খেলা-ধুলা

মিরাজ খুলনা না বরিশালের এটা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক, সত্যটা কি?

1aখুলনা ঠিক ‘আমার শহর’ নয়। তবে আমার সাবালক হয়ে ওঠা খুলনা শহরে। বাগেরহাট থেকে খুলনা খুব বেশী দূরের শহর নয়। কিন্তু যে সময়ের কথা বলছি, তখন খুলনা শহরে যেতে হয় আমাদের দুটো নদী পার হয়ে-ভৈরব আর রূপসা।

স্কুল পড়ুয়া আমাদের জন্য দুই নদীর দূরত্ব তখন সাত সমুদ্দুর সমান। দুটো ফেরি পার হয়ে সারা দিনের ধকল সামলে দু একবার তখন অবদি যে খুলনায় গেছি, তাতে শহরটাকে আপন করে নেওয়ার সুযোগ হয়নি ছোট বেলায়। সেই সুযোগটা এলো।

মেজদা ভর্তি হলো খুলনা পলিটেকনিক্যালে। শুরু হলো আমার খুলনা যাতায়াত। চিনলাম পিকচার প্যালেস, বৈকালী হল, সার্কিট হাউজ এবং খালিশপুর। এই খালিশপুরেই সাবালক হয়ে উঠলাম। ‘সাবালক’ হয়ে ওঠার আরও কিছু উপকরণ ছিলো; সে এই সমাজে বলাটা ঠিক হবে না।

আরেকটু বড় হয়ে খুলনায় যখন নিয়মিত আড্ডা দেই, তখন আমাদের আড্ডার কিছু বন্ধু ক্রিকেট খেলছে। আমরা শুনি, তারা কেউ স্পিনার সালাউদ্দিন হতে চায়, কেউ হাসানুজ্জামান ঝড়ু হতে চায়; কেউ আবার কুষ্টিয়ার সুমনও হতে চায়। এর মধ্যে শুনলাম, আমাদের এক বন্ধুর বন্ধু জাতীয় দলের কাছে কাছে চলে এসেছে; সে নাকি অনেক বড় অলরাউন্ডার-মানজারুল ইসলাম রানা।

রানার বাড়িও খালিশপুর। রানার কথা আজ আর না বলি। ক্রিকেটাঙ্গনে আমার প্রথম বন্ধু; মাশরাফি-রাসেলদের সাথে পরিচয়ের সূত্র আমার রানা!

সেদিন দুপুর বেলায় যখন খালিশপুরে মেহেদী হাসান মিরাজের বাড়ি যাচ্ছিলাম, বাম হাতে রয়ে গেলো রানার বাড়ি। সঙ্গী দৈনিক ইত্তেফাকের খুলনা ব্যুরো প্রধাণ এনামুল হক বললেন, ‘দাদা, চেনেন? এখানে রানার বাড়ি ছিলো।’

আমি আবেগের ধার না ধেরে বললাম, ‘খালিশপুর এলাকাটা জাতীয় দলে ক্রিকেটার সাপ্লাই দেয় মনে হয়।’রানা, নুরুল হাসান সোহান এবং এবার মিরাজ।

ভাবলাম, মিরাজকেও পুরো খালিশপুরের ছেলে বলে চালিয়ে দেবো। ঢাকা থেকে যাওয়ার সময়ই জানতাম, মিরাজকে নিয়ে একটা ‘খুলনা-বরিশাল’ তর্ক চলছে। তাই প্রশ্নটা মিরাজের বাবা, জালাল হোসেন সাহেবকে করতেই হতো।

কিন্তু প্রশ্নটা করার আগেই জালাল সাহেব আগ বাড়িয়ে বললেন, ‘ওর পরিচয়টা লেখার সময় একটু বরিশালের কথা লিখবেন। খুলনায় বড় হয়েছে। কিন্তু বাড়ি তো বরিশালের বাকেরগঞ্জে। এলাকার লোকজন মন খারাপ করে বলে, বাড়ির কথা কেউ লেখে না।’

আমি পাল্টা বললাম, ‘সে তো আপনার বাড়ি বরিশালে। মিরাজ তো খুলনার।’

