মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিন-বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

‘মানুষ সত্যিই পাখির মতো, পাখা নেই তবুও পাখির চেয়ে বেশি উড়ে। ’ ৫ তারিখ নাগরপুরে সম্মেলন।

ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল, সেখান থেকে নাগরপুর। রাতে ফিরে শাকিলের মৃত্যু সংবাদ। যা ছিল অভাবনীয়! এর মধ্যে আবার তামিলের জনপ্রিয় নেত্রী জয়ললিতার মহাপ্রয়াণ। শোকে ৩০০ লোকের আত্মাহুতি। শাকিলের জানাজায় যোগ দিতে ২টায় রওনা হয়ে ৫টা ৫-৭ মিনিটে ময়মনসিংহ পৌঁছি। সঙ্গে যারা ছিল তাদের বলেছিলাম, ’৬৮-৬৯ সালে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে দাদু সৈয়দ নজরুল ইসলামকে নিতে এসেছিলাম। জননেতা মান্নান ভাইয়ের ভক্স ওয়াগন গাড়িতে ময়মনসিংহ থেকে ১ ঘণ্টা ১০ মিনিটে টাঙ্গাইল পৌঁছেছিলাম। তখন রাস্তা তেমন ভালো ছিল না, এখন এত ভালো রাস্তা তবু ৯০ কিলোমিটার ৩-সাড়ে ৩ ঘণ্টায় পৌঁছানো যায় না। কাচিঝুলির ঈদগাহর উল্টো পাশে ভাগ্নি সুমুর শ্বশুরবাড়ি অজু করতে গিয়েছিলাম। সুমুর স্বামী আরিফ খান শুভ্রর ঢাকা যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু ভাগ্য ভালো দেখা হয়ে যায়। শুভ্রর বাবা জনাব নুরুজ্জামান খান নিলো মিয়া বড় ভালো মানুষ। কবে কোনকালে ’৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু তার বাড়ি গিয়ে হেলনা চেয়ারে আরাম করেছিলেন। আমি গেলে আমাকেও সেটায় জোর করে বসান। শুভ্রর মা ফেরদৌসী জামান আরও ভালো মানুষ। ওই অল্প সময়েই এটাওটা করেছিলেন। মাগরিবের নামাজের সময় হয়ে এসেছিল, তাই তাড়াতাড়ি অজু সেরে মাঠে গিয়েছিলাম। তিল ধরার জায়গা ছিল না জানাজায়। ময়মনসিংহের মানুষ অসম্ভব ভালো। তারা আমায় সব সময় অভাবনীয় সম্মান করে। স্বাধীনতার আগে তেমন বড় কেউ ছিলাম না। তবু দাদু সৈয়দ নজরুল ইসলাম, রফিক ভূইয়া, জামালপুরের অ্যাডভোকেট আবদুল হাকিম, ফুলপুরের শামসুল হক, মুক্তাগাছার শহীদুল্লাহ মালেক আরও অনেকে যত্ন করতেন। আর এখন ময়মনসিংহের প্রায় সব নেতাই আমার স্নেহধন্য, অতিপ্রিয়। অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন জেলা সেক্রেটারি, শাকিলের বাবা অ্যাডভোকেট জহিরুল হক সভাপতি। মাননীয় মন্ত্রী প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান আমার জন্য কেমন করেন লিখে বোঝানো যাবে না। মুক্তিযুদ্ধে ঢালু ইয়ুথ ক্যাম্প সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। সে যে কী অসীম ধৈর্য নিয়ে পরিশ্রম করেছেন তার কোনো তুলনা হয় না। যে যাই বলুক, আওয়ামী লীগ সভা আর বক্তৃতা ছাড়া কিছু করতে পারে না, সেটা জীবিত-মৃত সব ক্ষেত্রেই একই রকম। জানাজা শুরুর দিকে খুব গোলমাল ছিল, ছিল বিশৃঙ্খলা। নামাজিদের প্রতি কিছু বলে ধর্মমন্ত্রী প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান এবং শাকিলের বাবা অ্যাডভোকেট জহিরুল হক আমার গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিলেন। তার স্পর্শে আমি অনুভব করছিলাম, পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ হিমালয়ের চেয়েও কত বেশি ভারী। দয়াময় প্রভু যেন চরম শত্রুকেও অমন বোঝা না দেন। একপাশে বিভাগীয় কমিশনার জি এম সালেহউদ্দিন এবং ডিআইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, অন্য পাশে শাকিলের বাবা, মাননীয় মন্ত্রী মতিউর রহমান। আরও দাঁড়িয়েছিলেন আমার একসময়ের খুবই প্রিয় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এস এম কামাল হোসেন ও সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি। জানাজার মুহূর্তে মনে রাখার মতো অভূতপূর্ব শৃঙ্খলা ও নীরবতা ফিরে এসেছিল।শাকিলের ছোট ভাই বাবুর দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল। বাবুকে আমি খুব একটা দেখিনি। কিন্তু শাকিল ছিল আমার সন্তানের মতো। ’৯০-এ যখন দেশে ফিরি, খুব সম্ভবত ও তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। সকাল-বিকাল বন্ধু-বান্ধব নিয়ে বাবর রোডে আসত, ‘মামি, মামি, খেতে দিন। ’ বিশেষ করে শাকিলের যেন ক্ষুধা লেগেই থাকত। তাতে আমার বউ খুবই আনন্দ পেত। তারও আগে ’৭২-৭৫-এর দিকে সৈয়দ নুরু, কামাল মজুমদার, মমতাজ রাতদিন দলবেঁধে আসত, খাবার খেত। সারা দিন স্কুটার চালিয়ে ভাড়া না দিয়ে ফেলে যেত। সে দায় বইতে হতো আমাকে। আজ কে ওসব মনে রাখে। মনে রেখে লাভ কী। আর লাভ না হলে যখন যেমন তখন তেমনই তো ভালো। জননেতা রাজ্জাক ভাই মারা যাওয়ার কদিন আগে খুব বিরক্ত হয়ে লিখেছিলাম, ‘রাজ্জাক ভাইয়ের স্ত্রী যত নেতা-কর্মীকে ভাত খাইয়েছেন, সেই ভাতের যদি দাম নিতেন তাহলে রাজ্জাক ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য কারও কাছে হাত পাততে হতো না। বরং ১০ বার অপারেশন করেও টাকা বাঁচত। ’ হোটেল বা দোকানের ভাতের যে দাম বা মূল্য আছে, আমাদের সে দামও নেই।

