অর্থনীতি-ব্যবসা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জাতীয় স্বাস্থ্য

লাল নাকি সাদা চালের ভাত খেলে দীর্ঘ-মেয়াদি হবে আপনার জীবন আসুন জেনে নেই

এম এম হাসান: আমাদের প্রচণ্ড ক্ষুধা লাগলে তা নিবারণের জন্য পছন্দের তালিকায় যে খাবারটি সবার আগে আসে তা হলো ভাত। একপ্লেট ভাতের সাথে কিছু তরকারি হলেই তা মুহূর্তের মধ্যে আমরা সাবার করে দেই।  বেশির ভাগ বাঙালির পছন্দ এবং স্বস্তির খাওয়া এই ভাতেই। শরীরের ওজন কমাতে অনেকে প্রথমে ভাতকে ‘না’ বলে দেন। অথচ ভাত আপনার ওজন বাড়ানোর জন্য মোটেও দায়ি নয় উপরন্ত ওজন কমাতে সাহায্য করে। অন্যান্য রোগ প্রতিরোধসহ রয়েছে নানা রকম উপকারী দিক এই ভাতের।

ভাতের পুষ্টিমান অক্ষুণ্ণ রাখতে ডাক্তাররা ঢেঁকি ছাটা চালের ভাত খেতে সাধারণতঃ পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সেক্ষেত্রে লাল চালের গুরুত্ব থাকে আরও বেশি। খাবারের রংয়ের ছড়াছড়ি যত বেশি, পুষ্টিগুণও ততটাই বেশি- এরকম কথার চল আছে আমাদের এই সমাজে। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও আমরা ভাত হিসেবে সাদা ভাতকে পছন্দ করি। আমরা মনে করি লাল চাল বা ঢেকিছাঁটা চাল হলো গরীবের খাবার। আসুন জেনে নেই কোন চালের ভাত আমরা খাবো যা আমাদের শরীরের জন্য উপকারী এবং রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে।

সাদা চাল: স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না হলেও আমরা এটা পছন্দ করি। পেট ভরে খাই। ধান অটো রাইস মিলে ভাঙানোর পর আবার পলিশ করা হয়। যার ফলে চালের প্রাকৃতিক স্বাদ ও চেহারা পরিবর্তিত হয়। প্রক্রিয়াজাতের কারণে এতে থাকা লৌহ, ভিটামিন, দস্তা, ম্যাগনেসিয়াম-সহ অন্যান্য পুষ্টি উপাদান অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়।

সাধারণতঃ প্রক্রিয়াজাত এই চালের ‘গ্লাইসেমিক ইনডেক্স’-এর মাত্রা বেশি হওয়ায় এটি শরীরের শর্করার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। লাল চালের তুলনায় এতে আঁশ কম থাকে।

তবে সব সাদা চালই খারাপ নয়। ব্যতিক্রমধর্মী সাদা চালের মধ্যে আছে বাসমতি চাল ও ‘হোল গ্রেইন’ চাল। এদের ‘গ্লাইসেমিক ইনডেক্স’-এর মাত্রা তুলনামূলক কম। হজম হয় ধীরে তাই রক্তে শর্করার পরিমাণ হুট করে বাড়িয়ে দেয় না।

বাসমতি চালে আছে ভিটামিন বি, কর্পূর এবং ম্যাগনেসিয়াম- যা রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-কারসিনোজেনিক উপাদানে ভরা তুষ যোগ করলে বাসমতি চাল একটি উপকারী খাবার।

লাল চাল: অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে ভরপুরি এই চাল। সাদা চাল বাদ দিয়ে লাল চালের ভাতে অভ্যস্ত হওয়ার মাধ্যমে ডায়বেটিস, হৃদরোগ, কোলেস্টেরলের সমস্যা ইত্যাদির আশঙ্কা কমতে দেখা গেছে বিভিন্ন গবেষণায়। রক্তচাপ কমাতেও লাল চাল উপকারী। পাশাপাশি প্রদাহ এবং ক্যান্সারের হাত থেকে বাঁচাতে সহায়ক এটি।

