Advertisements
বিনোদন

ভয়ংকর সুন্দর নিয়ে যা বলছেন দর্শকরা

ভয়ংকর সুন্দর কেমন লাগল, এ প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর দিচ্ছি। ভালো। তো এই যে বললাম ভালো, তাহলে কেন ভালো লেগেছে তা বলাটাও এখন দায়িত্বের মধ্যে এসে পড়ে। কিন্তু মুশকিল হলো মাত্র একবার একটা চলচ্চিত্র দেখে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা খুব শক্ত কাজ। এই আমি কোন সম্মানিত সুধীজন নই, এ লেখা শুধু একজন আমদর্শকের প্রতিক্রিয়া মাত্র। চলচিত্রের গানগুলো ভালো তবে আরো ভালো হতে পারত। সংলাপ ভালো ছিল, ক্যামেরাওয়ার্ক খুব ভালো, আলোর কাজও প্রশংসনীয়। এই চলচ্চিত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নারীপ্রধান চরিত্র। এখানে থেকে কি চলচ্চিত্রটি আরেকটা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়? নয়নতারা ও মুকু এক ধর্মের নয়। তারা দুজন বিয়ে করে আইনের আশ্রয়ে। এখান থেকে কি কোনো মেসেজ পাচ্ছেন? ভালোবাসা, সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কার, নারী ভয়ংকর সব বিষয়কে খুব সুন্দরভাবে তুলে এনেছেন পরিচালক।

সাধারণ চোখে দেখলে একটা প্রেমের গল্প আর পানির জন্য হা-হুতাশ ছাড়া হয়তো কিছুই চোখে পড়বে না।
নয়নতারা (ভাবনা) বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকা এসেছে। নয়নতারা বেশ বনেদি ও ধনাঢ্য ঘরের সন্তান। সদরঘাটে নেমে সে উদ্দেশ্যহীন রিকশায় ঘুরছে। একসময় রিকশাওয়ালার সাহায্যে সে পুরান ঢাকার একটি হোটেলে রুম পায়।

নয়নতারার রুম সার্ভিস যে ছেলেটা তার ডাকনাম মুকু (পরমব্রত)। নয়নতারা পালানোর সময় বেশকিছু টাকাপয়সা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে এসেছে। সে মুকুকে ভালো খাবার আনতে পাঠায়, মুকু নিয়েও আসে কিন্তু নয়নতারা তা খেতে পারে না। কারণ নয়নতারার আভিজাত্য অনুযায়ী খাবার আনার কথা কোনো পাঁচতারকা হোটেল থেকে।

নয়নতারা, ধনীর আদরে সন্তান হিসেবে যা হয় তাই; আহলাদি, বস্তবতা বিষয়ক জ্ঞান কম এবং একটু জেদিও বটে। মুকু অতি সাধারণ সহজ-সরল, বোকা ও ভীরু প্রকৃতির মানুষ। যার বাবা-মা কারো স্মৃতিই মনে নেই, অনাদরে অযত্নে কাকার কাছে মানুষ। তো নয়নতারার সাথে মুকুর একটু বন্ধুত্বর মতো হয়ে যায়। ধনী ঘরের সন্তানরা সাধারণত এটা দাও, এটা আন, ওটা আন এ ধরনের বলার মতো প্রচুর মানুষ আশপাশে পায়। কিন্তু নয়নতারা এই শহরে পালিয়ে আসার পর তার একাকিত্বের সময় সেই সার্ভিসটুকু পাচ্ছিল মুকুর থেকে। ওদিকে একদিন কিছু কেনাকাটা করে ফেরার পথে পাড়ার মাস্তানের চোখ পড়ে নয়নতারার ওপর। এবং যথারীতি দুইবারের চেষ্টায় সে নয়নতারার নাগাল পেয়ে যায়। মুকুকে বের করে দিয়ে নয়নতারার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে সে, সেই ভীতুর ডিম মুকু ফুলদানি দিয়ে মাথায় আঘাত করে মাস্তানকে মেরে ফেলে।