মানুষ মারা গেলে বড় হয়, সম্মান পায়— সেটা শাকিলের ক্ষেত্রেও দেখলাম। কিন্তু আমার নেতা বঙ্গবন্ধু মরেও শান্তি পাননি। ঝাঁজরা বুকে ৫৭০ সাবানে গোসল করিয়ে রিলিফের কাপড়ে ১৭-১৮ জন জানাজা পড়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান পিতাকে কবর দিয়েছিল। তাকে তখন কেউ সম্মান দিতে চায়নি। কিন্তু শাকিল? ওর জন্ম ’৬৮ সালের ২০ ডিসেম্বর। আমার বিয়ের কথা ছিল ’৬৬-তে কুমিল্লায় বরিশালের এক মেয়ের সঙ্গে। তা যদি হতো তাহলে ওর বয়সী আমারও সন্তান থাকত। শাকিলের জানাজায় অসম্ভব লোক হয়েছিল। ওর যত বছর তত হাজার তো হবেই, হয়তো বেশিও হতে পারে। গিয়েছিলাম টাঙ্গাইল থেকে। ঢাকা ফেরার কথা ছিল। তাই শহরের ওপর দিয়ে যখন ফিরছিলাম তখন মনে হচ্ছিল এই মাত্র শাকিলের জানাজা পড়ে এলাম, কিন্তু ময়মনসিংহ শহরের জানাজা তো অনেক আগেই পড়া হয়ে গেছে। চলার জো নেই। যানজটে দাঁড়িয়ে থাকায় লোকজন ছুটে এসে হাতে চুমু খাচ্ছিল। পলাশ সরকার নামে এক ছেলে বলল, ‘আপনার লেখা সব সময় পড়ি। শাকিল ভাইয়ের কথা তো লিখবেন, আমার নামটাও লিইখেন। ’ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রিন্সিপাল রশিদ, বেলাল, শাহীনরা খুব ছোটাছুটি করেছিল। চরপাড়া সিএনজি স্টেশনে ওদের বিদায় দিয়ে ঢাকার পথ ধরেছিলাম। ময়মনসিংহ থেকে ৮০-৮৫ কিলোমিটার জয়দেবপুর এসেছিলাম ৭০-৭৫ মিনিটে। সেখান থেকে ৩০-৩২ কিলোমিটার মোহাম্মদপুরে আসতে লেগেছিল ২ ঘণ্টা ১০ মিনিট— এ হলো রাস্তাঘাটের অবস্থা।

