জাতীয়

‘পানিপথের যুদ্ধ দেখিনি, ডিমযুদ্ধ দেখলাম’

জনপ্রিয় গান ‘মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা…’ নতুন করে গাওয়ার সময় এসেছে।  ডিম দিবসে কম মূল্যে ডিম কিনতে গিয়ে লাঠির বাড়ি খাওয়া ডিম প্রেমীরা আয়োজকদের উদ্দেশে গাইতে পারেন, ‘আণ্ডা হই হই ডাণ্ডা খাওয়াইলা…’।

‘মাগনা পেলে আলকাতরা খায়’ কথাটা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। কবে কে মাগনা পেয়ে আলকাতরা খেয়েছিল তার স্ক্রিনশটটা আজ পর্যন্ত প্রকাশ না পেলেও মাগনা আণ্ডা (১২ টাকা হালি ডিম বর্তমান বাজারে ফ্রির মতোই) খেতে গিয়ে ডাণ্ডা খাওয়ার অনেক স্ক্রিনশট ফেসবুকে দেখা যাচ্ছে।

ঘটনা হলো আজ (শুক্রবার) ছিল বিশ্ব ডিম দিবস। এ উপলক্ষে কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশনে তিন টাকা প্রতি পিস মানে ১২ টাকা হালি ডিম বিক্রির ঘোষণা দেওয়া হয়।

ঢাকাবাসীর বিশেষ করে ঢাকার ব্যাচেলরদের তো ডিম ছাড়া চলেই না। তিনটাকায় ডিম কিনতে ভিড়  উপচে পড়তে থাকে খামারবাড়িতে। প্রায় দুই মাইল লম্বা সিরিয়াল হয়।


যেখানে তিন বাঙালি এক হলেই নানা বিষয়ে উন্মুক্ত বিতর্ক প্রতিযোগিতা শুরু হয়, সেখানে  পঞ্চাশ হাজার মানুষ কি লাইনে দাঁড়িয়ে দিনের বেলায় তারা গুনবে? স্বভাবতই  বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দেশে হরতাল অবরোধ না থাকায় আমাদের  আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও দীর্ঘদিন হাতের ব্যায়াম, লাঠির ব্যায়াম করতে পারছিল না। তারা হালকা ব্যায়ামের মাধ্যমে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। শুরু হয় হুড়োহুড়ি।

হুড়োহুড়িকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ সম্পূর্ণ ফ্রিতে ডিম বাগিয়ে নিয়েছেন। অনেকে ফিরেছেন খালিহাতে।
আমার  এক বন্ধু তো ডিম না পেয়ে খুবই হতাশ। আমাকে ফোন করে বলল, ‘এইটা কেমন ফাজলামি। ডিম দিতে চেয়ে দিল না?’
আমি বললাম, ‘আরে সামান্য ডিমই তো। এত হতাশ হওয়ার কী আছে।’
বন্ধুর কণ্ঠে ঝাঁঝ। সে বলল, ‘হতাশ হবো না? কতবড় পরিকল্পনা আঁটছিলাম। তিন বন্ধু মিলে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। একেকজন ৯০ টা করে ডিম কিনবো। প্রতি পিস মাত্র তিন টাকায়। এগুলো সেদ্ধ করে বিক্রি করবো ১৫ টাকায়। ৯০টা ডিম বেচে লাভ করবো ১০৮০ টাকা। ব্যবসাটা আর হইলো না।’

আমার মাথা খুলতে শুরু করলো। বুঝলাম এত মানুষ লাইনে দাঁড়ানোর রহস্য। তাকে বললাম, ‘বাদ দাও বন্ধু। ১০৮০ টাকার ব্যবসা হাতছাড়া হওয়ায় তোমার খুব বেশি ক্ষতি হবে না।’
সে বলল, ‘বাদ দিব কেন? আয়োজকরাইতো ডিম মেরে দিল। ৫০ হাজার ডিম বিক্রির কথা বলে ১০/১৫ হাজার ডিম এনেছে।  ডিম যখন দিতেই পারবে না তাহলে এত মানুষ জড়ো করার দরকার কী?’

