মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের দায় মিয়ানমারের-ফরিদুল আলম

%e0%a6%ab%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%86%e0%a6%b2%e0%a6%aeমানবতা, মানবাধিকার ও মানবিক আইন ধীরে ধীরে রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল থেকে কতটা আলগা হয়ে পড়েছে তার একটা খণ্ডিত চিত্র নির্বিচারে রোহিঙ্গা নিধন। গত ৩০ নভেম্বর মধ্যরাতেও মংডু শহর থেকে ট্রলার বোঝাই করে শতাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের পথে রওনা করার সময় সেনাবাহিনীর নির্বিচারে গুলিবর্ষণে ও ভয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে নিহত হয় ৪৩ রোহিঙ্গা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী সারি সারি লাশ পানিতে ভাসছিল এবং গুলিবিদ্ধ অনেককে সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। গত ৯ অক্টোবরের পর থেকে রাখাইন রাজ্যে নির্বিচারে রোহিঙ্গা নিধন চলছেই। প্রথম সাত দিনের মধ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গুলিতে শতাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও সে দেশে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্র্রবেশে সরকারের বাধা-নিষেধের কারণে অদ্যাবধি নিহতের সংখ্যা কত শত বা হাজারে গিয়ে পৌঁছেছে, তা নির্ণয় করার কোনো সুযোগ নেই। এদিকে ৯ অক্টোবরের পর থেকে সেনা অভিযানের কারণে নিরাপত্তার সন্ধানে হাজার হাজার রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার তথ্য মতে, এরই মধ্যে কমপক্ষে ১০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে এবং কমপক্ষে ৩০ হাজার দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী যেভাবে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর হামলা চালাচ্ছে—জাতিসংঘের একজন কর্মকর্তা এর আগে একে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। গত ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘের মানবিক ত্রাণবিষয়ক দপ্তর বলেছে, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যা করছে তা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। দেশে দেশে বিক্ষোভ হচ্ছে মিয়ানমার সরকারের এই অমানবিক আচরণের প্রতিবাদে এবং সেই সঙ্গে শান্তিতে নোবেলজয়ী সে দেশের সরকারের উপদেষ্টা অং সান সু চির নোবেল প্র্রত্যাহারের দাবি পর্যন্ত উঠেছে। কারণ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারপ্রধান না হলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে তাঁর পরিকল্পনায়ই বর্তমান সরকার পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দীর সামরিক শাসনের পর গত বছর গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সু চির দল সরকার গঠনের মাত্র আট মাসের মাথায় ফের সামরিক শাসনের কায়দায় বেসামরিক সরকারের নির্দেশে যেভাবে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়ে আসছে, সংগত কারণেই সব অভিযোগের অঙ্গুলি নির্দেশিত হচ্ছে সু চির দিকে। গত ২ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুর সফরকালে সে দেশের নিউজ এশিয়া নামের এক টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সু চি দাবি করেন যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে এবং সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনায় শুধু রোহিঙ্গা মুসলমানরাই নয়, উদ্বেগ ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে সে দেশের রাখাইন জনগোষ্ঠীও। তিনি ব্যাপারটিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি অভিযোগ করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তাদের ইতিবাচক সহযোগিতা কামনা করেন। মিয়ানমারে সু চির দল ক্ষমতাসীন হওয়ার পর অনেকের মধ্যেই এক ধরনের আশাবাদের সঞ্চার হয় এই ভেবে যে একদা শান্তিতে নোবেলজয়ী সু চি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এ সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। এ আশাবাদ আরো গভীর হয় যখন সু চি  জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে ছয়জন মিয়ানমারের নাগরিক ও তিনজন বিদেশির সমন্বয়ে ৯ সদস্যের এক পরামর্শক কমিশন গঠন করেন। এই কমিশন তাদের কার্যক্রম শুরু এবং সরকারের প্রতি কোনো পরামর্শ দেওয়ার আগেই ঘটে যাওয়া ঘটনা পর্যবেক্ষণে গত ২ ডিসেম্বর রাখাইন রাজ্য পরিদর্শনে গেলে সেখানকার রাখাইন সম্প্রদায়ের বিক্ষোভের মুখে পড়ে। সার্বিক পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণে কমিশনের পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শকে সরকার কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবে সে বিষয়েও এক ধরনের সন্দেহ থেকে যায়। কারণ এর আগেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে বলে সু চি দাবি করেছেন। এরই মধ্যে মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অর্থাৎ রোহিঙ্গা নির্যাতন ইস্যু নিয়ে মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার সমালোচনা তারা প্রত্যাশা করে না এবং এটা আসিয়ান জোটের নীতি অনুযায়ী অন্য দেশের সার্বভৌম বিষয়ের প্রতি হস্তক্ষেপ এবং এর ফলে আসিয়ান জোট ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এবার একটু দেখা যাক, এ ব্যাপারে অর্থাৎ নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের রক্ষার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক তৎপরতা কোন পর্যায়ে রয়েছে। এ অভিযানের পর থেকে পালিয়ে