এ সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা নারায়ণগঞ্জের সিটি করপোরেশন নির্বাচন। গতবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ মনোনীত শামীম ওসমানকে পরাজিত করে আইভী মেয়র হয়েছিলেন। এবার কী হবে! কদিন আগে দেখলাম শামীম ওসমান আইভীর হয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন নাসিম ওসমান পার্কে। তারা মনে করছেন, করপোরেশনের সীমানার বাইরে বলে নির্বাচনী বিধিবিধান নষ্ট বা লঙ্ঘন হয়নি। নির্বাচনী নীতিমালায় ভিতর-বাইর নেই, জনসম্মুখে অথবা প্রচারমাধ্যমে এমপি ও আরও যারা নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারেন না তাদের কথা বলা বা যে কোনো প্রচার করাই নির্বাচনী বিধি ভঙ্গ। ’৪৯ সালে টাঙ্গাইল দক্ষিণ উপনির্বাচনে জননেতা শামসুল হকের পক্ষে হুজুর মওলানা ভাসানীর একটি প্রচারপত্রের জন্য তার সদস্যপদ বাতিল হয়েছিল। তবে গণমাধ্যম ছাড়া ঘরে বসে কোনো নেতার কথা বলায় বাধা নেই। সেই অর্থে অবশ্যই শামীম ওসমানের কর্মকাণ্ডে বিধি ভঙ্গ হয়েছে। আমার মনে হয় ওসবের কোনো প্রয়োজন নেই। এবার শামীম ওসমান পক্ষে বললেও যা, বিপক্ষে বললেও তা— আইভীই জিতবেন। বিগত দিনের কর্মকাণ্ডের জন্যই তিনি জিতবেন। তা ছাড়া তার প্রতিদ্বন্দ্বী এখনো ভোটারদের কাছে গ্রহণীয় প্রার্থী হয়ে উঠতে পারেননি। অনেকে বলছেন, মেয়র হতে নয়, পরিচিত হতে তার এ নির্বাচন। তিনি কতটা প্রকৃত বিএনপি সে নিয়েও কথা হচ্ছে। তাই এ নির্বাচনে আইভীর পরাজিত হওয়ার কোনো পথ বা উপায় নেই। নির্বাচনটা আওয়ামী লীগ সরকার এবং জননেত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত চলে গেছে। মেয়েরা কুশিকাঁটায় প্রিয়জনের জন্য শীতবস্ত্র বোনে, কিন্তু কাঁটা ছুটে গেলে একটানে সব খুলে যায়। নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনও আওয়ামী লীগের জন্য অনেকটা তেমনি। একজন দক্ষ যোগ্য প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছা করে তার পরাজয় ডেকে আনবেন? কখনো না।

