁরা ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করার ঘটনার প্রতিবাদ করেছিলেন। শিক্ষকরাও যখন অন্যায়ের প্রতিবাদ করে নিজ ছাত্রের পিস্তলের গুলির মুখে পড়েন, বুঝতে অসুবিধা হয় না বর্তমানের সামাজিক নিরাপত্তা কেমন। গত ২৯ অক্টোবর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এক তরুণী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া গত ২৭ অক্টোবর রংপুর শহরের সর্দারপাড়ায় নার্সিং ইনস্টিটিউটের দুই ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়। শুধু ঢাকা মেডিক্যাল ও রংপুরই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। আসকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত  প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫৭ জন নারী ও শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। এসব ঘটনায় ২৫০টি মামলা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ৯ মাসে সারা দেশে ধর্ষণচেষ্টা ও ধর্ষণের পর ২৬ জনকে হত্যা করা হয়েছে। আর সাতজন ধর্ষিত হওয়ার পর আত্মহত্যা করেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরে সারা দেশে ১১৫ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। চারজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) সূত্রে জানা গেছে, গত মাসে নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার সর্বোচ্চ ৮১ জন নারী ও শিশু ওসিসিতে ভর্তি হয়। অন্য সময় মাসে এ সংখ্যা ৫০ থেকে ৫৬ থাকে। গত মাসে ধর্ষণের শিকার আড়াই বছরের এক শিশুসহ ২৫টি শিশু ভর্তি হয়। এমন চিত্র থেকে বাংলাদেশে নারী-শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের ভয়াবহতা অনুমান করতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

যে দেশে বেশির ভাগ মানুষ মুসলমান, সে দেশের আত্মস্বীকৃত ধর্ষণকারীরও যথাযথ বিচার কিংবা শাস্তি হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ধর্ষণের সেঞ্চুরি অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু বিচার হয় না। তাহলে কিভাবে বন্ধ হবে ধর্ষণের সংস্কৃতি? অথচ দেশে নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে অনেকাংশে। সরকারপ্রধান, বিরোধী দলের প্রধান ও সংসদের স্পিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের অবস্থান। তা সত্ত্বেও ধর্ষণকারীদের উপযুক্ত শাস্তি না হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। সবার একটিই প্রশ্ন, কিভাবে নারী-শিশুরা ধর্ষণ থেকে রেহাই পাবে?

নারী ও শিশু নির্যাতনের কঠিন আইন বাংলাদেশে বিদ্যমান। কিন্তু সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নেই। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, আইনের শাসনের অকার্যকারিতা, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ প্রভৃতি কারণে আজও নারী ও শিশু ধর্ষণ বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমান সরকারের প্রতি দেশের মানুষের সীমাহীন আস্থা রয়েছে। আমরা আশা করব, জনগণের এই আস্থা ও বিশ্বাসের মূল্যায়ন করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

sultanmahmud.rana@gmail.com



আজকের জনপ্রিয় খবরঃ

গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ:

  1. বুখারী শরীফ Android App: Download করে প্রতিদিন ২টি হাদিস পড়ুন।
  2. পুলিশ ও RAB এর ফোন নম্বর অ্যাপটি ডাউনলোড করে আপনার ফোনে সংগ্রহ করে রাখুন।
  3. প্রতিদিন আজকের দিনের ইতিহাস পড়ুন Android App থেকে। Download করুন

Add Comment

Click here to post a comment