যাওয়া শরণার্থীদের ব্যাপারে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন তাদের মানবিক আশ্রয় প্রদানের জন্য অনুরোধ জানালেও অদ্যাবধি মিয়ানমার সরকার কর্তৃক ক্রমাগত চলতে থাকা রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়ে জাতিসংঘ কর্তৃক কোনো নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ কিংবা কোনো প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। উপরন্তু যে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকদের শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেবে তার কোনোটাই এ রোহিঙ্গা সম্প্রদায় ধারণ করে না। কারণ ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী পূর্ণ নাগরিক নয় এমন কোনো ব্যক্তির সন্তানাদি এবং ভবিষ্যৎ বংশধর সে দেশের সরকারি চাকরিসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে, মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত না থাকায় তারা সে দেশের নাগরিকত্ব আইনের শর্ত পূরণ করে না। এ অবস্থায় নির্যাতিত একটি দেশের জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাথমিক আন্তর্জাতিক আইনি রক্ষাকবচ হচ্ছে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রের ১৪(২), যেখানে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেকেরই নিগ্রহ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অন্য দেশে আশ্রয় প্রার্থনা ও তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ’ উল্লেখ্য, এই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিবিহীন রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের আশ্রয় প্রার্থনার অধিকার সংকুচিত। এত কিছুর পরও বাংলাদেশ সরকার নির্যাতিত রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর প্রতি মানবিক আচরণ প্রদর্শন করে আসছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে  ২৫ বছর ধরে। ১৯৭৮ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রথমবারের মতো প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার পর ১৯৮০ সালে তাদের মিয়ানমার ফেরত নিলেও ১৯৯১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো মিয়ানমার থেকে আরো দুই লাখ ৫৬ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। ১৯৯৭ সাল নাগাদ বাংলাদেশ সরকার, মিয়ানমার ও ইউএনএইচসিআরের তত্ত্বাবধানে ধাপে ধাপে তাদের ফেরত পাঠানো হলেও সেই থেকে আজ অবধি প্রায় ৩২ হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজারের দুটি শরণার্থী শিবিরে রয়ে গেছে; যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এর আগে ফেরত যাওয়াদের একটি অংশসহ আরো প্রায় পাঁচ লাখ নতুন করে ফিরে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, যারা আইনের দৃষ্টিতে অবৈধভাবে কক্সবাজার, টেকনাফসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করছে এবং কথিত রয়েছে যে তারা মাদক ব্যবসা ও অবৈধ অস্ত্র পরিবহনসহ নানা ধরনের নাশকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মিয়ানমারের শীর্ষ নেতৃত্বের দুই দফা বৈঠকে এসব নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত শরণার্থীর প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় নতুন করে মিয়ানমারের আইনানুযায়ী এসব রাষ্ট্রহীন জাতিগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার অর্থ হচ্ছে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ দায় বহন করা, যা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর হাঙ্গেরি সফর-পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে গত ৩ ডিসেম্বর সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তাদের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরো মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন এবং যারা তাদের সীমান্ত চৌকিতে আক্রমণ করেছে বলে মিয়ানমার সরকার অভিযোগ করেছে, তাদের বাংলাদেশে আশ্রয় না দিয়ে গ্রেপ্তার করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন বলে প্রধানমন্ত্রী জানান। বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে এ ক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্যও খুব স্পষ্ট। মানবাধিকার কিংবা মানবতাবিরোধী কোনো অপরাধ আমরা যেমন সমর্থন করতে পারি না, একই সঙ্গে মিয়ানমার সরকার কর্তৃক পরিচালিত কোনো অভিযানে যদি মানবাধিকারের ব্যত্যয় ঘটে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত তাদের এ ব্যাপারে চাপ প্রয়োগ করে এ অবস্থার অবসানে ভূমিকা পালন করা। এরই মধ্যে বাংলাদেশে যে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে তাদের ব্যাপারে সরকার কী পরিকল্পনা করছে, তা স্পষ্ট নয়। অতীতের অনিষ্পন্ন সমস্যার সমাধানে ব্যাপক কার্যপরিকল্পনা গ্রহণ আশু প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে যেহেতু মিয়ানমারের সমস্যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী বাংলাদেশ সরকার, তাই বাংলাদেশের উচিত হবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে এটিকে উত্থাপন করা এবং যদি সম্ভব হয়, তবে এ লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা; যার মধ্য দিয়ে মিয়ানমার সরকারকে কার্যকর চাপ প্রয়োগের একটি ক্ষেত্র তৈরি হবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

mfulka@yahoo.com

Advertisements

Add Comment

Click here to post a comment