খেলা-ধুলা

রোনালদোর ব্যালন ডি’অরের নেপথ্যে যা কিছু

৬১টি ম্যাচে দেশ এবং ক্লাবের হয়ে মেসি করেছেন ৫৮টি গোল। করিয়েছেন ৩২টি। রোনালদো ৫৫ ম্যাচে করেছেন ৫১টি। করিয়েছেন মাত্র ১৭টি। অথচ সেই তিনি চতুর্থবার ব্যালন ডি’অর জিতে নিয়েছেন। কারণ তো অবশ্যই আছে। রোনালদো কেন এই বছরের ব্যালন ডি অ’অর পুরস্কারের যোগ্য, সেই উত্তর নিচেই দেখুন ।

ব্যালন ডি’অর ফিফার বাইরে সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার। ফ্রান্স ফুটবল সাময়িকী এই পুরস্কার দিয়ে থাকে। বিশ্বজুড়ে ১৭৩ জন সাংবাদিকদের ভোটে সবাইকে পিছনে ফেলতে হয় বিজয়ীকে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বাস করা হয়, এই পুরস্কারে এতটুকু কারচুপির সুযোগ থাকে না।

ফুটবল দিনশেষে দলগত খেলা হলেও ব্যক্তিগত আলোর রোশনাই এখন ফোটাতেই হয়। বছরজুড়ে রোনালদো সেটা ফুটিয়েছেন। রোনালদোর চেয়ে মেসি বেশি ম্যাচ খেলেছেন। হাঁটুর ইনজুরি এতটাই মারাত্মক ছিল যে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল খেলা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত মাঠে নেমে দলের জয়ের সঙ্গী হন পর্তুগীজ তারকা। এছাড়া ২০১৬ সালের ইউরোর খুব কাছে এসে ওই ইনজুরিতে পড়ে জাতীয় দলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত মাঠে নেমে দলকে চ্যাম্পিয়ন করেন।

ইনজুরি পাশ কাটিয়ে যে ম্যাচগুলোতে মাঠে নেমেছেন, ফুটেছেন ফুল হয়ে। মাথা দিয়ে, ডান পা দিয়ে, বাম পা দিয়ে, বক্সের বাইরে-ভেতরে, সেট পিসে রোনালদো ছিলেন অদ্বিতীয়। যাকে বলে পরিপূর্ণ এক স্ট্রাইকারের প্রতিমূর্তি।

বছরের শুরুতে লেফট-উইঙ্গার হিসেবে বেশ কয়েকটি ম্যাচে দেখা গেছে। তবে উইঙ্গার হিসেবে মাঠে নামলেও আউট-এন্ড-আউট স্ট্রাইকার হিসেবে তার সমকক্ষ কাউকে দেখা যায়নি। বিশেষ করে পেনাল্টি বক্সের ভেতর এই মুহূর্তে তিনি অন্যদের চেয়ে হাজার গুণ এগিয়ে। পর্তুগালের কোচ এবং রাফায়েল বেনিতেজ রোনালদোকে স্ট্রাইকার হিসেবেই বেশি ব্যবহার করেছেন। আক্রমণভাগের শীর্ষে রেখে তাকে দিয়ে ফায়দা লুটেছেন।

রিয়ালে জিদান যুগ শুরু হওয়ার পর রোনালদোকে আরো কার্যকরী মনে হয়েছে। বেশ কয়েকটি ম্যাচে দলটির নতুন কোচকে ৪-৪-২ ফর্মেশনে খেলতে দেখা যায়। এভাবে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ও আসে। এই কৌশলে রোনালদো ইসকোর সামনে ফলস নাইন হিসেবে দুর্দান্ত ঝলক দেখিয়ে হ্যাটট্রিক করেন। ওই ম্যাচের পর জিদান ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আমার কাছে তার (রোনালদোর) ব্যালন ডি’অর জেতা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। এমন ম্যাচে তিন গোল সবাই করতে পারে না।’

বেনজেমাকে দলে পেতে জিদান মাঝে মাঝে ৪-৩-৩ ফর্মেশনেও খেলেছেন। এই কৌশলেও রোনালদো ভয়ঙ্কর। মেসি-সুয়ারেজ খারাপ নয়। কিন্তু এল ক্লাসিকোতে এই ফর্মেশনে খেলেও কেউ গোল করতে পারেননি।