খোসা ফেলে দেওয়ার পরও লাল চালের গায়ে একটি আবরণ থাকে। যা এর পুষ্টি উপাদানগুলোকে অক্ষত রাখে। আর এতে রয়েছে সাধারণ সাদা চালের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ খাদ্য আঁশ, খনিজ পুষ্টি এবং ভিটামিন। এই চাল বাজারজাতকরণের সময় তীব্র প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং মসৃণকরণের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় না। ফলে এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, লাল চাল বেশি স্বাস্থ্যকর, বেশি পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ এবং বেশি সুস্বাদু।

লাল চালে রয়েছে ফাইটিক এসিড, ফাইবার এবং এসেনসিয়াল পলিফেনলস। এটি হলো এমন একটি জটিল কার্বোহাইড্রেট যা আমাদের দেহে সুগারের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। এবং আমাদেরকে ডায়াবেটিস থেকে মুক্ত রাখে। লাল চাল লো গ্লিসেমিক ইনডেক্স ফুড। তার মানে হলো হজমের পর লাল চাল থেকে সুগার কমহারে নিঃসরিত হয়। ফলে হুট করেই রক্তে সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় না এবং ভালোভাবে দেহে শোষিত ও অপসারিত হয়। অন্যদিকে সাদা চাল হলো হাই গ্লিসেমিক ইনডেক্স ফুড যা সহজেই চর্বি জমায়। ফলে লাল চালের ভাত খাওয়ায় অভ্যস্থ হলে আপনি দীর্ঘ-মেয়াদি একটি জীবন-যাপন করতে পারবেন।

লাল চাল আমাদের হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক। এটি ম্যাগনেশিয়াম ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ। যা আমাদের হাড়কে শক্ত এবং স্বাস্থ্যকর রাখতে সহায়ক।

লাল চাল রক্তের শিরা-উপশিরাগুলোতে কোনো ধরনের ব্লক তৈরি হতে দেয় না। এতে আরও আছে সেলেনিয়াম নামের একটি উপাদান যা হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি। এটি হাইপারটনেশন এবং অন্যান্য হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

উচ্চ হারে আঁশ থাকায় এটি হজমে সহায়ক এবং গ্যাস শোষণ প্রতিরোধ করে। ফলে হজম প্রক্রিয়াকে আরো শক্তিশালি করে তোলে।

এতে আছে ম্যাঙ্গানিজ ও ফসফরাস। যা দেহের চর্বি সংশ্লেষণ এবং স্থুলতা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। এর উচ্চ আঁশযুক্ত উপাদান আপানার পেট দীর্ঘক্ষণ ভরিয়ে রাখে এবং অতিরিক্ত খাবার গ্রহণে বিরত রাখে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ আঁশযুক্ত এবং কম গ্লিসেমিক উপাদনযুক্ত খাদ্য শস্য যেমন লাল চাল খেলে মেটাবোলিক সিন্ড্রোম সৃষ্টির ঝুঁকি কমে।

লাল চালে যে তেল আছে তা এলডিএল কোলোস্টেরল ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনে বলে কথিত আছে। আর এ কারণেই লাল চাল আমাদের খাদ্য তালিকার সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর একটি শস্য। লাল চালে থাকা আঁশ হজম পক্রিয়ায় কোলোস্টেরলকে বেধে ফেলে এবং তা নিঃসরণে সহায়তা করে।

লাল চালে আছে ম্যাগনেশিয়াম যা আমাদের শক্তি বাড়াতে সহায়ক। এটি কার্বোহাইড্রেটস এবং প্রোটিনকে শক্তিতে রুপান্তর করে। যা আপনাকে দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় রাখে।

অদ্রবণীয় খাদ্য আঁশযুক্ত পূর্ণ শস্য যেমন লাল চাল পিত্তে পাথর হওয়াও ঝুঁকি কমায়। অ্যামেরিকান জার্নাল অফ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যে নারীরা আঁশযুক্ত খাবার বেশি খান তাদের মধ্যে পিত্তে পাথর হওয়ার ঝুঁকি ১৩% কম থাকে।