মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

লন্ডনের ছানু মিয়া-সৈয়দ তাহমীম

%e0%a6%b8%e0%a7%88%e0%a7%9f%e0%a6%a6-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%80%e0%a6%aeছানু মিয়াকে নিয়ে কিছু একটা লিখতে হবে তা কখনো ভাবিনি। কিন্তু মনে হলো ছানু মিয়াকে নিয়ে যদি না লিখি তবে ব্রিটেনের একটি প্রজন্মের বেড়ে ওঠা, পূর্ব প্রজন্মের আলতাব আলীদের মার খাওয়ার ঘটনা থেকে ‘মার দেওয়ার’ রূপান্তর করা একটি প্রজন্মকে অস্বীকার করা হবে। আশির দশকে আমরা যখন স্কুলে থাকতে ‘যায়যায়দিন’ পড়ি তখন আমাদের প্রথম প্রেম। সেই পত্রিকায় কলাম লেখেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, মরহুম এম আর আখতার মুকুল। লন্ডনের জনমত, সুরমায় ছাপা হয়ে এগুলো যায়যায়দিনে যায়। সেই সময় লন্ডনে এম আর আখতার মুকুল একটি কলাম লেখেন ‘লন্ডনে ছক্কু মিয়া’। সে সময় দেশে-বিদেশে বিশেষ করে লন্ডন, নিউইয়র্ক, সিলেটে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে যেসব মানুষ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে জাহাজে করে লন্ডন এসেছেন তাদের।

