মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা-এ এম এম শওকত আলী

এ এম এম শওকত আলীগত মাসে প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা এখনো অর্জন করা সম্ভব হয়নি মর্মে প্রকাশ্য বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি হলো—১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানের একটি ধারা অবিকল পুনঃস্থাপন না করলে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে এক পাল্টা বক্তব্যে আইনমন্ত্রী দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। অতীতে এ ধরনের বিতর্কের মূল বিষয়বস্তু ছিল বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক না করলে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। একজন জেলা পর্যায়ের জজের বেতন নির্ধারণসংক্রান্ত মামলায় ২০০০ সালের আগে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্ট দিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ ৯ বছর পর পৃথক্করণের রায় বাস্তবায়িত হয়। এর আওতায় আগে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে নির্বাহী বিভাগের ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারক্ষমতা রদ করা হয়। এসব ম্যাজিস্ট্রেটের বদলে বিচার বিভাগে নিযুক্ত অধস্তন আদালতের বিচারকরা ম্যাজিস্ট্রেটের যাবতীয় বিচারকার্য পরিচালনার কাজ শুরু করেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ওই সময় সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনাও ছিল। যেমন—এক. জেলা পর্যায়ের বিচারকদের নিয়ে একটি পৃথক জুডিশিয়াল সার্ভিস হবে, যা সুপ্রিম কোর্টের অধীনে থাকবে। দুই. এদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও শৃঙ্খলাবিষয়ক সিদ্ধান্তও সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ারভুক্ত। তিন. এর জন্য পৃথক জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন ও পৃথক জুডিশিয়াল ট্রেনিং একাডেমিও রয়েছে। এদের বেতনক্রমও নির্বাহী বিভাগের ক্যাডারভুক্ত হবে না। বিচার বিভাগীয় সার্ভিসে প্রাথমিক নিয়োগ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের সুপারিশেই রাষ্ট্রপতি সম্মতি প্রদান করেন। কিন্তু এর মধ্যবর্তী অবস্থানে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ও রয়েছে। প্রাথমিক নিয়োগের নথি সুপ্রিম কোর্ট থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার জন্য এ মন্ত্রণালয়ই সরকারি কার্যবিধিমালা (Rules of Business) অনুযায়ী ক্ষমতাবান। বদলি ও শৃঙ্খলার বিষয়ে একই পদ্ধতি এখনো অনুসরণ করা হচ্ছে। এর ভিত্তি হলো ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে মূলধারার পরিবর্তে অন্য দুটি ধারার সংশোধনীর আদেশ।

১৯৭২ সালে প্রণীত মূল সংবিধানের ব্যাপকভাবে সংশোধন করে ১৯৭৫ সালের দুই নম্বর আইন প্রণয়ন করা হয়। এর ফলে দেশে বাকশাল নামে একদলীয় শাসনপ্রথা প্রবর্তন করা হয়। তখনকার সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিষয়ে অনেক কিছু পরিবর্তন করা হয়। বর্তমান বিতর্কের অন্যতম উৎস এখানেই। বাকশাল আইনের ১৮ নম্বর ধারায় বলা ছিল, ‘সংবিধানের ১১৫ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপন : সংবিধানের ১১৫ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে নিম্নরূপ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপিত হইবে।’ ‘১১৫ : অধস্তন আদালতে নিয়োগ বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনকারী ম্যাজিস্ট্রেট পদে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ঐ উদ্দেশ্যে প্রণীত বিধিসমূহ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করিবেন।’ উল্লেখ্য, উপরোক্ত ১৯ ধারাবলে ‘সুপ্রিম কোর্টের’ পরিবর্তে ‘রাষ্ট্রপতি’ শব্দটি প্রতিস্থাপিত। একই আইনে ১৯৭৮ সালে সামরিক শাসনামলের সময় সংবিধান সংশোধন করা হয়। সংশোধিত ১১৫ অনুচ্ছেদ ও সংশোধিত ১১৬ অনুচ্ছেদ হলো “বিচার কর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনের ও ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি প্রদান, ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলা বিধান ‘রাষ্ট্রপতি’র ওপর ন্যস্ত থাকিবে এবং সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে।” এর পাদটীকায় জানা যায় যে আগের অর্থাৎ ১৯৭২ সংবিধানে ‘সুপ্রিম কোর্ট’ শব্দগুলোর পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শব্দটি প্রতিস্থাপিত হয়। প্রধান বিচারপতি এসব অনুচ্ছেদের পরিবর্তে ১৯৭২ সালের মূল অনুচ্ছেদ আবার প্রতিস্থাপন করতে ইচ্ছুক। তাঁর ধারণা, এটা না করা হলে অপেক্ষমাণ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হবে না। বিদ্যমান প্রথাকে তিনি বিচার বিভাগের জন্য ‘দ্বৈত শাসন’ বলে অভিহিত করেছেন। অসংশোধিত ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনর্বহালের দাবি প্রথমে রাজনৈতিক দাবি ছিল। বর্তমানে এ দাবি বিচার বিভাগের বা প্রধান বিচারপতির। তবে এ দুই মহলের দাবির মধ্যে পার্থক্য এই যে প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগ সম্পর্কিত একটি ধারার বদলে ১৯৭২ সালের ধারা প্রতিস্থাপনের কথা বলছেন, যেখানে ‘রাষ্ট্রপতি’ শব্দটির বদলে ‘প্রধান বিচারপতি’ শব্দটি ছিল। আইনমন্ত্রী বলেছেন যে এ ধারা হাইকোর্টের রায় বলে বিলুপ্ত বলে গণ্য।

হাইকোর্টের কোন সালের রায়ে কথিত অনুচ্ছেদ বাতিল করা হয়েছিল তা অবশ্য জানা যায়নি। সাধারণভাবে যা জানা আছে, ২০০৯ সালের পর উচ্চ আদালতের এক মামলার রায়ে সামরিক শাসনামলের সব সংবিধান সংশোধনী আদেশ বাতিল করা হয়। এ ক্ষেত্রেই কিছু অস্পষ্টতা বা সঠিক তথ্যের বিষয়ে অনেকেরই জানা নেই। কারণ ১৫তম সংবিধান সংশোধনী আদেশটি সামরিক শাসনের সময় দুই নম্বর ফরমান বলে জারি করা হয়। দুই নম্বর আইনে সংশোধনীর মধ্যে ছিল ‘কর্মরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতিসহ ছুটি মঞ্জুরি ও শৃঙ্খলাবিধান [রাষ্ট্রপতির] ওপর ন্যস্ত থাকিবে।’ সামরিক ফরমানবলে যা সংযোজন করা হয় তা হলো, ‘এবং সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে।’ অর্থাৎ হাইকোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত রায়ে সামরিক শাসনামলের সব সংশোধনী আদেশ যদি বাতিল বলে গণ্য হবে, তাহলে শেষোক্ত সংশোধনী কার্যকর থাকার কথা নয়। এসব অস্পষ্টতা সম্পর্কে আরো বলা যায় যে ১৯৭৫ সালের দুই নম্বর আইনে অর্থাৎ বাকশাল আমলে সংবিধানে ১১৬ক অনুচ্ছেদ সংযোজিত হয়। এ অনুচ্ছেদ হলো [১১৬ক। এই সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিগণ এবং ম্যাজিস্ট্রেটগণ বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন] এ সংশোধনীকে অলংকারতুল্য সংশোধন বলা যায়। কারণ, যেখানে নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির এবং যা প্রকৃতপক্ষে আইন মন্ত্রণালয় করে থাকে তার মাধ্যমে স্বাধীনভাবে বিচার করা খুবই কঠিন। ওই সময় অবশ্য বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা হয়নি। এ কারণেও এ ধরনের সংশোধন অনেকটা সান্ত্বনা দেওয়ার মতো। বাকশাল কাঠামো সামরিক শাসনামলেই বাতিল করা হয় কিন্তু সংবিধানের সংশোধনীর ক্ষেত্রে কী করা হয়েছে, তা অনেকাংশে অস্পষ্ট।

৪ নভেম্বর হাইকোর্টের যে মামলার রায় নির্বাহী বিভাগ থেকে উত্থাপিত হয়েছে সে সম্পর্কে কিছু ধারণা এক দৈনিকে প্রকাশিত বক্তব্যে পাওয়া যায়। বক্তব্য দিয়েছেন বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের এক সাবেক আইনমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, এ রায়ের বিরুদ্ধে সরকার এখনো আপিল করেনি বিধায় এ যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ আপিলে ভিন্নরূপ রায় বা নির্দেশনা না হওয়া পর্যন্ত ওই রায় কার্যকর হবে। একাধিক আইনজীবীর প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায়, বিচার বিভাগ ১৯৯৯ সালের রায়বলে পৃথক হয়েছে। কিন্তু অধস্তন আদালতের বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ এখনো উচ্চতম আদালতের নেই। ওই ব্যক্তিদের কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টকে এখনো নির্বাহী বিভাগের আইন মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করার বাধ্যবাধকতা রয়েই গেছে। এ নিয়েই বিচার বিভাগ এবং আইন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে টানাপড়েনের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে কিছু পরিসংখ্যানও মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয়। গত বছরের বদলির প্রস্তাবের সংখ্যা ছিল ১১৩৫ জন। এতে সুপ্রিম কোর্টের সম্মতি ছিল মোট ৫৪.৭১ শতাংশ। সম্মতি দেওয়া হয়নি ১৬.৯২ শতাংশ। বিকল্প প্রস্তাবের সংখ্যা মোট ২৮.৩৭ শতাংশ। বদলির ক্ষেত্রে নীতিমালা কী তা অবশ্য জানা যায়নি। অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, বিচার ও নির্বাহী বিভাগে কর্মরত ব্যক্তিদের সাধারণ নিয়মে তিন বছর পর বদলি করার রেওয়াজ রয়েছে। তবে উভয় বিভাগেই এর কিছু ব্যতিক্রম দেখা যায়। যেমন— পদোন্নতি বা শৃঙ্খলামূলক কারণে কিছুসংখ্যক ব্যক্তিকে তিন বছরের আগেও বদলি করা হয়। এতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে গত জুলাই-অক্টোবর মাসে অর্থাৎ চার মাসে মোট ১৫১ জন বিচারকের বদলির প্রস্তাবে ৩৭ জন ছিলেন কর্মস্থলে এক বছরের কম, ৩৯ জন এক থেকে আড়াই বছর এবং ৭৫ জন আড়াই থেকে পাঁচ বছর। এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত তথ্য মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয়। এতে মূল বক্তব্য ছিল নীতিমালা করা হয়েছিল কিন্তু কার্যকর করা হয়নি।

বিচারকদের বদলির সিদ্ধান্ত কার্যকর করা ছাড়াও শৃঙ্খলাবিধি গেজেটে প্রকাশ না করার কারণে সুপ্রিম কোর্ট অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানির বিষয়ে তা জানা যায়। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টি উদ্বেগের কারণ তা হলো, ১৯৯৯ সালের ৪ ডিসেম্বর বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক্করণ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট যে ১২ দফা নির্দেশনা দেন তার মধ্যে বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি প্রণয়নের কথা ছিল। এ নির্দেশনার পর গত বছর ৭ মে আইন মন্ত্রণালয় খসড়াবিধি সুপ্রিম কোর্টে প্রেরণ করে। বিধিমালা প্রণয়নে এত দীর্ঘ সময় কেন প্রয়োজন হলো তার কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ এখনো জানা যায়নি। পক্ষান্তরে এ কথাও বলা যায় যে সার্বিক নির্দেশনা পালনের বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট নিবিড়ভাবে পরিবীক্ষণে রাখেনি। এ সুযোগটাই আইন মন্ত্রণালয় কাজে লাগিয়েছে। পক্ষান্তরে এ কথাও বলা যায় যে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা মানা এবং তার বাস্তবায়ন সহযোগিতা করার বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের অনীহা রয়েছে।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা



আজকের জনপ্রিয় খবরঃ

গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ:

  1. বুখারী শরীফ Android App: Download করে প্রতিদিন ২টি হাদিস পড়ুন।
  2. পুলিশ ও RAB এর ফোন নম্বর অ্যাপটি ডাউনলোড করে আপনার ফোনে সংগ্রহ করে রাখুন।
  3. প্রতিদিন আজকের দিনের ইতিহাস পড়ুন Android App থেকে। Download করুন

Add Comment

Click here to post a comment