ফলাফল দুজনই পালিয়ে যায় হোটেল ছেড়ে। এই যে মুকু পরিস্থিতির কারণে খুন করে ফেলল পাড়ার প্রভাবশালী মাস্তানকে, গতানুগতিক ছবি হলে কিন্তু তারপর মুকু হয়ে যেত এলাকার ডন বা এ জাতীয় কিছু। ভয়ংকর সুন্দরে তা কিন্তু হয়নি। এখানে আমরা নায়ক-নায়িকাকে অতিপ্রাকৃতভাবে উপস্থাপনের যে চেষ্টা চলচ্চিত্রের সংস্কৃতি হয়ে দেখা দিয়েছে তার থেকে মুক্তি পেলাম। ভাবনা এবং পরমব্রত সত্যিকার অর্থেই এ চলচ্চিত্রে নয়নতারা ও মুকু হতে পেরেছিলেন। এটাও বড় একটা সাফল্য। এরপর সাধ ও সাধ্যের সমন্ময়ে নয়নতারা ও মুকু বস্তিতে ঘর ভাড়া নেয়। মুকু কোনো এক হোটেলে ক্লিনিং সার্ভিসে চাকরিও নিয়ে নেয়। কিন্তু বস্তির লোকজন তাদের ভালোভাবে নেয় না। নিম্নবিত্ত শ্রেণির আরেকটি বাস্তব রূপ আমরা ভয়ংকর সুন্দরে আবারও দেখলাম।

নয়নতারার পোশাক, লাইফস্টাইল তারা মেনে নিতে পারে না। এদিকে এলাকায় পানি সরবরাহ বন্ধের কারণে নয়নতারা পানির জন্য হাহাকার করে। প্রতিবেশী বস্তিতে পানি আনতে গিয়ে বস্তিবাসীর আক্রোশ ও হামলার শিকার হয়। আসলে আমরা সাধারণত নিম্নবিত্তকে যে চোখে দেখি উচ্চবিত্তকে অন্য চোখে দেখি। কিন্তু আমাদের এ দেখা অনেকাংশে সঠিক নয়। নিম্নবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মতোই তাদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন মানুষকে প্রতিপক্ষভাবে ভয়ংকরভাবে। সেই সাথে হঠাৎ ওপরতলা থেকে পরিস্থিতির কারণে নিচতলায় নেমে গেলে নিচতলার মানুষগুলোর আচরণ যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে তা আসলে বাস্তবে যে এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েন নাই তিনি বুঝবেন না। সেই ব্যাপারটাই সুন্দরভাবে তুলে ধরতে পেরেছে ভয়ংকর সুন্দর। তো এরপর নয়নতারা এক ধরনের মানসিক অস্থিরতায় পড়ে যায়। সে তার স্বর্ণালংকার বিক্রি করে শত শত বালতি মগ, ড্রাম কিনে সেখানে পানি জমাতে শুরু করে।

মুকু ও নয়নতারা অপেক্ষা করে সেই দিনের যে দিন আবার পানি সরবরাহ বন্ধ হবে সবাই তার কাছে আসবে পানি চাইতে। সে দিন সত্যি আসে। নয়নতারা ও মুকু এক ধরনের উন্নাসিক আনন্দ পায়। কিন্তু দিন শেষে বস্তিবাসী পানির জন্য চড়াও হয় বাড়িওয়ালির ওপর। আমরা আগেই দেখেছি বাড়িওয়ালিই মূলত এখানে মুখ্য চরিত্র, বাড়িওয়ালা ফারুক আহমেদ মাতাল। বস্তিবাসী পয়সা দিয়ে ওয়াসার পানি আনার দাবি জানায়। কিন্তু বাড়িওয়ালা কৌশলে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে ও ভাড়াটিয়াদের আসন্ন বিক্ষোভ থেকে বাঁচতে ঘোষণা দেয়, নয়নতারা ও মুকুর সংসারে ধরে রাখা পানিতে সবার অধিকার আছে।

বস্তিবাসীকে সাথে নিয়ে নয়নতারার ঘরের দরজা ভেঙে যে যার মতো পানি নিতে থাকে। নয়নতারা ও মুকু প্রথমে বাধা দিলেও আস্তে আস্তে তারা বিষয়টি উপভোগ করতে থাকে। পাঠক একবার চিন্তা করুন, এক ফোঁটা পানির জন্য নয়নতারা রক্তাক্ত হয়ে রাস্তায় পড়েছিল, কেউ তাকে একগ্লাস পানি দেয়নি, দিন শেষে সে অনেক পানি অনেক পরিশ্রমে জমা করল আর তখন মানুষ লুট করে নিয়ে যেতে লাগল। বিষয়টি ভয়ংকর কিন্তু মানবিক চোখে যখন নয়নতারা ও মুকু তাকাল তখন সুন্দর হয়ে উঠল এ ভয়ংকর দৃশ্যও।

Advertisements