ডিসেম্বর মাসে টিভি চ্যানেলের অত্যাচারে সত্যিই খুব একটা ভালো থাকি না। জঘন্য হানাদারদের নাপাক না বলে মেয়ে শিল্পীরা যখন মধুর সুরেলা কণ্ঠে ‘পাক বাহিনী, পাক বাহিনী’ বলে তখন ঘৃণায় বুক ফেটে যেতে চায়। কখনোসখনো কিছু কিছু মুক্তিযোদ্ধাও হানাদারদের ‘পাক বাহিনী’ বলে। কী করব? দশচক্রে ভগবান ভূত। মিডিয়াগুলো যাকে যেভাবে পারে সামনে আনে। তারা যদি এত কষ্ট করে এনে কাউকে মুক্তিবাহিনী বলে আর তাদের মুখ দিয়ে ‘পাক বাহিনী’ বলায় বা বেরোয় সেটা অস্বীকার করার উপায় কী? তাই খুব একটা ভালো নেই।

বহুদিন পর সেদিন ঘাটাইল শহীদ সালাউদ্দিন ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে যতটা সম্মানিত হয়েছি, অপমানিতও তার চেয়ে কম হইনি। সশস্ত্র বাহিনী দিবসে আমাদের উপহার দিয়েছে চায়ের কাপ, চাদর আর পাঞ্জাবি ও নগদ ৩ হাজার টাকা। কাপ-পিরিচ না হয় মানলাম, কিন্তু সবার হাতে ৩ হাজার কেন? তাহলে বীরপ্রতীক, বীরবিক্রম, বীরউত্তম কেন? ওই ক্যান্টনমেন্টেও সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট থেকে মেজর জেনারেল দেখলাম। তাইবা হবে কেন? কী দরকার মেজর জেনারেল আর সেকেন্ড লেফটেন্যান্টের পার্থক্য করে? সিপাই আর সুবেদারের পার্থক্যের? সব সমান হলেই তো হয়। সবার এক বেতন, এক পদবি। এসব বলতে ভালো লাগে না কিন্তু কেন যেন যাওয়ার বেলায় না বলে পারছি না। বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কতকিছু করার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিচ্ছু হবে না। কারণ দলীয় দৃষ্টিকোণ, সার্বিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক বিচার-বিবেচনা না করা। সব ডালে-চালে খিচুড়ি হয়ে গেছে। গ্রামগঞ্জের সাধারণ যোদ্ধারা যারা রাতদিন পরিশ্রম করেছে, মূলত যারা দেশ স্বাধীন করেছে তারা আজ কোথায়? আর যারা ঢাকায় থাকে, এখন দৌড়াদৌড়ি নড়াচড়া করতে পারে, কথা বলতে পারে, বিশেষ করে আমাকে ছোট করতে ঘরে-বাইরে ষড়যন্ত্র করে মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করতে পারে তারা বেশ ভালো আছে। অফিসে অফিসে ঘুরছে, সেখানে বড় বড় যুদ্ধ করছে আর সুবিধা নিচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাকে মুছতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকেও মুছতে হয়েছে। জাতীয় জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে আমার ছবি সরাতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবিও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বাহুবলে পায়ে হেঁটে মিত্রবাহিনীকে নিয়ে আমি না হয়ে অন্য কেউ যদি হানাদার নিয়াজির গুহায় প্রথম ঢুকত তাহলে তার কথা আকাশে-বাতাসে ছড়াত। আর আমার ছড়ানো কথা বাতাসচাপা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। মিরপুরে স্বাধীনতা সেতু, হেমায়েতপুরে যেখান থেকে নিয়াজিকে আত্মসমর্পণের চিঠি পাঠিয়েছিলাম, যেহেতু আমি ছিলাম তাই সব পড়ে আছে। আমাকে ঠেকাতে ২০-৫০ জনের হেমায়েত বাহিনী, বাতেন বাহিনী করা হয়েছে। কী বলব, সত্যিই বেঁচে থাকার বড় জ্বালা!

