আন্তর্জাতিক

মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের পাশে সু চির না থাকার কারণ

মিয়ানমারের রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর দমন অভিযান রোধে দেশটির গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন বলে আশা করেছিল বিশ্ব মহল। মিয়ানমারে ক্ষমতায় শীর্ষে থাকা এই নারী অবশ্য হতাশ করেছেন বিশ্ববাসীকে। নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী সু চি বর্তমানে দাঁড়িয়েছেন অশান্তির পক্ষে। কথিত গণতন্ত্রপন্থী নেত্রীর এমন অবস্থানের কারণ বিশ্বের গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউইয়র্ক টাইমস, আল জাজিরাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের তদন্তে বলা হয়েছে, সু চি বরাবরই মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অধিকারের ব্যাপারে বিপরীত অবস্থানে থেকেছেন।

সামরিক বাহিনীর চাপও তার উপর রয়েছে। দীর্ঘদিন গৃহবন্দীত্বের পর দেশটির মূল রাজনীতিতে প্রবেশের জন্য কম কষ্ট তার সহ্য করতে হয়নি। তৎকালীন জান্তা সরকারের দমননীতির অভিজ্ঞতা তার ভালোই রয়েছে।

গত বছর তাঁর দল ক্ষমতায় আসার পর প্রেসিডেন্ট পদে না থাকলেও স্টেট কাউন্সিলরসহ সর্বোচ্চ ক্ষমতায় রয়েছেন সু চি। কিন্তু দেশটিতে এখনও সামরিক বাহিনীর প্রভাব স্পষ্ট। ফলে সু চির একার পক্ষে রোহিঙ্গাদের দমন অভিযানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া বেশ কঠিন।

তাছাড়া সুচি’র দল এনএলডি (National League for Democracy)’এর একটা বড় অংশই বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। দলের অনেকেই রোহিঙ্গাদের বহিরাগত বাঙালি মনে করে। রোহিঙ্গারা কয়েক প্রজন্ম ধরে মিয়ানমারে বসবাস করলেও কোনো ধরনের নাগরিক অধিকার দিতে রাজি নয় এনএলডি’র অধিকাংশ নেতারা। মিয়ানমারের অধিকাংশ নাগরিকও একই মত পোষণ করে থাকে।

সুতরাং, সু চি ভালো করেই জানেন রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়ে দেশটির অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর বিরাগভাজন হয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের সুযোগ নেই। ক্ষমতায় আসার পর সু চি যে বিষয়গুলোর প্রতি জোর দিয়েছেন তা হল, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি।

সু চির নীতিতে গোড়া থেকেই রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর অধিকারদানের বিষয়টি স্থান পায়নি। সু চি’র দল ক্ষমতায় আসার পর রোহিঙ্গাদের উপর নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের মাত্রা বৃদ্ধির মাধ্যমেই এটা স্পস্ট যে, বিষয়টিতে তার অবস্থান কতটা কঠিন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে। আর তা হল, সু চি’র দল সরকারে থাকলেও মিয়ানমারে সেনাপ্রধান মিন অং হিলাইং অনেক বিষয়েই সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার রাখেন। দেশটির নিরাপত্তা ইস্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর নিয়ন্ত্রণ তারই হাতে। এছাড়া ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে মিয়ানমারের সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে বাজেটের নিয়ন্ত্রণও আগে থেকেই নিশ্চিত করে রেখেছে সামরিক বাহিনী। পার্লামেন্টের এক চতুর্থাংশ আসনও সেনাসদস্যদের জন্যে বরাদ্দ রাখা হয়।

ফলে সু চি’র হাতে ক্ষমতা থাকলেও রোহিঙ্গাদের পক্ষে যাওয়াটা তার জন্যে সহজ নয়। তবে সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে তার নিজের কি রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সহমর্মিতা রয়েছে কিনা। আর সেটি যে তার নেই, সে কথা অতীতেও একাধিকবার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন সু চি।

জাতিসংঘের তথ্য মতে, গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর দমন অভিযান শুরুর পর রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় সব আবাসস্থল জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে প্রায় ৫ হাজার মানুষকে। হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ এবং লুটপাটের হাত থেকে বাঁচতে গত ৩ সপ্তাহে প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।