বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

বিলুপ্তির ঝুঁকিতে কাঁকড়া

1জীববৈচিত্র‌্য রক্ষায় কাঁকড়ার ভূমিকা ব্যাপক। বর্তমানে দেশের অন্যতম অর্থকরী সম্পদও এটি। কাঁকড়া রফতানি করে বছরে গড়ে ৪০০ কোটি টাকা আয় হয়। কিন্তু জলচর এই প্রাণীটি আজ মানবসৃষ্ট কারণে ধ্বংসের পথে।

পরিসংখ্যান মতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে হিমায়িত খাদ্য ও মৎস্য রফতানিতে আয় হয়েছে ৫৩ কোটি ৫৭ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার। এর মধ্যে শুধু চিংড়ি এবং কাঁকড়া রফতানিতে আয় হয়েছে ৪৭ কোটি ২৩ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার। অন্যদিকে ২০১০-১১ অর্থবছরে কেবল কাঁকড়া রফতানি করে ৩৭৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা আয় করেছে বাংলাদেশ।

গত বছর দেশে সাত হাজার ৭০৭ দশমিক ৭০ টন কাঁকড়া উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে ছয় হাজার ৩৪৭ দশমিক ৭০ টন কাঁকড়া রফতানি করা হয়েছে চীন, জাপান, কোরিয়া ও তাইওয়ান। বিশ্ববাজারে চিংড়ির পাশাপাশি কাঁকড়ার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে কাঁকড়ার চাষ হচ্ছে, যা থেকে আসছে বিশাল অংকের এই বৈদেশিক মুদ্রা। কাঁকড়ার তেমন কোনো রোগবালাই নেই। এছাড়া কাঁকড়া চাষে ব্যয়ও কম।

প্রাকৃতিকভাবে রেনু কাঁকড়া দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে ১৮০ গ্রাম ওজন হয়। যার স্থানীয় বাজারমূল্য প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হলেও কাঁকড়ার এই প্রজনন মৌসুমে ধরা হচ্ছে হাজার হাজার মন মা কাঁকড়া। এভাবে প্রজননকালীন কাঁকড়া শিকার চলতে থাকলে চিংড়ির চেয়েও উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় এ রফতানি খাত অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

কাঁকড়ার প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র হলো ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল অর্থাৎ বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূল। এ পর্যন্ত দেশে ১২ প্রজাতির কাঁকড়া সনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে স্কাইলা সিরাটা, অলিভিসিয়া, প্যারামসিন, ট্রাঙ্কুবুরকিয়া এ চার প্রজাতির কাঁকড়া বাংলাদেশে সর্বাধিক পাওয়া যায়।

এসব কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুম জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত। প্রজনন মৌসুমকালীন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের লোনা পানিতে এরা ডিম ছাড়ে। আর মাঘ মাসের প্রথম অমাবস্যায় সবচেয়ে বেশি ডিম দিয়ে থাকে স্ত্রী কাঁকড়া। প্রতিটি পূর্ণ বয়সের স্ত্রী কাঁকড়া প্রতি বছর পরিবেশের ওপর নির্ভর করে ৮০ হাজার থেকে ১০ লাখ ডিম দেয়।

কিন্তু অভয়াশ্রম না থাকা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জীববৈচিত্র্যের পরিবেশ বিপন্ন হওয়ায় ১০ শতাংশ ডিম পূর্ণাঙ্গ গ্রেডে পরিণত হয়। ডিম থেকে রেনু কাঁকড়া ১৮০ গ্রাম ওজনের পূর্ণ গ্রেডে (এফ-১) পৌঁছাতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে। তবে বিশেষজ্ঞদের দাবি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইলিশের মতো কাঁকড়ারও প্রজননকালীন সময় পরিবর্তন হয়েছে।

জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সিংগাপুর, থাইল্যান্ড, হংকং, চীনসহ বিভিন্ন দেশে নানা ধরনের উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এসব উৎসবের খাদ্য তালিকায় ডিমওয়ালা কাঁকড়ার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে ডিমওয়ালা কাঁকড়ার চাহিদা ও দাম সবচেয়ে বেশি। আর তাই বেশি দামের আশায় এক শ্রেণীর অসৎ ব্যবসায়ী নির্বিচারে মা কাঁকড়া শিকার করছে।

কারেন্ট, বেহুন্দিসহ ছোট ফাঁসের জাল দিয়ে মাছ শিকারের সময় রেনু কাঁকড়া ধরা পড়ায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবসহ নানা কারণে উপকূলের জীববৈচিত্রের স্বাভাবিক পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে। এসব কারণে দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে কাঁকড়া। তাই প্রজননকালীন কাঁকড়া শিকার বন্ধ ও অভয়াশ্রম গড়ে তোলার দাবি সংশ্লিষ্টদের।

অবশ্য যথাযথ প্রচারের অভাবে কাঁকড়া চাষ এখনও জনপ্রিয়তা পায়নি। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, পরামর্শদান ও আর্থিক সহায়তার সঠিক প্রয়োগের অভাবে খুব কম জায়গায়ই কাঁকড়ার চাষ হচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, ঋণ ব্যবস্থা এবং বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে কাঁকড়া চাষ করলে চাষি ও দেশ উপকৃত হবে। বাড়বে আমাদের রফতানি আয়।

এদিকে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণ জানান, সমুদ্র সৈকতে লাল কাঁকড়া রক্ষা করতে যত্রতত্র বিচ বাইক ও ঘোড়া, কিটকট চেয়ার ও ছাতাসহ সব ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ যান চলাচল এবং সমুদ্রে নেট দিয়ে মাছের পোনা ধরা বন্ধে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি এসব প্রাণী যেমন লাল কাঁকড়া, কাছিমদের অবাধ বিচরণের জন্য চারণভূমি চিহ্নিত করে তাদেরকে চলাচলের সুযোগ দিতে হবে। যেখানে কাঁকড়ারা নির্বিঘ্নে ঘোরাফেরার পাশাপাশি বংশবৃদ্ধি করার সুযোগ পাবে।

ভিডিওঃ নেহার যে ভিডিও নিয়ে সমালোচনার ঝড়

Add Comment

Click here to post a comment