মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রতিক্রিয়া উপমহাদেশেও বর্তাবে-আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীবিশ্বের সব প্রাণীর প্রাণ হরণের জন্য একজন ফেরেশতা আছেন। তাঁর নাম আজরাইল। এই আজরাইল ফেরেশতা সম্পর্কে একটি গল্প প্রচলিত আছে। রোজ কিয়ামতের আগে বিশ্বের সব জীবজন্তুর প্রাণ হরণ যখন শেষ হবে, তখন আল্লাহ বলবেন, হে আজরাইল, এবার তুমি তোমার জান কবজ  (প্রাণ হরণ) করো। আজরাইল তখন দিশাহারা হয়ে দিগ্বিদিক ছুটবেন, কিন্তু তাঁর সামনে কোনো উপায় থাকবে না। এটি ধর্ম-অনুমোদিত গল্প নয়। মানুষের মুখের গল্প। তবু এবারের মার্কিন প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের কোন্দল ও কাদা ছোড়াছুড়ি দেখে মনে হচ্ছে, মার্কিন গণতন্ত্রকেও আত্মহত্যার প্রবণতায় পেয়ে বসেছে। নইলে ইউনিপোলার বিশ্বে একক সুপারপাওয়ার হওয়ার পর মার্কিন রাজনীতিতে এত বড় অবক্ষয়ের চিহ্ন ফুটে উঠবে কেন? যুক্তরাষ্ট্র এত দিন পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বী সুপারপাওয়ার সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বহু প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রাণ হরণ করে এসেছে। এবার কি তার নিজের প্রাণ হরণের পালা?

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র একক সুপারপাওয়ারে পরিণত হয়েছিল। বিশ্বে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কথা বলার কেউ ছিল না। বুশ-চেনি-রামসফিল্ড যখন আমেরিকায় ক্ষমতায় আসেন তখন মনে হয়েছিল, ধরাকে তাঁরা সরা জ্ঞান করছেন। কিন্তু সেই দাপট বেশি দিন থাকেনি। আজ বিশ্বে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো সুপারপাওয়ার নেই। তবু বিশ্বে আমেরিকার রাজনৈতিক প্রভাব ক্ষীয়মাণ। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ও রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মনে হয় আমেরিকা এখন সাবেক তৃতীয় বিশ্বের কোনো কোনো দেশের অসুস্থ রাজনীতির ধারা অনুসরণ করছে। এবারের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নীতি ও কর্মসূচি প্রাধান্য পায়নি। পেয়েছে রুচিহীন ও নিম্নমানের চরিত্র হরণের প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় যিনিই জয়ী হোন, তাতে আমেরিকা বা বিশ্ববাসীর কোনো কল্যাণ নিশ্চিত হবে কি?

আজ ৮ নভেম্বর। আগামীকালটি হচ্ছে সেই দিন, যেদিন হোয়াইট হাউসের পরবর্তী বাসিন্দা কে, তা নির্ধারিত হবে। বিশ্বের উদারপন্থী রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ডেমোক্র্যাট হিলারিও একজন বিতর্কিত প্রার্থী। তথাপি তিনি নির্বাচিত হলে বিশ্বের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো বড় পরিবর্তন ঘটবে না। তিনি ওবামার নীতি অনেকটা অনুসরণ করবেন এবং বিশ্বে পতনশীল মার্কিন প্রভাব রক্ষা করার চেষ্টা করবেন। বুশ প্রশাসনের মতো বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে ‘মার্কিন সাম্রাজ্যে’র ভরাডুবি ঘটাতে চাইবেন না। অন্যদিকে ট্রাম্প নির্বাচিত হলে বিশ্বে বর্তমানে যেটুকু শান্তি আছে তাতেও বড় ধরনের ধাক্কা আসবে বলে উদারনীতিকরা আশঙ্কা করেন। নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প যে জিঙ্গোইজমকে সামনে নিয়ে এসেছেন, ‘আমেরিকা গ্রেট’ স্লোগান তুলে বিশ্বে মার্কিন আধিপত্য রক্ষায় আগ্রাসী নীতি গ্রহণের হুমকি দিচ্ছেন, তাতে পৃথিবী আবার প্রাক-দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে একটাই বড় ভরসা। গণতন্ত্রে যে চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের ব্যবস্থা থাকে, তা অনেক উন্নত দেশেই গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দিয়েছে। ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শক্তির গুণেই বিজেপি ক্ষমতায় এসে বাড়াবাড়ি করতে পারছে না। বরং ক্ষমতায় আসার আগে নরেন্দ্র মোদি যেসব উগ্র স্লোগান দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এসে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেননি। বরং প্রধানমন্ত্রী মোদির এখন ভিন্ন মূর্তি। আমার নিজের মনেও প্রশ্ন, ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের বাসিন্দা হতে পারলে তাঁর কি ভিন্ন চেহারা দেখা যাবে? যদি দেখা যায়, তাহলে বুশ (জুনিয়র) আমেরিকাসহ সারা বিশ্বের যে ক্ষতি করে গেছেন, ট্রাম্প হয়তো তা করবেন না। কিন্তু তাঁর সুমতি না ফিরলে দুনিয়ার মানুষ এক ভয়ংকর আশঙ্কার সম্মুখীন হতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সারা বিশ্বেই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, এবারও করবে তাতে সন্দেহ নেই। সুপারপাওয়ার হিসেবে আমেরিকা আগের অবস্থানে নেই—এ কথা সত্য। কিন্তু সূর্য যেমন পড়ন্ত বেলায়ও আলো ছড়ায়, আমেরিকাও তেমনি তার পড়ন্ত বেলায় প্রভাব ছড়াচ্ছে। আমাদের উপমহাদেশও এই প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। ওয়াশিংটনে ডেমোক্র্যাট অথবা রিপাবলিকান যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, তাদের এশীয় নীতিতে উপমহাদেশ সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। জর্জ বুশ ক্ষমতায় থাকাকালে তাঁর পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের ভারত-প্রেমনীতিকে অনুসরণ করতে দ্বিধা করেননি। জর্জ বুশ যখন বিশ্বের অধিকাংশ রাজধানীতে (লন্ডনসহ) প্রত্যাখ্যাত, তখন দিল্লিতে এসে সাদর সংবর্ধনা পেয়েছিলেন।

