slider জাতীয় ট্র্যাভেল বিভাগীয় সংবাদ

পাহাড়ের কান্না দেখতে চলে আসুন হিমছড়ি

রেহেনা আক্তার রেখা:  জায়গাটি যেন পাহাড়, সমুদ্র আর ঝর্ণার এক শাশ্বত মিলনমেলা। পাহাড়ের কান্না খুব কাছ থেকে দেখা যায় ও অনুভব করা যায়। গোধূলী লগ্নে প্রিয় মানুষের সাথে সূর্যাস্তে’র মন কাড়া দৃশ্য অবলোকন করা যায়। একপাশে পাহাড়ের অপরূপ সৌর্ন্দয আর অন্য পাশে সাগরের ঢেউয়ের খেলা। জঙ্গলে ঢাকা ঘন পাহাড়ের বুক চিরে বেড়িয়ে আসা একটি চপলমতি ঝর্ণা। সর্বপরি প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মাঝে পাখির কিচিরমিচির ডাক। নিসর্গ প্রেমে হারিয়ে যাওয়ার জন্য এমনি এক মোহময় দশর্নীয় স্থান এই হিমছড়ি।

বাংলাদেশের একমাত্র শীতল পানির ঝর্ণাটি এই হিমছড়িতে অবস্থিত। কক্সবাজার জেলা শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দক্ষিনে বাশঝাড় আর পাম গাছে ঘেরা এক অপরূপ পর্যটন স্পট এটি। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসে হিমছড়িসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি পর্যটন স্পটের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়। ঝড়ে সৃষ্ট খতসমূহ যেন চাঁদের গায়ে কলঙ্কের মত লেগে ছিল বেশ ক’বছর। পরে সরকারি সংস্কার কর্মসূচীর আওতায় হিমছড়িকে বর্তমানে অনেকখানি কলঙ্কমুক্ত করা গেছে।

হিমছড়ির জাতীয় উদ্যান: হিমছড়ির জাতীয় উদ্যানটিও একটি জনপ্রিয় পযর্টন কেন্দ্র। উদ্যানটি ১৯৮০ সালে কক্সবাজার শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে ১৭২৯ হেক্টর (১৭.২৯ বর্গ কিলোমিটার) জায়গা জুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই উদ্যান স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পর্যটন ও বিনোদন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং এ সংক্রান্ত গবেষণা ও প্রশিক্ষণ। হিমছড়ি এলাকাটি চিরসবুজ ও প্রায়-চিরসবুজ ক্রান্তীয় বৃক্ষের বনাঞ্চলের একটি অংশ। বনের মোট ১১৭ প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে ৫৮ প্রজাতির বৃক্ষ, ১৫ প্রজাতির গুল্ম, ৪ প্রজাতির তৃণ, ১৯ প্রজাতির লতা এবং ২১ প্রজাতির ভেষজ রয়েছে। হিমছড়ি বনাঞ্চলকে হাতির আবাসস্থল বলে ধারণা করা হয়।

এছাড়া এই উদ্যানে অনেকগুলো জলপ্রপাত রয়েছে, যার মধ্যে হিমছড়ি জলপ্রপাতটি সবচেয়ে সুন্দর ও জনপ্রিয়। পাহাড় কেটে তৈরী করা সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের উপরে উঠে একসঙ্গে সাগর, পাহাড় ও সমুদ্রের সৌন্দর্য খুব সহজেই অনুভব করতে পারে পযর্টকরা। আর এভাবেই তারা প্রকৃতির সাথে একাকার হয়ে যায়। হিমছড়ি সৈকতটিও বেশ মনোরম আর কোলাহোল মুক্ত। শান্ত ও নীরব পরিবেশের এ রকম সৈকত আমাদের দেশে আর কোথাও নেই।

যেভাবে যাবেন : ঢাকা ও কক্সবাজারের মধ্যে সড়কপথে যোগাযোগের সুব্যবস্থা রয়েছে। তাই বাসে করে আপনি সহজেই ঢাকা থেকে কক্সবাজারে পৌঁছুতে পারবেন। ঢাকা ও কক্সবাজারের মধ্যে চলাচলকারী মানসম্মত বাসগুলো হলোঃ গ্রিন লাইন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, সোহাগ পরিবহন, এস আলম পরিবহন, শাহ্ বাহাদুর, সেন্টমার্টিন্স ইত্যাদি। যারা বন্ধুদের নিয়ে হৈ-হুল্লোর করে আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠে হিমছড়ি ভ্রমন করতে চান, তারা কক্সবাজার থেকে খোলা ছাদের জিপে করে হিমছড়ি পৌঁছুতে পারেন। ভাড়া জনপ্রতি ৭০ থেকে ১০০ টাকা। দ্রুত গতিতে যখন জিপ ছুটে চলবে আর খোলা জিপের উপর দাঁড়িয়ে আপনি যখন দু’পাশে তাকাবেন, তখন মনে হবে যেন স্বপ্নের দেশে ভেসে বেড়াচ্ছেন। মনে হবে আপনার মনের ভিতরে লুকিয়ে রাখা বিন্দু বিন্দু স্বপ্নগুলো পূরণ হতে চলেছে। এটি আপনার জীবনের সেরা অভিজ্ঞতাগুলোর একটি হতে পারে।

এছাড়া কলাতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে অটোরিকশা অথবা চাঁদের গাড়ি (পুরনো মডেলের এক ধরণের জিপ) রিজার্ভ নিয়ে মাত্র ২৫ মিনিটে হিমছড়িতে পৌঁছাতে পারেন। ভাড়া লাগবে ৩০০-৫০০ টাকা। এছাড়া বাজার থেকে আপনি কার বা মাইক্রোবাসও ভাড়া করতে পারবেন।

যেখানে থাকবেনঃ হিমছড়িতে কোনো বানিজ্যিক হোটেল নেই। তাই কক্সবাজারে অবস্থান করেই হিমছড়ি ঘুরে বেড়াতে হবে। কক্সবাজারে বেশ উন্নত মানের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে পাঁচ তারকা মানের বেশ কয়েকটি হোটেলসহ সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন মানের প্রচুর হোটেল, মোটেল ও গেস্ট হাউজ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে হোটেল সী গাল, হোটেল সায়মন, হোটেল সী ক্রাউন এবং হোটেল সী প্যালেস অন্যতম।

পর্যটকদের বাস উপযোগী মানসম্মত হোটেলে রুমভাড়া দৈনিক এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত। আবার বিলাসবহুল আন্তার্জাতিক মানের ফাইভ স্টার হোটেলগুলোর রুমভাড়া সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত রয়েছে। এছাড়া যারা আরও কম খরচে থাকতে চান তারা কলাতলী রোড়ের হোটেলগুলোতে ৫০০ টাকা মূল্যেও থাকতে পারবেন।