ঢাকা

রাজধানীতে `ব্লু হোয়েল` গেমস খেলে আত্মহত্যার জন্য কিশোরের ঘুমের ট্যাবলেট সেবন!

রাজধানীর মিরপুর কাজীপাড়া থেকে প্রচুর ঘুমের ওষুধ সেবন করে অসুস্থ হওয়ায় তৌফিক আহমেদ সাদাফ নামে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরিবারের ধারণা সাদাফ ব্লু হোয়েল গেমস খেলে আত্মহত্যার জন্য ঘুমের ট্যাবলেট সেবন করে। এতে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। অন্য দিকে, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট। প্রাথমিক তদন্তে কিশোরের ঘুমের ওষুধ খাওয়ার পেছনে ব্লু হোয়েল খেলার সম্পৃক্ততা পায়নি তারা। গত মঙ্গলবার রাতে গুরুতর অবস্থায় তাকে প্রথমে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সাদাফের মা ইতি জানান, তাদের ছেলে সাদাফ ছোটবেলা থেকে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটে পারদর্শী ছিল। বর্তমানে সে মিরপুর ১০ নম্বরের সরজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণীর ছাত্র। সে পঞ্চম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। তিনি বলেন, গত ঈদুল আজহা থেকে সাদাফের মধ্যে আমূল পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। তিনি বলেন, সাদাফ ঘরের দরজা বন্ধ করে পরিবারের অন্য সদস্যদের এড়িয়ে চলতে থাকে। ঘরের মধ্যে অন্ধকার করে ভৌতিক সিনেমা দেখে। গভীর রাতে একা একা ছাদে উঠে রেলিংয়ের ওপর দিয়ে হাঁটার চেষ্টা করে। পরে একদিন ভোর ৪টায় তিনি জেগে দেখেন ছেলে ঘরে নেই। কেয়ারটেকার ছাদে তালা দিয়ে রাখায় ওই দিন ছাদে যেতে পারেনি। পরে খোঁজ নিয়ে দেখেন সাদাফ একা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজতেছে। ঘরে ডেকে আনার পর দেখা গেল তার হাত কাটা। হাত কেটেছো কেন জানতে চাইলে সাদাফ বলে ‘আম্মু এটা একটা গেমস। তুমি বুঝবা না।

তিনি আরো বলেন, এরপর কয়েক দিন দেখা গেছে সে মুখ দিয়ে একটা আওয়াজ করে। আমাদের পরিবারের সবার সাথে খারাপ ব্যবহার করতে শুরু করে। একপর্যয়ে দ্বিতীয় হাতও কেটে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে। ছেলের এমন আচারণের ব্যাপারে কয়েকজনের সাথে কথা বললে তাদের মধ্যে একজন ব্লু হোয়েল হেমস সম্পর্কে তথ্য দেয়। তার কাছে শুনে ইউটিউবে সার্চ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ইউটিউবে সার্চ দেয়ার পর ছেলের আচরণে সাথে এ খেলার অনেক কিছু মিলে যাওয়ায় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। সাথে সাথে ছেলেকে নিয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখান। এর মধ্যে দুই-তিনবার ১০-১২টা করে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ফেলে সে। গত মঙ্গলবার ২৭টি ঘুমের ট্যাবলেট সেবন করে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে তাকে সোহরাওয়ার্দীতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। মা আরো বলেন, তার ধারণা সাদাফ এ গেমসের লাস্ট স্টেজে রয়েছে।

কারণ সম্পর্কে মা বলেন, তার আচরণ ছিল অস্বাভাবিক। তার জীবন ভালো লাগত না, বাঁচতে ভালো লাগত না। তার একটি কথা ছিল। আমি বড় একটা চাপের মধ্যে আছি, আমার মাথায় অনেক বড় বোঝা। আমি বাঁচতে চাই না। আমার মরে যেতে ইচ্ছা করে। এর মধ্যে সে প্রচুর ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে বাইরে রাস্তায় হাঁটতে শুরু করে। তাকে এ অবস্থায় বাইরে যেতে নিষেধ করলে সে জানায়, ‘আমাকে বলা হয়েছে এ অবস্থায় আমাকে রোড দিয়ে হাঁটতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাদাফের ফেসবুকে চীন ও ইন্ডায়ার কয়েকজন বন্ধু আছে। এর মধ্যে চীন থেকে তার আইডিতে হ্যাকিং মাস্ক পাঠায়।

ঢামেকে ওই ছাত্র সাংবাদিকদের বলে, দেড় মাস আগে মালয়েশিয়ার এক ফেসবুক বন্ধু থেকে ব্লু হোয়েল গেমসের সংবাদ পাই। কৌতূহলবশত ‘ডার্ক ওয়েব’ থেকে ‘ব্লু হোয়েল’ গেমের লিংক বের করি। এরপর খেলতে থাকি। তখন গেমটির ইন্সট্রাকশন (দিকনিদের্শনা) পড়ে আমি জানতে পারি, এ গেম খেলার পরিণতি মৃত্যু। প্রথমে আমাকে খুব সহজ সহজ শর্ত দেয়া হয়। তখন শর্তগুলো আমার বেশ মজা লাগছিল। পরে আস্তে আস্তে চ্যালেঞ্জিং হওয়ায় আমি গেমটি এগিয়ে নিয়ে যাই। অনেক স্টেপ সম্পন্ন করতে না চাইলে অ্যাডমিনরা অপমান করে কথা বলত, বোকা বলত। তাই চ্যালেঞ্জগুলো পার করতাম। এভাবে যখন আমি ১১ নম্বর স্টেপে যাই তখন তারা আমার হাত কেটে তাদের ছবি পাঠাতে বলে। আমি হাত কেটে ছবি পাঠালেও তাতে তারা সন্তুষ্ট হতো না।

তারা আমাকে বকাবকি করতে থাকে এবং আরো কঠিন শর্ত দিতে থাকে। তারা আমাকে বাসার সিঁড়ির রেলিং দিয়ে হাঁটতে বলে। এটি না করলে আমাকে অপহরণ করবে বলে জানায়। তবুও আমি তাদের এসব শর্ত পূরণ করতে পারছিলাম না। তখন গেমটি আনইন্সটল করতে চাই। তবে কিছুতেই হচ্ছিল না। পরে মোবাইলটি ভেঙে ফেলি এবং ঘুমের ওষুধ খাই। তার দাবি, গেমটির প্রতি তার এখন কোনো ইন্টারেস্ট (আগ্রহ) নেই। বাংলাদেশের আর কেউ এ গেমটি খেলতে পারবে না। কারণ এর লিংকটি ডার্ক ওয়েব থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে যারা এখনো গেমটি খেলছে তাদের মৃত্যু অবধারিত। তাকে এ গেম অনেক পেইন দিয়েছে। ওই কিশোর চিকিৎসক ও তার মাকে বলেছে, আম্মুকে বলেছিলাম এখানে আনলে আমি ভালো হবো না। তাও আমাকে নিয়ে এসেছে। আমি নিজেই নিজেকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসব।

বিষয়টি জানার পর গতকাল দুপুরে ঢামেক হাসপাতালে যান ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের এডিসি নাজমুল ইসলাম। এ সময় তিনি কিশোরের কাছ থেকে বিষয়টি জানেন। নাজমুল ইসলাম বলেন, ব্লু হোয়েল খেলায় আসক্ত হয়ে ওই কিশোর এমনটি করার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তার হাতে যে দাগ পাওয়া গেছে তা সে মানসিক কোনো বিষয় নিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে এমনটি করেছে। তবে সে যে ডেস্কটপটি ব্যবহার করত তা জব্দ করে পরীক্ষা করা হতে পারে বলে জানান তিনি।

ঢামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা: মুক্তাদির ভূঁইয়া বলেন, ওই কিশোরকে গত মঙ্গলবার রাতে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এরপর থেকে সে ভর্তি আছে। তার পরিবারের কাছ থেকে জানতে পারি, সে ব্লু হোয়েল গেমে আসক্ত হয়েছিল। সেখান থেকে রাতে সে অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলে। ওষুধের পাশ্ব প্রতিক্রিয়ায় তার কয়কটি সমস্যা দেখা দিয়েছে। তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। এখন অনেকটা ভালো। তাকে ঢামেকের মনোচিকিৎসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। তারা দেখেছেন। আগামীকাল শনিবারও মানসিক চিকিৎসক তাকে দেখবেন।