মিরাজের বাবা একটু অসহায় হয়ে আমার ছেলেমানুষী দেখেন আর হাসেন, ‘নাহ। ওর জন্মও তো বরিশালে।’‘সে হোক। বড় তো হয়েছে খুলনায়।’

মিরাজের বাবা এবার একটু আবেগী হয়ে পড়েন, ‘দেখেন বাবা, মিরাজের নাড়ি পোতা বরিশালে। ওইখানে ওর দাদার বাড়ি, ওইখানে ওর দাদী আছেন। এর চেয়ে বড় ব্যাপার তো আর কিছু নেই।’

আমরাও রসিকতার মেজাজ থেকে সরে আসি। আস্তে করে বলি, ‘দাদা-দাদীর খুব ভক্ত ছিলো?’

মিরাজের বাবা কষ্টে নিজেকে সামলান, ‘দেখেন, সত্যি কথা হলো, মিরাজের ক্রিকেট খেলায় বাসায় কেবল এই দাদা আর দাদীর কাছ থেকে সাপোর্ট পাইতো।’ ‘কেন?’

‘‌‘আমরা তো গরীব মানুষ। স্বপ্ন দেখি, ছেলে মেয়ে পড়াশোনা করে চাকরি করবে। ক্রিকেট খেলে যে ভবিষ্যত আছে, তা তো বুঝতাম না। ওর দাদা নিজে গান বাজনা পছন্দ করতেন। বলতেন, নাতিটা গায়ক হলে ভালো হয়। যখন শুনলেন, নাতি ক্রিকেট খেলতে চায়, বললেন-তাই খেলুক। খেলা যাই হোক, মনে যা চায়, তাই করুক। মিরাজের সেই দাদা ওর এই দিন দেখে যেতে পারলেন না…’

কান্নায় ভেঙে পড়া মিরাজের বাবাকে সামলানোর চেষ্টা করি না। কিছু কান্না জল হয়ে বের হয়ে আসতে হয়।

আমরা গল্প শুনি। মিরাজ কিভাবে ঈদে, উৎসবে ছুটে যান বরিশালে। দাদীর খেলা দেখার জন্য টিভি কিনে সেট করে দিয়ে আসেন। দাদার কবরের কাছে গিয়ে কেমন চোখের পানি ফেলেন। বুঝতে পারি মিরাজ খুলনার এবং মিরাজের প্রাণটা বরিশালের। মীমাংসা হয় না।

এই সময় হাসতে হাসতে এগিয়ে আসে রুমানা আক্তার মিম্মা; মিরাজের বোন। ‘মাশরাফি’ বইটা পড়ে ফেলেছে বলে এমনিতেই তাকে পাশ মার্ক দিয়ে দিলাম। হা হা হা…

ক্রিকেট নিয়ে, বাংলাদেশ নিয়ে যে চমৎকার ধারণা নিয়ে কথা বলছিলো, তাতে লেটার মার্ক দিতে হলো। বোঝা গেলো, এই বাড়ির ছেলেমেয়েগুলোর ক্রিকেট বিষয়ক স্মার্টনেসের অভাব নেই।

আমরা যখন খুলনা-বরিশাল নিয়ে রশি টানাটানি করছি, পুরোনো দিনের কথায় পরিবেশ যখন ভারী হয়ে এসেছে, তখন মিম্মা এসে এক পশলা বাতাস দিয়ে উড়িয়ে দিলো সব কথা, ‘ভাইয়া কী আর শুধু খুলনার বা বরিশালের নাকি? ভাইয়া তো এখন পুরো বাংলাদেশের।’

আমরা খুলনা-বরিশাল হিসাব করতে থাকা মানুষগুলো নির্বাক হয়ে যাই। এই বিশালত্ব তো আমাদের ক্ষুদে চিন্তায় ছিলো না। আমাদের মিরাজ, আমাদের সাকিব, আমাদের তামিম, আমাদের মাশরাফি; কারো কী কোনো জেলা হয় নাকি! এরা সব বাংলাদেশের। একমাত্র বাংলাদেশের।

ভিডিওঃ আল্লাহর নাম শুনে কিভাবে পশুরা শান্ত হয়ে যাচ্ছে !!দেখুন.. (ভিডিও)

Advertisements

Add Comment

Click here to post a comment