মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার মান-ড. সহিদুজ্জামান

%e0%a6%a1-%e0%a6%b8%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়া প্রায় একই রকম। সাধারণত মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। সম্প্রতি সরকার তার গোপনীয় প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগে দুটি সুপারিশ করেছে। একটি হলো নিয়োগপূর্ব পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক প্রার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য ভেরিফিকেশন ও অন্যটি লিখিত পরীক্ষা।  সরকার দেশের প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য চাকরির মতোই হয়তো বা চাকরি-উত্তর পুলিশ ভেরিফিকেশন ও মেধা যাচাইয়ের জন্য লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার কথা ভাবছে। কিন্তু দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রভাষক (লেকচারার) পদে বেশি নিয়োগ করা হয়। এ ছাড়া সহকারী, সহযোগী ও প্রফেসর পদেও সরাসরি নিয়োগ হয়ে থাকে। লেকচারার পদে আবেদনের যোগ্যতা হিসেবে অনার্স ও মাস্টার্সসহ চারটি অথবা তিনটিতে প্রথম শ্রেণি বা ৪ স্কেলে জিপিএ ৩.৫-এর ওপরে চাওয়া হয়। আবার কখনো কখনো অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসেবে পাসকৃত ছাত্রছাত্রীদের নির্দিষ্টসংখ্যক আবেদন করতে পারবে বলে সীমারেখা বেঁধে দেওয়া হয়। যেমন—বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে মেধা তালিকায় ৭ শতাংশের মধ্যে থাকা শিক্ষার্থীরাই শুধু আবেদন করতে পারে।  মোটকথা সর্বোচ্চ মেধাবীদের লক্ষ করে যোগ্যতা নিরূপণ করা হয়। এতে একটি প্রভাষক পদের বিপরীতে অল্পসংখ্যক প্রার্থীকে আবেদন করতে দেখা যায়। বাস্তবিক পক্ষে প্রথমত, এটি অন্যান্য চাকরির মতো কোনো চাকরি নয় এবং বিভাগগুলোয় সীমিত পদ থাকায় সব সময় নিয়োগ হয় না। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক (প্রভাষক) নিয়োগে মেধা হিসেবে একাডেমিক রেজাল্টকে প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থীর একাডেমিক জ্ঞান, সনদপত্র ও প্রার্থী শিক্ষাদানের উপযোগী কি না তা যাচাই-বাছাই করে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করে সিন্ডিকেটের অনুমোদন সাপেক্ষে দুই বছরের জন্য সাময়িক নিয়োগ প্রদান করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় চাকরির কোনো ক্ষেত্র নয়; এটি  শিক্ষা ও গবেষণার জায়গা। কিন্তু বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমানে চাকরির বিশাল ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ। কিন্তু বাড়ছে না শিক্ষার গুণগত মান এবং তৈরি হচ্ছে না দক্ষ ও যুগোপযোগী গ্র্যাজুয়েট। গবেষণা প্রকল্পের মাধ্যমে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ফলাফল। সব মিলিয়ে দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা তথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা লেজে-গোবরে। এ অবস্থায় সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগে গোপনীয় প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যেসব সুপারিশ করেছে, তা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের নতুন করে ভাবনার বহিঃপ্রকাশ এবং অবশ্যই প্রশংসনীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে আবেদনকৃত একজন প্রার্থী রাষ্ট্রদ্রোহী কি না সে জন্য প্রার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের অবশ্যই প্রয়োজন আছে, তবে তা যেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা হয়রানিমূলক না হয়। প্রার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি যৌক্তিক হলেও একজন শিক্ষক বিশেষ করে প্রফেসর নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি অপমানজনক ও হাস্যকর হবে বলে আমার বিশ্বাস। উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা পদ্ধতি বিশ্বের কোথাও নেই। সরকার দেশের উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে যখন তত্পর, তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে আসা উচিত। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়নে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যৌথ আলোচনার মাধ্যমে সুচিন্তিত ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শিক্ষক নিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মেধাবী ও আদর্শবান শিক্ষক নিয়োগ না হলে গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক নিয়োগে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর পত্রপত্রিকায় পাওয়া যায়। যদিও বিষয়গুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক, আর্থিক ও ব্যক্তিস্বার্থ জড়িত, তবে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনার মাধ্যমে বিষয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। যা হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় মেধাবী শিক্ষক নিয়োগের বিকল্প নেই। দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীদের এ পেশায় আগ্রহ বেশি দেখা যায়। তবে অনেক সময় বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীরা বঞ্চিত হন তাদের পছন্দের এই পেশায় আসতে। অনেকে অন্য কোনো চাকরিতে মনোনিবেশ করতে না পেরে হতাশা নিয়ে পাড়ি দেন উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে। সেখানে তারা মূল্যায়ন ও উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে মেধা ও মননশীলতা দিয়ে কাজ করে অবদান রাখছেন অন্যের দেশে। পক্ষান্তরে মেধাবী এসব বাংলাদেশির সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ ও জাতি।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সর্বশেষ যোগ্যতা হিসেবে মাস্টার্স পাসকৃত শিক্ষার্থীদের প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা বিশ্বের কোথাও নেই। এ ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থী সদ্য পাস করে কোনো একাডেমিক ও গবেষণার প্রশিক্ষণ ছাড়াই সরাসরি পাঠদান শুরু করে। অনেক সময় সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত প্রভাষককে মাস্টার্সের ক্লাস নিতেও দেখা যায়। এ ছাড়া একজন প্রভাষক যোগদান করার পরপরই তার উচ্চশিক্ষার জন্য খুঁজতে থাকেন ভালো একটি স্কলারশিপ। সুযোগ পেলেই চলে যান মাস্টার্স, পিএইচডি করার জন্য, তারপর পোস্ট-ডক্টরেট। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়মানুসারে শিক্ষাছুটি নিয়ে বিদেশে কাটিয়ে দেন ছয়-সাত বছর। এরপর ভালো সুযোগ পেলে দেশে বা বিদেশে বিভিন্ন ধরনের চুক্তিভিত্তিক চাকরির নিমিত্তে পাঁচ বছর বা ততোধিক সময়ের জন্য লিয়েন/প্রেষণে ছুটি কাটাতে থাকেন। এভাবে দেখা যায় অনেক শিক্ষক তাঁর শিক্ষকতা জীবনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় নিজ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম থেকে বিরত থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের উন্নত বিশ্বে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় জ্ঞানার্জনের প্রয়োজন আছে। কর্মক্ষেত্রে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণা বিস্তারের প্রয়োজনহেতু কনসালট্যান্সি ও বিভিন্ন চুক্তিভিত্তিক কাজের সুযোগ অন্যান্য দেশেও রয়েছে। তবে সেটি নিজ প্রতিষ্ঠানের চাহিদা মিটিয়ে করতে হবে। প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রার্থীকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রিধারী হতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বা মানসম্পন্ন জার্নালে প্রকাশনা থাকতে হবে। উন্নত দেশ থেকে অর্জিত পিএইচডি ও বিষয়ভিত্তিক গবেষণার অভিজ্ঞতা দিয়ে দেশে বিভাগীয় শিক্ষা ও গবেষণাকাজে অবদান রাখতে পারবেন এ রকম প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।  এর ফলে একদিকে যেমন একজন যোগ্য শিক্ষক পাওয়া যাবে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় তার সদ্য নিয়োগকৃত সহকর্মীর দ্বারা মানসম্পন্ন সেবা পাবে। ভারত, পাকিস্তান ও চীনের মতো বিদেশে অবস্থান করা অনেক মেধাবী গবেষককে সুযোগদানের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে এনে তাদের মেধা কাজে লাগিয়ে দেশকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে পিএইচডিসহ একজন প্রভাষকের পদটি অবশ্যই আপগ্রেড করতে হবে। সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়নে স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে সর্বোচ্চ মেধাবীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দান, মেধাবীদের এ পেশায় আকর্ষণ ও ধরে রাখার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে না।

 লেখক : অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ



আজকের জনপ্রিয় খবরঃ

গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ:

  1. বুখারী শরীফ Android App: Download করে প্রতিদিন ২টি হাদিস পড়ুন।
  2. পুলিশ ও RAB এর ফোন নম্বর অ্যাপটি ডাউনলোড করে আপনার ফোনে সংগ্রহ করে রাখুন।
  3. প্রতিদিন আজকের দিনের ইতিহাস পড়ুন Android App থেকে। Download করুন

Add Comment

Click here to post a comment