ওবামা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরো দৃঢ় করেছেন। ওবামা ও মোদি দুজনই দুজনকে ফার্স্ট নেম ধরে ডাকেন। চীনের সঙ্গে আমেরিকার সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখনো প্রবল, কিন্তু আমেরিকার এশীয় নীতিতে ‘চীনকে আর এগোতে না দেওয়া’র পদক্ষেপ হিসেবে ভারতের সঙ্গে অধিকতর মৈত্রী সম্পর্ক রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তাতে চীন বিরক্ত, ভারত খুশি। মার্কিন কূটনীতির যে ধারা, ঠাণ্ডাযুদ্ধের যুগ শেষ হলেও তাকে জিইয়ে রাখা ও নিজেদের আধিপত্য রক্ষার চেষ্টা, ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের ক্রমোন্নতি ঘটতে না দিয়ে এশিয়ায় সেই স্নায়ুযুদ্ধের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

ভারত-প্রেমের স্বার্থে আমেরিকা তার এতকালের আজ্ঞাবাহী মিত্র পাকিস্তানকেও দুয়োরানির ঘরে ঠেলে দিয়েছে। অভিমানী পাকিস্তান রাশিয়ার দিকে ঝুঁকতে চাইছে। পারবে কি না সন্দেহ। পাকিস্তান জন্মের পর থেকে আমেরিকার সঙ্গে যে সাত পাকে বাঁধা, তা ছিন্ন করা সম্ভব নয়। কাশ্মীর নিয়ে বর্তমানে যে সংকট নতুন করে দেখা যাচ্ছে, তাতে আমেরিকার ভূমিকা বরের ঘরের পিসি এবং কনের ঘরের মাসির মতো। ভারতের উদারপন্থীরা আশা করেন, হিলারি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ক্লিনটন-ওবামার নীতি অনুসরণ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করবেন।

সম্ভবত অনেকেরই মনে থাকার কথা, হিলারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম ক্ষমতায় আসেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য হিলারি কলকাতা পর্যন্ত ছুটে এসেছিলেন। ভারতের রাজনীতি সম্পর্কে হিলারির আগ্রহ তখনই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। ট্রাম্পের মতো বেসামাল উক্তি করে তিনি চীনকে চটাবেন তা-ও মনে হয় না। ভারত সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোভাব এখনো সুস্পষ্ট নয়। তিনি ভারতের সঙ্গে সমমর্যাদামূলক সম্পর্ক রক্ষা করতে চাইবেন, না আধিপত্যমূলক মনোভাব গ্রহণ করতে চাইবেন, সে সম্পর্কে দিল্লিও নিশ্চিত নয়। তারাও ৯ নভেম্বর নির্বাচনের ফলের জন্য অপেক্ষা করছে। তবে দিল্লির সাংবাদিক বন্ধুদের সঙ্গে কথাবার্তায় মনে হলো, হিলারি নির্বাচিত হলেই দিল্লি অনেকটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে।

পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফ মন্ত্রিসভা ও মিলিটারি এস্টাবলিশমেন্টের একটি কট্টরপন্থী অংশ মনে করে, ট্রাম্প বিজয়ী হলে পাকিস্তানের লাভ হবে। ট্রাম্প যুদ্ধ ভালোবাসেন বলে ঘোষণা করেছেন, হয়তো পাকিস্তানের কাশ্মীরসংক্রান্ত বর্তমান নীতি ও জঙ্গিপনা ট্রাম্পের পছন্দ হবে। ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে তিনি আর দুয়োরানি করে রাখবেন না। ওয়াশিংটন ও নিউ ইয়র্কের অধিকাংশ মিডিয়া এটা সর্বতোভাবে বিশ্বাস করে না। তাদের ধারণা, ট্রাম্প যতই উগ্রপন্থী হোন, দক্ষিণ এশিয়াসংক্রান্ত বর্তমান মার্কিন নীতিতে তাঁর ইচ্ছা থাকলেও বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারবেন না। মার্কিন সামরিক এস্টাবলিশমেন্টই তাতে বাধা দেবে। বুশ ও ওবামা যে এশীয় নীতি অনুসরণ করেছেন, তাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা মার্কিন স্বার্থেই আঘাত হানবে। ট্রাম্প যতই একগুঁয়ে হোন, আমেরিকায় ‘ইনভিজিবল গভর্নমেন্টে’র সিদ্ধান্ত পরিবর্তন তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশের তথাকথিত সুধীসমাজের একটা অংশ বহুদিন যাবৎ গুজব ছড়াচ্ছিল, গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনূস সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারের অনুসৃত নীতিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হিলারি ক্লিনটন শেখ হাসিনার ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন না এবং এখনো সন্তুষ্ট নন। হিলারি ক্ষমতায় এলে হাসিনা সরকার বিপাকে পড়বে। প্রচারণাটি উদ্দেশ্যমূলক, সঠিক নয়। মার্কিন এশীয় নীতিতে যে মনোভাবটির প্রতিফলন ঘটেছে, তা হলো আমেরিকার স্বার্থেই উপমহাদেশের বর্তমান স্থিতাবস্থা আপাতত তারা নষ্ট করতে চায় না। সুতরাং বাংলাদেশের জন্য আলাদা করে হিলারি বা ট্রাম্প নীতি নির্ধারণ করবেন, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে সহজ নয়।

তা ছাড়া হাসিনা সরকারও এমন অবস্থায় দেশকে নিয়ে এসেছে, কারো চোখরাঙানিতে নতি স্বীকারের দেশ বাংলাদেশ আর নয়। ড. ইউনূসকে নিয়ে আমেরিকাসহ কয়েকটি পশ্চিমা শক্তির চোখরাঙানি ও পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের হুমকিকে বাংলাদেশ পাত্তা দেয়নি। ভবিষ্যতে অনুরূপ অবস্থা সৃষ্টি হলে বাংলাদেশের শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

৯ নভেম্বরের আর এক দিন বাকি। ট্রাম্প বা হিলারি যিনিই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হোন, তার প্রতিক্রিয়া অবশ্যই বাংলাদেশেও বর্তাবে। হিলারি নির্বাচিত হলে বাংলাদেশের উল্লসিত হওয়ার যেমন কিছু নেই, তেমনি ট্রাম্প নির্বাচিত হলে শঙ্কিত হওয়ারও কিছু নেই। যেকোনো ঘটনায় প্রতিক্রিয়া সামাল দিতে ও পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে আনতে শেখ হাসিনা যে দক্ষ, সেটা তিনি ভারতের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির বিশাল বিজয়ের পরও দেখিয়েছেন। হিলারি বা ট্রাম্প যিনিই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হোন, তার প্রতিক্রিয়া সামাল দেওয়ার দক্ষতা তিনি আবার দেখাবেন।

হিলারি আমার পছন্দের মানুষ নন। তবু তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হলে আমি খুশি হব। অন্তত তাতে বিশ্বের, বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে হঠাৎ কোনো অনিশ্চিত অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে না।

লন্ডন, সোমবার, ৭ নভেম্বর, ২০১৬



আজকের জনপ্রিয় খবরঃ

গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ:

  1. বুখারী শরীফ Android App: Download করে প্রতিদিন ২টি হাদিস পড়ুন।
  2. পুলিশ ও RAB এর ফোন নম্বর অ্যাপটি ডাউনলোড করে আপনার ফোনে সংগ্রহ করে রাখুন।
  3. প্রতিদিন আজকের দিনের ইতিহাস পড়ুন Android App থেকে। Download করুন

Add Comment

Click here to post a comment