ঢাকা থেকে যেসব মানুষ পড়তে আসেন তারা আশ্রয় নেন সিলেটের রেস্টুরেন্টগুলোয়। কাজ করেন রোজগার করেন। অবলীলায় ভুলে যান এই ‘কামলা’ মানুষদের। আর এখন তো আছে ব্রিকলেনে শহীদ মিনার। ঢাকা থেকে যে বুদ্ধিজীবী আসেন তারা ‘শ্লাঘা’ অনুভব করেন আহা রে ‘বাংলাটাউন’। কিন্তু তারা জানেন না এই বাঙালিদের, এই এশিয়ানদের অধিকার আদায়ের জন্য ব্রিকলেনের এই পার্কে ‘আলতাব আলী’কে প্রকাশ্যে জবাই করেছে বর্ণবাদীরা। বাঙালিরা নামাজ পড়তে পারতেন না, টুপি খুলে নেওয়া হতো। তাদের ছেলেমেয়েরা ‘বুলিইং’-এর কারণে স্কুলে পড়তে পারত না। এই ছানু মিয়াদের প্রজন্ম ঘুরে দাঁড়ায়। কামালরা (আততায়ীর হাতে নিহত), আশিকরা, মতবরা, সাবুলরা ঘুরে দাঁড়ায়। ‘গ্যাঙ অব নিউইয়র্ক’-এর ‘ডি কেপরিও’র কারেক্টারের নাম হয় সেই সময়ের ‘ছানু মিয়া’। পূর্ব লন্ডনের ছানু মিয়া। আশির দশকের শুরুতে ভাষাসৈনিক তাসাদ্দুক আহমদের নেতৃত্বে বিলেতে শুরু হয় ভাষা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। আবারও ওই সাধারণ বাঙালি। সিলেটের গ্রামের মানুষ। বিলেতের রাস্তাগুলোয় শোভা পেতে শুরু করেছে বাংলা হরফ। বাংলা ভাষা স্থান পায় ও লেভেল, এ লেভেলে। আশি ও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বাঙালিরা যখন একটু থিতু হয়েছে, সে সময় এই হরফগুলো হারিয়ে যায়। ইস্ট লন্ডন বাঙালিদের জন্য নিরাপদ একটি শহর ছিল। অভ্যন্তরীণ কলহে হারিয়ে যায় বাঙালির এমপি হওয়ার সাধ। ২০০৮ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ছানু মিয়ারা তখন বেড়ে উঠছেন। বাবারা কঠোর পরিশ্রম করছেন, দেশে টাকা পাঠিয়ে পরিবার, ভাই-ভাতিজা চালাচ্ছেন। সেই সময় পরিবারের বড় ছেলেরা রেস্টুরেন্টে কাজ করে। বাবার সঙ্গে সংসার চালায়। ছানু মিয়ারা ছিলেন এই দলে। লন্ডনের এই গ্রামীণ বাবা-চাচারাই রুটি-রুজির সঙ্গে, ব্যবসার সঙ্গে তাদের ‘দেশি কালচার’ নিয়ে আসেন। মসজিদ বানান, মন্দির বানান। ছানু মিয়ার মৃত্যুতে আমার ফেসবুক স্ট্যাটাসে আমি লিখেছিলাম তিনি এক উপন্যাসের নায়ক। সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘রসগোল্লা’ গল্পের ‘ঝাণ্ডু দা’। রসগোল্লা গল্পে বলা আছে ঝাণ্ডু দা কখন এলেন, কখন গেলেন, দেশে না বিদেশে এগুলো বলতে নেই। ছানু মিয়াও সেই ঝাণ্ডু দা। সপ্তাহে, পনের দিনে, মাসে তিনি দেশ-বিদেশ ঘুরবেন। তাকে বলতে নেই তিনি দেশে না বিদেশে। ছানু মিয়ার উত্থান নিয়ে ভিন্নমত পোষণকারী বিলেতপ্রবাসী লেখক নজরুল ইসলাম বাসন ভাই লিখলেন, ১৯৮৭ সালে নজরুল ইসলাম (সাবেক ভিপি এম সি কলেজ) ছানু মিয়াকে নিয়ে সাপ্তাহিক ‘সুরমা’ অফিসে এলেন। ছানু মিয়ার মাথাভর্তি কালো চুল, ফরসা চেহারা এককথায় সুদর্শন একজন তরুণ, তবে তার মাঝে আমি যেন শিশুসুলভ এক ধরনের ব্যবহার লক্ষ্য করলাম। তার এই শিশুসুলভ ব্যবহারই মানুষ পছন্দ করত। ভাবা যায়? আশির দশকে ছানু মিয়া ফুটবল টুর্নামেন্ট দিয়েছিলেন আজকের বাংলাটাউন এলাকায়। তার উদ্বোধন করেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছানু মিয়ার ‘বড়বোন’। আশির দশকে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা যখন লন্ডনে থাকেন বাঙালিরা তখনো এত সচ্ছল হয়নি, বাঙালিদের গাড়ি হাতে গোনা। তখন ছানু মিয়া ছুটছেন রানারের মতো তার ছাই রঙের ফোর্ড এসকট নিয়ে। ছানু মিয়ার সঙ্গে যারা চলেছেন তারা ছানু মিয়ার কথা নিয়ে মজা করতেন। মনে করতেন এটা এক ধরনের ‘ফান’। আসলে এগুলো ‘ফান’ না। তার কানেকশন সত্যি বড় গভীর। সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার তার ব্যক্তিগত বন্ধু। টনি ব্লেয়ার যখন লেবার পার্টিতে ‘স্লিপ’ নিয়ে হাঁটতেন ছানু মিয়া তখন লাঞ্চে তার সঙ্গে বিড়ি টেনেছেন। টনি বেন বা পিটার শো লিজেন্ডারি শ্রমিক নেতা। রাত ১২টা-১টায় ছানু মিয়ারে ফোন করেছেন, ছানু গাড়ি নিয়া আও (অবশ্য ইংরেজিতে)। নেলসন ম্যান্ডেলা জেলে। ছানু মিয়া পাগল। উইনি ম্যান্ডেলার সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ। উইনি ম্যান্ডেলা লন্ডন আসেন। ছানু উইনিকে নিয়ে লন্ডনে হাঁটেন। নেলসন ম্যান্ডেলা লন্ডন এসে ছানুকে জড়িয়ে ধরেন। ছানু বলেন, আমি ‘মুজিবুর’-এর দেশের মানুষ। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারী কাদের সিদ্দিকী তখন ভারতে। ছানু মিয়া কাদের সিদ্দিকীকে দেখতে যান ভারতে। লন্ডনে এসে কাদের সিদ্দিকী ব্রিকলেন ঘোরেন ছানু মিয়া আর চঞ্চলের সঙ্গে। গাফ্ফার চৌধুরী বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ফিল্ম বানাবেন। সেটা মনে হয় নব্বই দশকের প্রথমার্ধে। ছানু মিয়া সরাসরি যোগাযোগ করলেন অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে। মুম্বাই ছুটলেন। বাউল আবদুল করিমকে যখন কেউ চেনে না, ছানু মিয়া বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে নিয়ে সুনামগঞ্জ ছুটলেন। আনোয়ার চৌধুরীর অশ্রুসিক্ত চোখ মিডিয়ায় আসল আবদুল করিমের গান শুনে। আরব আমিরাতের প্রিন্স ‘আল সাবা’র ব্যক্তিগত বন্ধু ছানু মিয়া। ফেসবুকে ছানু মিয়ার একটা ছবি ভাইরাল ছিল ব্রিটিশ মেরিনের টুপি মাথায় ছানু মিয়া। বাসন ভাই তাকে ‘জেনারেল’ ডাকতেন। প্রায়ই বলতেন সেনাবাহিনীর সঙ্গে আর্মস ডিলিং করবে। রাশিয়া যাবে, চীন যাবে। মিলিয়ন পাউন্ডের ডিল। তার সঙ্গে যারা চলেন তারা ‘হাসেন’। ছানু মিয়া আযম খানকে প্রথম নিয়ে আসেন লন্ডন। তার ভাষায় জেনারেশন চিনুক। বিলেতে প্রথম টিভি ‘বাংলা’ টিভির ওপেনিং প্রোগ্রামে এরিনার দায়িত্বে ছানু মিয়া। মুম্বাই থেকে বাঙালি মিঠুন চক্রবর্তীকে নিয়ে এসেছেন। বাউল কালা মিয়া, সাজ্জাদ নূর, মামুন এদের পরিচিত করান। সব থেকে বড় কথা হলো আশির দশকের মেইন স্ট্রিম মিডিয়ায় চ্যানেল ফোরের মাধ্যমে তুলে ধরেন বিলেতের যুদ্ধাপরাধীদের কথা। ব্রিটিশ মেইন স্ট্রিম মিডিয়ার রুহুল আমিনরা ছানু মিয়ার সঙ্গে চলেন। এভাবেই গুড মর্নিং ঢাকা বলে হারিয়ে যান আমাদের ছানু মিয়া।

     লেখক : বিলেতপ্রবাসী, কলাম লেখক

Add Comment

Click here to post a comment