Default

মন্ত্রীর বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ

rব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে শুক্রবার ভোরে আবারও পাঁচ হিন্দু বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে। এদিকে নাসিরনগর-তাণ্ডব নিয়ে কোনো আন্দোলন না করার জন্য হুমকি দেয়া হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতাদের। প্রাণিসম্পদমন্ত্রী অ্যাডভোকেট ছায়েদুল হক ও তার অনুসারীরা ওই হুমকি দেন বলে নাসিরনগর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। তবে শুক্রবার রাত পর্যন্ত এটি জিডি বা এজাহার হিসেবে গ্রহণ করার তথ্য মেলেনি। থানার ওসি ও দায়িত্বরত কর্মকর্তারা বিষয়টি যুগান্তরের কাছে এড়িয়ে গেছেন।
এর আগে রোববার ১৫টি মন্দির ও শতাধিক বাড়িতে তাণ্ডব চালানো হয়, দেয়া হয় আগুন। এতে উসকানি দেয়ার অভিযোগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হকের ঘনিষ্ঠ তিন আওয়ামী লীগ নেতাকে বহিষ্কার করেছে জেলা আওয়ামী লীগ। এরা হলেন : নাসিরনগর সদর ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাশেম, চাপরতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি হাজী সুরুজ আলী ও হরিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ফারুক মিয়া। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার শুক্রবার রাতে বহিষ্কারের কথা স্বীকার করেন।
রাত ৯টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার রুহুল আমিন ও পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম। এর আগে নাসিরনগরে র্যাব সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।
রোববারের ঘটনার একটি ভিডিও যুগান্তরের হাতে এসেছে। এতে দেখা যায়, নাসিরনগর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হাশেম দুপুরের দিকে একটি মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার পরনে শ্যাওলা রঙের পাঞ্জাবি ও সাদা পায়জামা। মিছিলটি উপজেলা ঈদগাহ ও দত্তবাড়ি অতিক্রম করছে। এতে শত শত মানুষ উগ্র স্লোগান দিচ্ছে। অনেকের হাতেই লাঠিসোটা। এর মধ্য থেকে কয়েকজন উচ্ছৃংখল যুবক স্থানে স্থানে ভাংচুর করছে। অভিযোগ রয়েছে- এ মিছিল থেকেই দত্ত বাড়িতে হামলা ও ভাংচুর চালানো হয়।
সেদিনের তাণ্ডবের পর মন্ত্রী ছায়েদুল হকের সমর্থক হিসেবে পরিচিত আরও কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা আলোচনায় আসেন। ওই দিন সকালে উপজেলার চাপরতলা থেকে জঙ্গি মিছিল উপজেলা সদরে আসে। এর নেতৃত্বে ছিলেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী সুরুজ আলী। মিছিল থেকে দেবদেবী নিয়ে কটূক্তি ও অশ্লীল স্লোগান দেয়া হয়। মিছিলটি খেলার মাঠে হেফাজতপন্থীদের সমাবেশে যোগ দেয়া মাত্র মাঠটি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সমাবেশে হাজী সুরুজ আলী উসকানিমূলক বক্তব্য দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে সুরুজ আলী সে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু রসরাজের বিচার দাবি করেছি।’
একই দিন হেফাজতপন্থী ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে সমালোচনায় আসেন উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান সরকার। যদিও তিনি দাবি করেন, দুটি সমাবেশেই তিনি বক্তব্য দিয়ে পরিবেশ শান্ত করার চেষ্টা করেছেন। স্থানীয়রা জানান, হিন্দুদের ওপর তাণ্ডব চলার সময় সদর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শেখ আবদুল আহাদ বিভিন্ন বাড়ি ও মন্দির রক্ষায় এগিয়ে গিয়েছিলেন। তবে সাংগঠনিকভাবে উপজেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের হিন্দুদের রক্ষায় তেমন ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি।
৫ বাড়িতে আগুন : শুক্রবার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এলাকার নমশূদ্রপাড়ায় ফুল কিশোর সরকারের গোয়ালঘর, মৃণাল কান্তি সরকারের রান্নাঘর ও একটি পরিত্যক্ত ঘর, ঠাকুরপাড়ায় বিশ্বদেব চক্রবর্তীর পরিত্যক্ত ঘর এবং পশ্চিমপাড়ায় সাগর দাসের বাড়ির দুর্গা মন্দির পুড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্তরা জানিয়েছেন, রাত ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে এ আগুন দেয়া হয়। এ সময় তারা ঘুমিয়েছিলেন। প্রতিবেশীরা এগিয়ে এসে আগুন নেভান। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আতংক ছড়ানোর জন্যই এটা করা হয়েছে। তবে কেউ কেউ এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্যও করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন।
শুক্রবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক রেজওয়ানুর রহমান, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসাইন ও উপজেলা চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান সরকার। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী অ্যাডভোকেট ছায়েদুল হক নাসিরনগর ডাকবাংলোতে থাকলেও তিনি গত রাত ৮টা পর্যন্ত অগ্নিসংযোগের শিকার বাড়িঘর পরিদর্শনে যাননি।