ডিমের জন্য এই হুড়োহুড়ি দেখে একটা আইডিয়া মাথায় এলো-
সামনে নির্বাচন। নির্বাচন মানে মনোনয়ন, শো-ডাউন, মিছিল-মিটিং, সভা, সমাবেশ। কার চেয়ে কার লোকবল বেশি তার প্রদর্শন। নেতা কর্মীরা যদি ঘোষণা দেন ‘আমাদের সমাবেশস্থলে এক টাকায় ডিম বিক্রি হবে,’– ঢাকার অর্ধেক লোক তার সমাবেশে হাজির হবে নিশ্চিত।

আরেক বন্ধু ফোন দিয়ে বলল, ‘দোস্ত পানিপথের যুদ্ধ দেখিনি। ডিমযুদ্ধ দেখলাম। সামান্য ডিমের জন্য মানুষ এমন লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়ে দিল। ভাগ্যিস মুরগী এই দৃশ্য দেখেনি। দেখলে লজ্জায় ডিম পাড়া বন্ধ করে দিত।’

ডিম নিয়ে এমন কাণ্ডের বেশকিছু কারণ আছে। বুয়া ও মেস ফ্যাক্টর তারমধ্যে অন্যতম। ঢাকার মেসে থাকা ব্যাচেলররা বুয়া রাখে রান্নার জন্য। আর এই বুয়ারা মাসের বেশিরভাগ সময় অনুপস্থিত থাকে, ঠিকমতো রান্না করে না। বুয়া ছুটিতে এই কথা বলে ক্ষুধাকে তো ছুটি দেওয়া যায় না। ফলে ব্যাচেলরদের ঝুঁকতে হয় ডিমের দিকে। সুন্দরীরাও নাকি চুল ও ত্বক উজ্জ্বল রাখতে ডিম ব্যবহার করে। ফলে ঢাকাবাসীর প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী ডিম।

হাতি যেমন মরলেও লাখ টাকা বাঁচলেও লাখ টাকা। তেমনি ভালো ডিমের নানাবিধ ব্যবহারের পাশাপাশি পচা ডিমেরও রয়েছে নানাবিধ ব্যবহার। সে ক্ষেত্রে বলা যায় ভালো ডিম যেই টাকা পচা ডিমও সেই টাকা।

পচা ডিম আবার কী কাজে লাগে অনেকে সে প্রশ্ন করে বসতে পারেন। একটা গল্প বললেই সবাই বুঝতে পারবেন-
এক মোটিভেশনাল স্পিকার গৎবাঁধা, বস্তাপচা বক্তৃতা দেওয়ার ফলে কয়েকটা অনুষ্ঠানে গিয়ে পচা ডিমের শিকার হলেন। তিনি বক্তৃতা শুরু করলেই দর্শক পচা ডিম ছুঁড়তে শুরু তাকে উদ্দেশ্য করে।

এ নিয়ে হৈচৈ পড়ে গেল। মোটিভেশনাল স্পিকারকে তো আর কেউ ডাকে না। কার এত ঠেকা পড়েছেে এই বক্তাকে ডেকে পচা ডিমের বৃষ্টিতে পড়ার?

স্পিকারও বক্তৃতা দিতে না পেরে পেটে কথা জমতে জমতে পেট ফুলে যাওয়ার দশা।

অবশেষে তার মাথায় এলো নতুন বুদ্ধি। যোগাযোগ করলেন আয়োজকদের সাথে। বললেন, ‘আমাকে মোটিভেশনাল স্পিচ দেওয়ার সুযোগ দেন। নিশ্চয়তা দিলাম কেউ ডিম ছুঁড়ে মারবে না।’  আয়োজকরা আশ্বস্ত হলেন। তাকে ডাকলেন। স্পিকার সেই একই বস্তাপচা বক্তৃতা দিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো কেউ পচা ডিম ছুড়ে মারলো না। আয়োজকদের তো বিস্ময়ের সীমা নেই। একজন ব্যাকস্টেজে স্পিকারকে বলেই বসলেন- ‘ভাই, ঘটনা কী! পচা ডিম মারল নো কেউ?’ মোটিভেশনাল স্পিকার নড়েচড়ে বসলেন। ব্যাপক ভাব নিয়ে বললেন, ‘পচা ডিম পেলে না মারবে? গতকাল এলাকার সব পচা ডিম আমি কিনে নিয়েছি।’ লেখক- মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