বিভাগীয় সংবাদ

শখের নিশান গাড়ি কেনার জমানো টাকা অসহায় রোহিঙ্গাদের দিয়ে দিলেন মেহেদি

টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিমপাড় দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে রোহিঙ্গারা। ট্রলার থেকে নেমে সৈকতেই লুটিয়ে পড়েন ক্লান্ত এক রোহিঙ্গা বৃদ্ধা। এভাবেই তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। জাপানি নিশান গাড়ি কেনার শখ ছিল ডিজিটাল ব্যবসার উদ্যোক্তা মেহেদি চৌধুরীর। সে জন্য টাকা জমিয়েছিলেন। কিন্তু গাড়িটি আর কেনা হলো না।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা থেকে বাঁচতে গত ২৫ আগস্ট থেকে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে শুরু করে রোহিঙ্গারা। এ পর্যন্ত সেই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় চার লাখে। মেহেদি দেখেন, অসহায় এই রোহিঙ্গাদের কাছে টাকাপয়সা নেই। পেটে খাবার নেই। থাকার জায়গা নেই। জীবন বাঁচাতে লড়াই করছে তারা।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে দেখেন, রোহিঙ্গাদের মারধর আর নির্যাতন করার ভিডিও। দেখেন তাদের ওপর চালানো অত্যাচারের ছবি।

মানুষ যখন এমন বিপন্ন তখন কি হবে গাড়ি চড়ে? মেহেদি তাই জমানো টাকা নিয়ে দাঁড়ালেন রোহিঙ্গাদের পাশে। আল জাজিরার সাংবাদিক কেটি আর্নল্ডের সঙ্গে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরের কাছেই কথা হয় মেহেদির। জানালেন, এ পর্যন্ত দুবার ত্রাণ নিয়ে এসেছেন ওদের জন্য। যতটুকু সামর্থ্য তাই নিয়েই চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি।

ডিজিটাল প্রতিষ্ঠানের প্রোগ্রামার ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহেদি ৫০০ তাঁবু ও ৫০০ খাবারের প্যাকেট পাঠিয়েছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য। প্রায় ৭ লাখ টাকার ত্রাণ দিয়েছেন তিনি।

মেহেদি বলেন, ‘কেবল মুসলিম বলেই রোহিঙ্গাদের ওপর এত অত্যাচার হচ্ছে। আমি এখানে এসেছি সাহায্যের জন্য। আমিও তো ওদের মতোই মানুষ।’¹

তবে ত্রাণ দিতে গিয়েও করুণ অভিজ্ঞতা হয়েছে মেহেদি চৌধুরীর। বললেন, ‘খাবারের ব্যাগের জন্য যে এমন কাড়াকাড়ি আমি দেখিনি। যদি শিগগির তারা পর্যাপ্ত ত্রাণ না পায় তাহলে অবস্থা আরও খারাপ হবে।’

মেহেদি বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে তাঁর ত্রাণের ট্রাকের চারপাশে প্রায় এক হাজার রোহিঙ্গা ভিড় করে। খাবারের প্যাকেট ছোড়ামাত্র কাড়াকাড়ি শুরু হয়। ত্রাণ শেষ হওয়ার পর অনেক রোহিঙ্গা ট্রাকে উঠে পড়ে। যদি ট্রাকে কিছু পড়ে থাকে।’

ত্রাণ বিতরণে বিশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে কথা বলেন আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার কর্মকর্তা ক্রিস লম। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরগুলোতে ঘুরে যারা বেশি বিপদে আছে তাদের চিহ্নিত করতে হবে। এরপর তাদের টোকেন দিতে ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে আসতে বলা যায়। এমনটা করলে ত্রাণ বিতরণে বিশৃঙ্খলা এড়ানো সম্ভব।

রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বলছে, ত্রাণবাহী গাড়ি দেখলে তাদের লক্ষ্য থাকে একটাই। যে করেই হোক ত্রাণ নিতে হবে। রাস্তার ধারের ঘরে থাকেন রোহিঙ্গা নুর মোহাম্মদ। বললেন, ‘আশ্রয়শিবিরে থাকার জায়গা নেই। আন্তর্জাতিক সংস্থার কোনো ত্রাণ তিনি এ পর্যন্ত পাননি।’

যখন নুর মোহাম্মদ কথা বলছিলেন তখন তাঁর ছয় বছরের মেয়ে দাঁড়িয়েছিল পাশেই। একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল রাস্তা দিয়ে যাওয়া গাড়িগুলোর দিকে। ত্রাণ নেওয়ার জন্য বাড়িয়ে রেখেছিল ছোট্ট হাত দুটি।

জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফের যোগাযোগ-বিষয়ক দক্ষিণ এশীয় প্রধান জেন জ্যাকুয়েস সিমন বলেন, ‘এত বেশি রোহিঙ্গা আসছে যে তাদের ব্যাপারে আমরা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছি। বিভিন্ন দেশ থেকে ত্রাণ এসেছে।’ শিগগিরই আরও আসবে বলে সংস্থাটি আশা করছে।

কিন্তু কক্সবাজারে নিয়োজিত মানবিক সংস্থাগুলোর ত্রাণ বিতরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার প্রয়োজন।

তবে স্থানীয় অনেকে নিজেদের যতটুকু সামর্থ্য তাই নিয়ে দাঁড়াচ্ছেন রোহিঙ্গাদের পাশে। এমনই একজন টেকনাফের কাছে জম্মুখালী গ্রামের কৃষক আবু হায়েদ। গত কয়েক সপ্তাহে আটটি রোহিঙ্গা পরিবারকে তিনি তাঁর পরিত্যক্ত ঘরে আশ্রয় দিয়েছেন। তাদের খাবার, পানির ব্যবস্থা করেছেন। কেটি আর্নল্ড দেখেন, তাঁর উঠানে খেলছে রোহিঙ্গা শিশুরা।

আশ্রিত এক রোহিঙ্গার দিকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিতে দিতে আবু হায়েদ বলেন, ‘মানুষ তো মানুষের জন্যই। বাইরে বৃষ্টির মধ্যে অনেক রোহিঙ্গাকে ঘুমাতে হয়। তারা অসহায়। আমি গরিব কৃষক। আমার পরিবারও বড়। আমি চাইছি আশ্রিত রোহিঙ্গাদের শরণার্থীশিবিরে পাঠাতে। তবে কারও সাহায্য পাচ্ছি না। হয়তো খুব বেশি দিন আমি তাদের দেখভাল করতে পারব না।’