শুক্রবারের অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হুসাইন বলেছেন, ‘বাইরে থেকে কেউ এসে আগুন লাগায়নি। সর্বত্র পুলিশি পাহারা ডিঙ্গিয়ে বাইরে থেকে কেউ এখানে আসতেও পারেনি। আমরা ঘটনাটি খতিয়ে দেখছি। আমরা অপেক্ষা করছি, ক্ষতিগ্রস্ত কেউ মামলা দেয় কিনা অন্যথায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।’
মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ : হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নাসিরনগর উপজেলা শাখার সভাপতি আদেশ চন্দ্র দেব নাসিরনগর থানার ওসি বরাবর একটি অভিযোগ দাখিল করেন। দুই পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে এক অংশে বলা হয়, তাণ্ডবের ঘটনার প্রতিবাদে পরিষদের পক্ষ থেকে সারা দেশে শুক্রবার মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এর আলোকে নাসিরনগরেও আমরা মানববন্ধনের কর্মসূচি ঘোষণা করি। কিন্তু মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী অ্যাডভোকেট ছায়েদুল হক ও তার অনুসারী কিছু লোক মানববন্ধন না করার জন্য হুমকি-ধমকি দেন। অভিযোগপত্রে তিনি তাকে, নাসিরনগর উপজেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি এবং হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের উপজেলা সভাপতি সুজিত চক্রবর্তীকেও হুমকি দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। অভিযোগটি থানায় ডায়েরিভুক্ত করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন করা হয়।
আদেশ চন্দ্র দেব শুক্রবার রাতে বলেন, ‘আমি থানার কর্তব্যরত কর্মকর্তার কাছে অভিযোগপত্রটি দিয়েছি। ওই সময় থানায় ওসি ছিলেন না। তবে অভিযোগপত্রটি রেকর্ড করা হয়েছে কিনা তা জানতে পারিনি।’ জানতে চাইলে নাসিরনগর থানার ওসি শওকত হোসেন শুক্রবার রাতে বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্বে আছি। অভিযোগটি সম্পর্কে এখনও আমি অবগত নই।’
হুমকি উপেক্ষা করে মানববন্ধন : মন্ত্রী ছায়েদুল হকের হুমকি উপেক্ষা করে মানববন্ধন করেছে ঐক্য পরিষদ। শুক্রবার সকালে স্থানীয় শহীদ মিনারের সামনে এ মানববন্ধন হয়। বৃষ্টি উপেক্ষা করে হিন্দু সম্প্রদায়ের শত শত মানুষ এতে অংশ নেন। ঘণ্টা খানেক স্থায়ী এ মানববন্ধনে আদেশ চন্দ্র দেব ও সুজিত চক্রবর্তী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি অসীম কুমার পাল, হিন্দু সমাজের নেতা স্বপন কুমার দেবনাথ, সুমন চক্রবর্তী, কেন্দ্রীয় ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরোর সদস্য আনিসুর রহমান মল্লিকসহ বেশ কয়েকজন বক্তব্য দেন।
তারা বলেন, মৎস্যমন্ত্রী বৃহস্পতিবার রাতেই স্থানীয় বিশিষ্ট হিন্দু নেতাদের ডাকবাংলোতে ডেকে নিয়ে শুক্রবারের মানববন্ধন করতে নিষেধ করেন। এ ঘটনায় পূজা উদ্যাপন পরিষদ ও ব্যবসায়ী নেতারা মন্ত্রীর সঙ্গে মানববন্ধন না করার কথা বলেন। এ কারণে শুক্রবার সকালের মানববন্ধনে পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি কাজল দত্ত, সাধারণ সম্পাদক হরিপদ পোদ্দার, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অঞ্জন দেব, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান প্রদীপ রায়সহ বেশকিছু নেতা যোগ দেননি।
সুজিত চক্রবর্তী বলেন, ‘একটি কুচক্রী মহল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হককে ভুল বুঝিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষ্যাপিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। মন্ত্রী আমাদের কয়েকজনকে ডেকে নেয়ার কথা বলেছেন বলে আমরা শুনেছি। এই ডেকে নেয়া গ্রেফতারের জন্য কিনা, তা বোধগম্য নয়।’ তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কর্মসূচি যাতে পালন করা না হয় সে জন্য উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, ভাইস চেয়ারম্যান এবং সাবেক ভাইস চেয়ারম্যানের নাম ব্যবহার করে ফোন করা হয়েছে। ফোনে ১৩টি ইউনিয়নের হিন্দু নেতাদের মানববন্ধন না করার জন্য বলা হয়। মানববন্ধন করা হলে প্রতিহত করা হবে বলে জানিয়ে দেয়া হয়। মানববন্ধন কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে বলে ফেসবুকে অসত্য তথ্য পর্যন্ত ছড়ানো হয়।’
আদেশ দেব বলেন, ‘আমার মা-বোন নির্যাতিত হওয়ার পর এবার আমাকে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। সারা জীবন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছি আর এই সরকার আমাকে গ্রেফতার করতে চায়।’ তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়ে দোষীদের গ্রেফতারে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। এদিকে নাসিরনগর উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অঞ্জন দেব জানান, তারা কাউকে মানববন্ধন করতে নিষেধ করেননি বা হুমকি দেননি। এ ধরনের যে অভিযোগ করা হয়েছে তা সত্য নয়।



আজকের জনপ্রিয় খবরঃ

গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ:

  1. বুখারী শরীফ Android App: Download করে প্রতিদিন ২টি হাদিস পড়ুন।
  2. পুলিশ ও RAB এর ফোন নম্বর অ্যাপটি ডাউনলোড করে আপনার ফোনে সংগ্রহ করে রাখুন।
  3. প্রতিদিন আজকের দিনের ইতিহাস পড়ুন Android App থেকে। Download করুন

Add Comment

Click here to post a comment