শুধু আক্রমণেই নয়, গোটা মাঠে জিদান রোনালদোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। প্রয়োজনের সময় লেফট-ব্যাকের সাইড ট্যাকলে সাহায্য করেন। সম্প্রতি ডর্টমুন্ডের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করা ম্যাচে রোনালদোকে এভাবে রক্ষণে সাহায্য করতে দেখা গেছে। ম্যাচের কয়েক মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পর রোনালদো পরিস্থিতি পড়ে ফেলেন। ডর্টমুন্ডকে বেশ ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছিল। রোনালদো তাই বারবার নিচে নেমে আসছিলেন। মেসিকে খুব একটা এসব করতে দেখা যায়নি।

নেতা রোনালদো:

এই মুহূর্তে রোনালদো যতখানি তারকা, তার চেয়ে বেশি দল অন্তপ্রাণ খেলোয়াড়। কী পর্তুগাল, কী মাদ্রিদ-সব জায়গায় রোনালদো নেতা হয়ে দলকে টেনেছেন। ইউরোর ফাইনালে ২৫ মিনিটের সময় ইনজুরিতে পড়ে মাঠ ছাড়লেও তার সতীর্থরা রোনালদোর জন্য শিরোপা আনতে লড়াই করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে হারিয়ে জিতেও যায় পর্তুগাল। সেদিন ম্যাচের একমাত্র গোলদাতা এডার বলেছিলেন, ‘আমরা রোনালদোর জন্য চ্যাম্পিয়ন হতে চেয়েছি।’ ওই দিন রোনালদো আহত হয়ে ড্রেসিংরুমে চলে যাননি। গোটা ম্যাচে সাইড লাইনে দাঁড়িয়ে সতীর্থদের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। ক্যামেরা বারবার তার দিকে ঘুরছিল। কোচের সঙ্গে নেতা রোনালদোকে আলাদাই করা যাচ্ছিল না।

রিয়ালেও এই রোনালদোর দেখা মিলেছে। আগে দেখা যেত সতীর্থরা একটু ভুল করলেই রোনালদো রেগে যেতেন, এখন সেখানে কালেভদ্রে তাকে রাগতে দেখা যায়। শোনা যায়, জিদানই রোনালদোকে এভাবে গড়েছেন।

রিয়ালের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে ১২০ মিনিট পর্যন্ত গোলহীন ছিলেন সিআর সেভেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে শট নিতে দাঁড়িয়ে যান। শেষ পর্যন্ত মাথা ঠাণ্ডা রেখে বল জালের বুকে পাঠিয়ে দলকে চ্যাম্পিয়ন খেতাব উপহার দেন।

রিয়েল হিরো:

ব্যক্তিগত জীবনেও রোনালদো সত্যিকারের নায়ক। বিস্মৃত শৈশবের স্মৃতি কাটিয়ে নিজেকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়েছেন তিনি। বান্ধবী ইরিনা শায়েক তাকে ছেড়ে চলে গেলেও রোনালদো নিজের জীবন আর ফুটবলকে হেলায় ভাসিয়ে দেননি। নিখুঁত ফুটবলার হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন। করছেন। সবসময় দলকে তাতিয়ে রাখেন সেরা সাফল্য ছিনিয়ে আনতে।

এই মৌসুমে রিয়ালের আরো দুটি ম্যাচ বাকী আছে। তাই রোনালদোর সামনে সুযোগ আছে গোলসংখ্যা বাড়িয়ে নেয়ার। রিয়াল যেভাবে ছুটছে তাতে ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ জেতা খুব একটা কঠিন হবে না। হয়তো কঠিন হবে না আরেকটি লা লিগা জেতা কিংবা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, কোপা ডেল রে জেতা। রোনালদো তো বলেই দিয়েছেন, সামনের বছরও দলকে সব জেতাতে প্রাণপণ চেষ্টা করবেন। বছরের সেরা খেলোয়াড়ের মুখ থেকে এমন কথা ভেসে আসলে প্রলাপ বলার সুযোগ নেই। তাছাড়া নামটা যে তার রোনালদো।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

এই মুহূর্তে পৃথিবী নামক একটি গ্রহের সেরা ফুটবলার!

ভিডিও নিউজ : ক্রিকেট নিয়ে দম ফাটানো হাসির বিজ্ঞাপনের সংকলন (ভিডিও)

Add Comment

Click here to post a comment





সর্বশেষ খবর