জাতীয়

বেড়েই চলেছে চালের দাম, নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ বিপাকে

চালের সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার চালের আমদানি শুল্ক দু’দফায় কমালেও বাজারে কিছুতেই কমছে না চালের দাম। বরং ধানের জেলা দিনাজপুরে প্রতিদিন চালের দাম বেড়েই চলেছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে দিনাজপুরের খুচরা বাজারে কেজি প্রতি চালের দাম বেড়েছে ৬ থেকে ৮ টাকা। এই পরিস্থিতিতে শুল্ক কমানোর সুফল মিলছে না ভোক্তা পর্যায়ে। ফলে খেটে খাওয়া মানুষদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে। এদিকে বাংলাদেশ সরকার আমদানি শুল্ক কমানোর সাথে ভারত শুরু করেছে চালের এলসি মূল্য বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা।

দিনাজপুরের হিলি স্থল বন্দরের কাস্টম সূত্রে জানা গেছে, দেশে চালের সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার গত ২০ জুন চালের আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করে। এরপর গত ১৭ আগস্ট ১০ শতাংশ থেকে আবারও কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণ করে। এতে এই স্থল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি হয়।

হিলি স্থল বন্দরের বেসরকারি অপারেটর পানামা পোর্ট লিংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপক অসিত কুমার সান্যাল জানান, হিলি স্থল বন্দর দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ভারত থেকে ১০০টি করে চাল বোঝাই ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তাতে এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টন চাল ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছে।

হিলি স্থল বন্দরের কাস্টমস সুপারিন্টেনডেন্ট মো. ফখর উদ্দিন জানান, এই বন্দরের মাধ্যমে ভারত থেকে আমদানি করা চালের গতি স্বাভাবিক রয়েছে। বরং ঈদের পর থেকে বেশি চাল আমদানি হচ্ছে। বন্দরে চাল বোঝাই ট্রাক আসার সাথে সাথে খালাস কার্যক্রমও সম্পন্ন করা হচ্ছে। যাতে ব্যবসায়ীরা দ্রুত চাল খালাস করে তাদের গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারেন।

কিন্তু হিলি স্থল বন্দরের আমদানিকারকরা জানান, বাংলাদেশ চালের আমদানি শুল্ক কমানোর সাথে ভারত পাল্লা দিয়ে বাড়াতে শুরু করেছে চালের এলসি মূল্য। ভারত প্রথম অবস্থায় প্রতিটন চালের এলসি মূল্য ৩৮০ ডলার নির্ধারণ করলেও তা বাড়িয়ে বর্তমানে ৫৪০ ডলার নির্ধারণ করেছে।

এদিকে আমদানিকারকরা জানান, চাল আমদানিতে শুল্ক কমের সুবিধা ভারতের ব্যবসায়ীরা নিচ্ছেন। দুই দফায় তারা প্রতি মেট্রিকটনে ১৩০ থেকে ১৫০ ডলার বৃদ্ধি করেছেন। এই পরিস্থিতিতে শুল্ক কমানোর সুফল মিলছে না ভোক্তা পর্যায়ে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে।

হিলি স্থল বন্দরের ব্যবসায়ী মোস্তাক মাষ্টার জানান, দেশে চালের দামের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে সরকার আশা করেছিল চাল আমদানির উপর থেকে শুল্ক কমানো হলে চালের দাম ৩৫ টাকার নিচে নেমে আসবে। কিন্তু এর চিত্র দেখা গেল উল্টো। গত ২০ জুন চালের আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে নামিয়ে ১০ শতাংশ করা হলে ভারতের ব্যবসায়ীরা চালের এলসি মূল্য ৩৮০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৪৩০ ডলার নির্ধারণ করে। দ্বিতীয় দফায় সরকার ১৭ আগস্ট আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ করলে ভারতের ব্যবসায়ীরা আবারও চালের এলসি মূল্য বাড়িয়ে ৫৪০ ডলারে উন্নীত করেছে। এর ফলে প্রতি কেজিতে আমদানি খরচ হচ্ছে প্রায় ৪৪ টাকার মতো।

ব্যবসায়ী মোস্তাক মাষ্টার জানান, সাম্প্রতিক বন্যায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার প্রভাব পড়ে চালের দামের উপর। এ কারণে আমাদের দেশে এবং ভারতে চালের মজুদ সংকট সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় আমরা ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে চাহিদা অনুযায়ী চাল আমদানি করতে পারছি না। যখনই ভারতের ব্যবসায়ীদের চাল দেওয়ার কথা বলছি, তারা সাফ জানিয়ে দিচ্ছে মিলে ধান পাচ্ছি না। চালও হচ্ছে না। আবার দুই-এক জায়গায় চাল পেলেও গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত দাম। বুধবার প্রতি মেট্রিক টন চাল ৫৪০ ডলারে কিনতে হয়েছে। এতে কেজি প্রতি খরচ হচ্ছে প্রায় ৪৪ টাকার মতো।

আরেক ব্যবসায়ী দুদু মিয়া জানান, চাল কিনতে ভারতের গঙ্গারামপুর, বুনিয়াদপুর, মালদা ও বর্ধমানের মিলগুলোতে এবং মোকামে গিয়েও চাহিদা মতো চাল মিলছে না। সেখানেও এক প্রকার চালের জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী সপ্তাহের মধ্যে ৫০ টাকা কেজি দামে চাল আমদানি করতে হবে ব্যবসায়ীদের।

এদিকে দিনাজপুরে চালের বাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে চালের দাম। দিনাজপুরে সবচেয়ে বড় চালের বাজার বাহাদুরবাজারে বুধবার খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজি প্রতি চালের দাম বেড়েছে ৬ থেকে ৮ টাকা।
এক সপ্তাহ আগে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হতো ৫২ টাকা দরে। এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৮ টাকা কেজি দরে। এছাড়াও বিআর-২৮ চাল প্রতিকেজি ৪৮ টাকার স্থলে ৫৫ টাকা, স্বর্ণা ৪২ টাকার স্থলে ৪৭ টাকা, হাইব্রিড মোটা ৩৭ টাকার স্থলে ৪৪ টাকা, বিআর ২৯ চাল প্রতিকেজি ৪৬ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫২ টাকায়।

চাল বিক্রেতা লিয়াকত আলী জানান, মিল মালিক ও আমদানিকারকরা চালের দাম বৃদ্ধি করায় তাদের বেশী দামেই চাল বিক্রি করতে হচ্ছে। আর প্রতিদিন চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের সাথে তাদের প্রায়ই কথা-কাটাকাটি হচ্ছে।

চালের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ।