মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

ফিরে দেখা পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর-আবদুল মান্নান

%e0%a6%86%e0%a6%ac%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%a8মানব সভ্যতার ইতিহাসে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড কোনো নতুন ঘটনা নয়। প্রাচীন রোম, গ্রিস, ব্রিটেন, চীন বা আরব ভূমিতে একসময় এ ধরনের হত্যাকাণ্ড নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা ছিল। এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেছে আদর্শকে হত্যা করার জন্য ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে। গান্ধী, আনোয়ার সাদাত, সালভাদর আলেন্দে বা পেট্রিস লুবুম্বা হত্যাকাণ্ড তার অন্যতম উদাহরণ। আধুনিক বিশ্বে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি শক্তি ঘাতকদের সহায়তা করেছে। কঙ্গোর স্বাধীনতাসংগ্রামী নেতা ও প্রথম প্রেসিডেন্ট লুবুম্বা বা চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দেকে হত্যার জন্য দায়ী ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যার পেছনে দেশি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বহুদিন যাবৎ কাজ করেছে। এই ষড়যন্ত্রের জাল পাকিস্তানে বোনা হলেও তাতে প্রত্যক্ষভাবে মদদ দিয়েছে সেই সময়ের যুক্তরাষ্ট্র সরকার, সিআইএ ও বাংলাদেশে এক শ্রেণির অতি বাম ঘরানার রাজনৈতিক নেতারা। তাদের সমর্থন জুগিয়েছে রোমান্টিক বিপ্লবীদের দল জাসদ। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল সেনাবাহিনীর একটা অংশ, যাদের বেশির ভাগই ছিল পাকিস্তানফেরত। তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেনাবাহিনীর অংশকে সহজে বিভ্রান্ত করেছিল। আর এসব কাজে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল আওয়ামী লীগের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা বঙ্গবন্ধুর কাছের মানুষ বলে পরিচিত কিছু দলীয় নেতা। আর ছিল কিছু আমলা। ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত সবাই বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন ছিলেন। মোশতাককে বঙ্গবন্ধু তাঁর একজন কাছের মানুষ মনে করতেন। বঙ্গবন্ধুর একটি বড় দুর্বলতা ছিল তিনি মানুষকে সহজে বিশ্বাস করতেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তারা কেউই চায়নি পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হোক। জেনারেল জিয়ার জন্ম পাকিস্তানে। পড়ালেখা করেছেন করাচিতে। জিয়ার মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য মশিয়ুর রহমান যাদু মিয়ার বড় ভাই সিধু মিয়ার সাক্ষাৎকারভিত্তিক একটি প্রবন্ধ ঢাকা থেকে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক ‘প্রতিচিন্তা’য় (অক্টোবর-ডিসেম্বর, ২০১৪) ছাপা হয়। জিয়ার রাজনৈতিক উত্থানপর্ব সিধু মিয়া কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি বলেছেন, জিয়া বাংলা লিখতে বা পড়তে পারতেন না। শুধু নিজের নামটা স্বাক্ষর করতে পারতেন। জিয়ার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ছিল অনেকটা বাধ্য হয়ে, নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে নয়। একাত্তরের মার্চের ২৫-২৬ তারিখ রাত পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি নিধনের জন্য আনা অস্ত্র আর গোলাবারুদ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করা সোয়াত জাহাজ থেকে খালাস করার চেষ্টা করছিলেন। জিয়ার কোনো রাজনৈতিক আদর্শ ছিল না। অন্য দশজন পাকিস্তানি সেনা অফিসারের মতো তিনিও পাকিস্তানি সেনা সংস্কৃতিতে দীক্ষিত ছিলেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিজেদের সব সময় উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ মনে করত। জিয়াও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারী অন্য সেনা অফিসাররা মুক্তিযুদ্ধের অন্তিম পর্যায়ে পাকিস্তান বা অন্য দেশ থেকে নির্বিঘ্নে চলে এসে মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের প্রায় কেউই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। মোশতাক মুক্তিযুদ্ধের সময় সেপ্টেম্বর মাসে যুদ্ধ বন্ধ করার ফর্মুলা নিয়ে কলকাতায় অবস্থিত মার্কিন কনসাল জেনারেলের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ঘাতকদের একটি অংশের সঙ্গে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের সিআইএর স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরির যোগাযোগ ছিল। অন্যদিকে এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে পাকিস্তানের জড়িত থাকার অসংখ্য প্রমাণ এর মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে মূল যোগাযোগটা রক্ষা করতেন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা আবদুল হক। তাঁর যোগাযোগটা ছিল সরাসরি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ বঙ্গবন্ধুকে কয়েকবার সতর্ক করার চেষ্টা করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়; কারণ বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, কোনো বাঙালি তাঁর ক্ষতি করবে না। ঘাতকদের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির মৃত্যু ঘটিয়ে এই দেশটিকে পুনরায় মিনি পাকিস্তানে রূপান্তর করা। তাদের ধারণা ছিল, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেই বাংলাদেশকে হত্যা করা যাবে। বাস্তবে ব্যক্তিকে হত্যা করে আদর্শকে হত্যা করা কঠিন এবং সেই আদর্শের প্রতি মানুষের সমর্থন থাকলে তা অনেকটা অসম্ভব। বঙ্গবন্ধু একজন ব্যক্তি ছিলেন ঠিক, কিন্তু তিনি আজীবন একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শের জন্য লড়াই করে গেছেন এবং তা ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি। তাঁর এই আদর্শ ধারণ করতেন মুজিবনগর সরকারের নেতারাও। যদিও সেই নেতাদের মধ্যে মোশতাক-তাহেরউদ্দিন ঠাকুরের মতো ব্যক্তিরাও ছিলেন।

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর বঙ্গবন্ধুর রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যাঁরা খুনি মোশতাকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন তাঁদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন অথবা আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ছিলেন। অনেকে বলেন, তাঁরা বন্দুকের নলের ডগায় মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। মন্ত্রিসভায় যাঁরা যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে ১০ জন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ৯ জন প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে আটজন মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ও মোহাম্মদউল্লাহ বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ড. এ আর মল্লিক আর ড. মোজাফফর আহমেদ চৌধুরীর মতো পণ্ডিতজনও ছিলেন। ড. মল্লিক ভারতে বাংলাদেশের প্রথম হাইকমিশনার ও পরে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী ছিলেন। ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরীকে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন প্রতিষ্ঠা হলে তিনি এই কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাদের হয়তো ইমানের জোর ছিল না অথবা তারা মোহের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন কিংবা জীবনের মায়াকে জয় করতে পারেননি। জাতীয় চার নেতা ছাড়াও অনেকে খন্দকার মোশতাককে সমর্থন করার চেয়ে কারাবরণ শ্রেয় মনে করেছিলেন। সেনাপ্রধান জেনারেল সফিউল্লাহর ভূমিকায় পেশাদারির কোনো লক্ষণ ছিল না। হতাশ করেছেন মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানী। সেনাবাহিনীর মধ্যে তাঁর একধরনের গ্রহণযোগ্যতা ছিল, যা তিনি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ১৫ আগস্ট থেকে শুরু করে নভেম্বর মাসের শুরু পর্যন্ত একাধিক কেন্দ্র থেকে দেশ পরিচালনার চেষ্টা করা হয়। প্রথমটি ছিল বঙ্গভবনকেন্দ্রিক, যেখানে মোশতাক তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে দেশের প্রেসিডেন্ট-প্রেসিডেন্ট খেলছিলেন। তিনি মূলত খুনি সেনা অফিসারদের সেবাদাসে পরিণত হয়েছিলেন। ঢাকা সেনানিবাসে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন দল-উপদলের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছিল। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ চেষ্টা করেছিলেন সেনাবাহিনীর ভেঙে পড়া চেইন অব কমান্ড পুনরুদ্ধারের। তাঁর প্রচেষ্টার মধ্যে একধরনের পেশাদারি ছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি জিয়ার চাতুর্যের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীতে একটি সেনা বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। জিয়াকে গৃহবন্দি করা হয়। অন্যদিকে জাসদের ভূমিকাও এ সময় পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছিল। কর্নেল তাহের সেনাবাহিনীর একটি অংশকে তাঁর রোমান্টিক বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। খুনিচক্র উপলব্ধি করতে পেরেছিল পরিস্থিতি দ্রুত তাদের আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারে। যেহেতু তাদের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগকে খতম করে বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তানে রূপান্তর করা, তাদের মনে হয়েছিল, এই জটিল পরিস্থিতিতে কোনো রকমে যদি খালেদ মোশাররফ সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা আনতে সক্ষম হন ও তাঁর ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে পারেন, তাহলে হয়তো বন্দি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা জেল থেকে মুক্ত হয়ে আবার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় পুনর্বাসন করবেন। এতে নিশ্চিতভাবে তাদের বিপদ। জেলে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা বন্দি থাকলেও বঙ্গবন্ধুহীন দলের নেতৃত্ব দিতে পারতেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে পারলে বঙ্গবন্ধুহীন আওয়ামী লীগকেও আবার ক্ষমতায় আনতে পারেন তাঁরা। সে চিন্তাতেই খুনিরা ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ঢুকে জাতীয় চার নেতাকে নিমর্মভাবে হত্যা করে, যা ছিল বিশ্বের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এ হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ থেকে আওয়ামী লীগ নামক রাজনৈতিক দলটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। তারা ধরে নিয়েছিল, দেশে আওয়ামী লীগ না থাকলে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানে রূপান্তর করা সহজ হবে। ঘাতকরা একটি আদর্শকে হত্যা করতে চেয়েছিল।  অন্যদিকে সেনানিবাসের ভেতরে জাসদের প্রতিবিপ্লবের কারণে এক চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। জাসদ সেনাবাহিনীর ভেতর তথাকথিত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নামে একটি সংগঠন সৃষ্টি করে এই প্রতিবিপ্লবের নেতৃত্ব দেন কর্নেল (অব.) তাহের। ৩ নভেম্বরের পরপরই সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। তাহের যেহেতু অবসরপ্রাপ্ত ছিলেন, তিনি তাঁর প্রতিবিপ্লব সফল করার জন্য বিশ্বাস করেছিলেন তাঁর বন্ধু সেনাবাহিনীর উপপ্রধান জেনারেল জিয়ার ওপর। তাহের ৭ নভেম্বর জিয়াকে মুক্ত করেন। সেই জিয়া পরে এক তামাশাপূর্ণ বিচারের মাধ্যমে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিলেন। খালেদ মোশাররফ তাঁর ক্ষমতা সুসংহত না করে তিনি সেনাপ্রধানের র‍্যাংক ব্যাজ পরতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। খালেদ মোশাররফ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব ছিল। সেদিক থেকে জিয়া অনেক চতুর ছিলেন। তিনি ঝোপ বুঝে কোপ মারতে ছিলেন তুলনাহীন। এমন ধোঁয়াশা পরিস্থিতির সুযোগে বঙ্গবন্ধুর খুনিরা একটি বিশেষ বিমানে ঢাকা থেকে ব্যাংকক পালিয়ে যায় এবং তাতে সহায়তা করে মার্কিন দূতাবাস। সেনাবাহিনীর মধ্যে জিয়ার অনুগত সৈনিকরা খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম, কর্নেল এ টি এম হায়দার বীর উত্তম, মেজর কে এন হুদা বীর বিক্রমসহ অনেক সেনা সদস্য ও অফিসারের পরিবারের সদস্যদের ৭ নভেম্বর হত্যা করে। যেসব সেনা অফিসারকে হত্যা করা হয় তাঁরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। অচিরেই কর্নেল তাহেরসহ জাসদের সব নেতাকে গ্রেপ্তার করে জিয়া সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়ার উত্থান ছিল এক গভীর ষড়যন্ত্রের সফল বাস্তবায়ন। জেল হত্যাকাণ্ডের মূল হুকুমদাতা ছিলেন খন্দকার মোশতাক। ঘাতকরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করতে চাইলে জেলার তাদের বাধা প্রদান করলেও মোশতাকের নির্দেশে তিনি ঘাতকদের কারাগারের ভেতরে প্রবেশ করতে দিতে বাধ্য হন।

১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের পর ষড়যন্ত্রকারীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশ পেছনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। যে বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল, সেই বাংলাদেশকে জিয়া একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই ধ্বংস করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ৪৫ বছর পরও বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ এক শ্রেণির ধর্মান্ধ উগ্র মৌলবাদীদের হাতে নিয়মিত বিরতি দিয়ে আক্রান্ত হন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তাঁর পিতার নির্দেশিত পথে হাঁটার চেষ্টা করেন। কিন্তু সব সময় সফল হতে পারেন না, কারণ তাঁর নিজ দলের ভেতরেও পঞ্চম বাহিনী আছে। সার্বিক বিবেচনায় তারা সুযোগ পেলে শেখ হাসিনার সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করতে দ্বিধা করবে না, যেমনটি তাঁর পিতার সঙ্গে ওদের পূর্বসূরিরা করেছিল। ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের শিক্ষা হওয়া উচিত দেশের শত্রু-মিত্রদের চেনা ও সব ষড়যন্ত্র থেকে দেশকে মুক্ত রাখা। এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু সফল হতে পারেননি, তাঁর কন্যা সফল হবেন—সেটাই দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ জনগণের বিশ্বাস। এ মুহূর্তে শেখ হাসিনাই লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক

Add Comment

Click here to post a comment