মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

বিষাক্ত গরু ও স্বাস্থ্যঝুঁকি-ডা. সজল আশফাক

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে আমাদের দেশের খামারিরা গরু মোটাতাজাকরণের পরিকল্পনা নেয়। যদিও গরু মোটাতাজাকরণের জন্য স্বীকৃত স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি রয়েছে কিন্তু গরুকে দ্রুত মোটা ওজনদার করার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই খামারিরা অনৈতিকভাবে স্টেরয়েডসহ বেশ কিছু হরমোন প্রয়োগ করে থাকেন। তাদের কাছে বেশি ওজন মানেই বেশি মাংস; বেশি মাংস মানেই বেশি লাভ। গবেষকরা বলছেন, হরমোন প্রয়োগে মোটাতাজা করা এসব পশুর মাংস খেলে মানুষের ব্রেস্ট, কোলন, প্রোস্টেট এবং ফুসফুসের ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গরু মোটাতাজাকরণ একটি নিয়মিত ও প্রচলিত পদ্ধতি।

এই পদ্ধতিতে বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত দুই থেকে আড়াই কেজি ইউরিয়া, লালিগুড় ও খড়ের একটি বিশেষ ধরনের মিকচার খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়ে থাকে সরকারের প্রাণিসম্পদ বিভাগ। টানা ৮ দিন কোনো পাত্রে এই মিকচার মুখবন্ধ অবস্থায় রাখার পর, তা রোদে শুকিয়ে গরুকে খাওয়াতে হয়। টানা ৬ মাস এটা খাওয়ালে গরু খুব দ্রুত মোটাতাজা হয়ে ওঠে। কিন্তু আরও দ্রুত এবং আরও বেশি মোটাতাজা করার আশায় খামারিরা প্রয়োগ করে থাকে স্টেরয়েডসহ আরও কিছু হরমোন এবং মাত্রাতিরিক্ত ইউরিয়া।

বাড়তি ইউরিয়ায় গরুর বিষক্রিয়া:

কোরবানিতে দ্রুত মোটাতাজা করণের উদ্দেশে গরুগুলোকে খেতে দেয় অতিরিক্ত ইউরিয়া। কোনো গরুকে কয়েক মাস ধরে ইউরিয়া খাওয়ালে গরু দ্রুত দানব আকৃতি ধারণ করে। কিন্তু ইতিমধ্যে গরুর শরীরের ভিতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিডনি, লিভার, ব্রেইন নষ্ট হয়ে গরুর মৃত্যুকে অনিবার্য করে তোলে। অতিরিক্ত ইউরিয়া বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ফলে এগুলো প্রাকৃতিকভাবে বেঁচে থাকার শক্তি হারিয়ে ফেলে। অনেক সময় হাটেই এসব গরু মারা যায়। এ ধরনের গরুকে বিষাক্ত গরু বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ইউরিয়া বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত গরুর মাংস খেলে মানুষও ইউরিয়া বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। যার ফলে কিডনি বিকল হওয়ার মতো ঝুঁকিও থাকে।

গরুকে হরমোন ইনজেকশনের ইতিহাস : গরুকে মোটাতাজাকরণের ইতিহাস খুঁজলে অনেক আগে থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কৃত্রিমভাবে তৈরি হরমোন প্রয়োগ করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গরুর মাংসপেশিতে হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয় কিংবা কানের চামড়ার নিচে পুঁতে দেওয়া হয়। কানের চামড়ার নিচে পুঁতে দেওয়া এই হরমোন ধীরে ধীরে একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় শরীরে প্রবেশ করে থাকে। কৃত্রিমভাবে তৈরি ইস্ট্রোজেন এবং টেস্টোস্টেরন ইনজেকশনই একসময় বেশি প্রয়োগ করা হতো। ৭০ দশকের দিকে এই হরমোনে একটি উপাদান ডাই ইথাইলস্টিলবেস্টেরলের সঙ্গে যোনীপথের ক্যান্সার সৃষ্টির যোগসূত্র ধরা পড়লে তা নিষিদ্ধ করা হয়। এদিকে ইস্ট্রোজেনের সঙ্গে স্তন ক্যান্সারের সম্পর্ক থাকার বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পর এই হরমোনটির প্রয়োগও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। বর্তমানে ব্যবহৃত হরমোন এবং ঝুঁকি নিয়ে বিতর্কের ঝড় আরও বেশি নিরাপদ হরমোন খুঁজতে গিয়ে তৈরি হয় বোভাইন সোমাটোট্রপিন (বিএসটি) অথবা রিকম্বিনেন্ট বোভাইন গ্রোথ হরমোন (আরবিজিএইচ)। ১৯৯৩ সালে আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) গরুর দুধ ও গরুর দৈহিক বৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য কৃত্রিমভাবে তৈরি এই হরমোনের প্রয়োগকে অনুমোদন দিলেও ইরোপিয়ান ইউনিয়ন, কানাডাসহ বেশ কিছু দেশ তা অনুমোদন দেয়নি। কিছু কিছু গবেষণায় দেখা গেছে হরমোন ব্যবহার গরুর জন্যই ক্ষতিকর। এসব হরমোন ব্যবহারে গরুর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ইনফেকশনের প্রবণতা বেড়ে যায়। ফলে গরুকে বিভিন্ন ধরনের এন্টিবায়োটিক দিতে হয়। এন্টিবায়োটিকের উচ্ছিষ্ট অংশ গরুর মাংসেও বিদ্যমান থাকে। এই ধরনের গরুর মাংস খাওয়ার কারণে উচ্ছিষ্ট এন্টিবায়োটিক প্রভাবে মানুষের শরীর উক্ত এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনকারী (রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া) জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়ে, যা ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। আমাদের দেশে হরমোনের চূড়ান্ত অপব্যবহার : আমাদের দেশে গরু মোটাতাজা করার বিজ্ঞানসম্মত ফর্মুলাকে উপেক্ষা করে কিছু অসাধু খামারি বেশি মুনাফার লোভে গরুর শরীরে ২৫ থেকে ৩০ আউন্স উচ্চমাত্রার স্টেরয়েড ইনজেকশন দিয়ে থাকে। ওরাডেকসন ও ডেকাসনের মতো স্টেরয়েড দিলে ২-৩ মাসের মধ্যেই গরুগুলো বিশাল আকৃতি ধারণ করে। গরুর শরীরে পানি জমতে থাকে। গরু ফুলেফেঁপে বিশাল আকৃতির দানবে পরিণত হয়। প্রাণীবিদরা বলছেন, এ ধরনের গরু দেখলেই চেনা যায়। প্রাকৃতিকভাবে শক্তি সামর্থ্যের কোনো গরু যেমন তেজি ও গোয়ার প্রকৃতির হয়, এই গরুগুলো ঠিক উল্টোভাব, ধীর ও শান্ত প্রকৃতির হয়ে থাকে। শরীরে ও আচরণে কোনো তেজি ভাবই লক্ষ্য করা যায় না। এসব হরমোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের দেশেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, রয়েছে শাস্তির বিধানও। তা সত্ত্বেও প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না গরুর ক্ষেত্রে হরমোনের চূড়ান্ত অপব্যবহার। তাই হতে হবে সতর্ক। বিশাল আকৃতির অস্বাভাবিক মোটা গরুর প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে স্বাভাবিক আকৃতি ও গঠনের গরুকেই কোরবানির জন্য বেছে নেওয়া উচিত হবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, হলি ফ্যামিলি

রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।

– See more at: http://www.bd-pratidin.com/2014/09/27/33291#sthash.1Fg6Yhh5.dpuf

Add Comment

Click here to post a comment