কেন যেন আজ কদিন শরীরটা ভালো নয়। প্রতিদিন জ্বর আসছে। বুঝতে পারছি না কী করা দরকার। জ্বরের কষ্টের চেয়েও শরীরে যন্ত্রণার কষ্ট বেশি। সহ্য করতেও কষ্ট হয়। শরীরের আর দোষ কী, ভাঙা গাড়িতে অত ছোটাছুটি করলে শরীর আর কত সাহায্য করবে? তারও তো একটা সহ্যের সীমা আছে। সকালে টাঙ্গাইল, বিকালে নাগরপুর, রাতে টাঙ্গাইল, তারপর ময়মনসিংহ, সেখান থেকে ঢাকা, আবার মির্জাপুর, নরসিংদীর শিবপুর, সখীপুর। শরীর তো বেঁকে বসতেই পারে। আজ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সখীপুরে সম্মেলন। তারপর যাব ত্রিশালের মুখ্যপুর জনাব আলী হোসেনের মজলিসে। তার বাবার মাজারে প্রতি বছর মজলিস হয়। আমি পীর-মুরশিদদের সম্মান করি তবে কারও মুরিদ নই। একটা সময় হুজুর মওলানা ভাসানীকে পেয়েছিলাম। তিনি ছিলেন জ্ঞানের আধার। আল্লাহতায়ালা তার দয়ার ভাণ্ডার থেকে তার ইচ্ছামতো আমায় অনেক দান করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় শাহ সুফি ছামান ফকিরকে পেয়েছিলাম। কোরআন-হাদিস সম্পর্কে অমন অগাধ জ্ঞান আমার জীবনে আর কারও মধ্যে দেখিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় কোরআন-হাদিস পড়া ছিল না। ছামান ফকিরই ছিলেন আমার হাদিস-কোরআনের অবলম্বন। অনর্গল কোরআনের আয়াত বা সূরা বলে যেতেন। শুনতাম, কিছু বুঝতাম, কিছু বুঝতাম না। কিছু মনে থাকত, কিছু থাকত না। এখন যখনই কোনো হাদিস দেখি, কোরআন পড়ি তখনই ছামান ফকিরের কথা মনে পড়ে।

জানি বামপন্থিরা ক্ষমতা ছাড়ে না, মরে তবু পদত্যাগ করে না। বিমানমন্ত্রীও পদত্যাগ করবেন না। করার দরকারও নেই। ব্যর্থ হয়েও যদি সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা যায় তাহলে পদত্যাগের প্রয়োজন কী? যে দেশে সফলতা-ব্যর্থতা একই নিক্তিতে মাপা হয়, তেল-ঘির এক দাম, সেই দেশে বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন পদত্যাগ করবেন— এটা ভাবা যায়! আরও শক্ত করে চেয়ার আঁকড়ে থাকাই তো ভালো।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সীমান্ত একেবারে খুলে দেবেন তেমন বলছি না, নিরাশ্রয়কে আশ্রয় দিতে বলছি। ’৭১-এ লাখ লাখ বাঙালিকে যদি মহান ভারত ফিরিয়ে দিত তাহলে আমাদের পরিণতি কী হতো? রোহিঙ্গাদের নিয়ে নানা পণ্ডিতের নানা কথা শুনি। কেউ বলে, বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে অনেক রোহিঙ্গা নানা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে বাংলাদেশের শ্রমবাজার নষ্ট করে। তাই রোহিঙ্গাদের জায়গা দেওয়া যাবে না। কারও মত, রোহিঙ্গাদের জন্য জঙ্গি কর্মকাণ্ড শক্তিশালী হতে পারে। আবার কোনো পণ্ডিতের অভিমত, দেশের ভূখণ্ড অনুযায়ী আমাদেরই লোক বেশি। বাইরের মানুষ জায়গা দেব কী করে? এসব কথার সিংহভাগ টাইটুই পরা নতুন-পুরান আমলাদের। কারণ তারা জীবনে দুঃখ-কষ্ট দেখেনি, উদ্ভ্রান্ত গৃহহারা হয়নি তাই অমন বলে। আমি জানি, এদের বলেকয়ে লাভ নেই। এরা যখন যেমন তখন তেমনের দল। জঙ্গি কর্মকাণ্ডের ভয়ে যদি মানবতা লাঞ্ছিত হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে না। আপনি আমার পিতার কন্যা, আপনি আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করেন না। তাই চাটুকারের কথায় নয়, বিবেকের নির্দেশে চলুন। কাছে থেকে আপনাকে সাহায্য করা আমার ভাগ্যে নেই, তাই দূর থেকে মনে করিয়ে দিই মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা ছিল নকশালপন্থিদের চারণভূমি। চারু মজুমদারের পদভারে কাঁপছিল। সে সময় প্রায় ৪০ লাখ শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিল। মেঘালয়ের লোকসংখ্যা ছিল ৬-৭ লাখ। সেখানে বাংলাদেশের শরণার্থী ছিল ১৫-১৬ লাখ। ত্রিপুরায়ও রাজ্যের জনসংখ্যার সমান শরণার্থী গিয়েছিল। আসামের জনসংখ্যার প্রায় চার ভাগের এক ভাগ ছিল বাংলাদেশের শরণার্থী। এখন বিশ্বদরবারে আমাদের যে অবস্থান, ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় মহান ভারতের অবস্থান আমাদের চেয়ে খুব বেশি ভালো কিছু ছিল না। আর এখন আপনার নেতৃত্ব বিশ্বদরবারে বিবেচনা বা আলোচনা করার মতো। পাসপোর্ট নিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা নানা দেশে গিয়ে আমাদের শ্রমবাজার নষ্ট করে— এটা একটা ফালতু কথা। এর সঙ্গে দালাল বা দালালির সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের বা মানবতার কোনো সম্পর্ক নেই। আর বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে রোহিঙ্গাদের পৃথিবীর অন্যত্র যাওয়ায় দোষের কী? আমাদের বিপ্লবী সরকার এবং নেতারা যখন ভারতে ছিলেন, আমাদের লোকজন ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে পৃথিবীর নানা দেশে রাজনীতি করতে যাননি? কলকাতা থেকে যারা নানা দেশে কূটনীতি করতে গেছেন তাদের কোনো পাসপোর্ট ছিল? পাকিস্তানি পাসপোর্ট ভারত পছন্দ করত না, বাংলাদেশের কোনো পাসপোর্ট ছিল না। সময় পেরিয়ে গেলে কাকের মতো চোখ বন্ধ করে ঠোঁট মোছা ভালো নয়। মিয়ানমার সীমান্তে সাধারণ বাংলাদেশিরা এক বেলা কম খেয়ে রোহিঙ্গাদের খাওয়াতে পারে আর সরকার তাদের ছায়া দিতে পারে না— শুধু মুক্তিযুদ্ধের সময় নয়, ’৭৩-এ স্বাধীন বাংলাদেশের হাজীরা ভারতের পাসপোর্টে হজ করেছেন— এসব তো ভুলে গেলে চলবে না। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার কাছে নিবেদন, আজ বিশ্বদরবারে বহু ক্ষেত্রে আপনি নেতৃত্বের আসনে আসীন। মিয়ানমার মানবতা রক্ষায় মুসলিম উম্মাহর এই দুঃসময়ে আপনি সারা বিশ্বকে জাগ্রত করুন। আমাকে কোরবানি দিন, নির্বাসন দিন, তবু রোহিঙ্গা নিরাশ্রয়দের ফিরিয়ে দিয়ে জীবনহানির কারণ হবেন না। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে দয়াময় প্রভুর অনুগ্রহ লাভ করুন।

লেখক : রাজনীতিক।

Advertisements

Add Comment

Click here to post a comment