মতামত/বিশেষ লেখা/সাক্ষাৎকার

নোট ও গাইড বই প্রসঙ্গ তপন কুমার ঘোষ

%e0%a6%a4%e0%a6%aa%e0%a6%a8-%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%98%e0%a7%8b%e0%a6%b7এখন পরীক্ষার মৌসুম চলছে। আর কদিন পর শুরু হচ্ছে নতুন শিক্ষাবর্ষ।

বছরের শুরুতেই ১ জানুয়ারি লাখ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হবে নতুন বই। প্রথম থেকে শুরু করে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে পাঠ্যবই। এ দিনটি শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দের, উৎসবের। নতুন বই হাতে পেয়ে খুশিতে ভরে উঠবে তাদের মন। কিন্তু বইয়ের বাজারে গেলে দেখা যাবে ভিন্ন চিত্র। দোকানে দোকানে সাজানো আছে নিষিদ্ধ নোট বই বা গাইড বই। সব শ্রেণির, সব বিষয়ের গাইড বই এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।   প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকের নোট বা গাইড বই মুদ্রণ ও বিক্রয় নিষিদ্ধ। ১৯৮০ সালের নোট বই (নিষিদ্ধকরণ) আইনে এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। আইন লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান এই আইনে আছে। প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালে হাইকোর্ট বিভাগের এক আদেশে নোট বইয়ের পাশাপাশি গাইড বইও নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে এক রায়ে আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের এই আদেশ বহাল রাখে। গাইড বইয়ের চাহিদা নেই, এ কথা বলা যাবে না। চাহিদা আছে বলেই তো সব শ্রেণির সব বিষয়ের গাইড বইয়ে বাজার সয়লাব। শ্রেণিকক্ষে যে পাঠদান করা হয় তা অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য যথেষ্ট নয়। কম মেধাবী বা পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য শ্রেণিকক্ষের বাইরে সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। তাই উপায়ান্তর না দেখে অভিভাবকরা গাইড বই তুলে দিচ্ছেন ছেলেমেয়েদের হাতে। স্কুলের আগে-পরে পাঠাচ্ছেন কোচিং সেন্টারে। অনেক স্কুল কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট প্রকাশকের গাইড বই কেনার জন্য ছাত্রছাত্রীদের বাধ্য করে বলে অভিযোগ আছে। প্রকাশকদের সঙ্গে কিছু কিছু স্কুল কর্তৃপক্ষের যোগসাজশের বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর টেক্সট বইয়ের সঙ্গে সংযোগ নেই বললেই চলে। শিক্ষাব্যবস্থা গাইড বই আর কোচিং সেন্টারনির্ভর হয়ে পড়েছে। আমাদের বই পড়ার অভ্যাস দিন দিন কমে যাচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে পরীক্ষাকেন্দ্রিক। তাই পরিশ্রম করে জ্ঞানার্জনের চেয়ে পরীক্ষা পাসের শর্টকাট রাস্তা আমরা খুঁজছি। গাইড বই থেকে কিছু নির্বাচিত প্রশ্নের তৈরি জবাব মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উদগীরণ করতে পারলেই পরীক্ষায় পাস করা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব গাইড বই থেকে হুবহু প্রশ্ন নিয়ে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা হচ্ছে বলে শোনা যায়। সমস্যা একটাই। অধিকাংশ গাইড বই নিম্নমানের। ভুলে ভরা। এর ফলে শিক্ষার্থীরা একদিকে ভুল শিখছে, অন্যদিকে তাদের চিন্তাশক্তির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

গাইড বইয়ের প্রকাশকদের এখন পৌষ মাস, কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের সর্বনাশ। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় তেমন একটা সুবিধা করতে পারছেন না অনেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় পাস মার্ক পেয়েছে ১০ শতাংশের কম। যাচ্ছেতাই অবস্থা। অভিভাবকদের মাথায় হাত।

প্রতিভার অনেকটাই জন্মগত। উপযুক্ত পরিবেশ প্রতিভাকে লালন করে। চর্চার মাধ্যমে প্রতিভা বিকশিত হয়। নতুন কিছু জানার মধ্যে আনন্দ আছে, না বুঝে মুখস্থ করার মধ্যে তা নেই। আছে একঘেয়েমি। মুখস্থ বিদ্যার ফলে না প্রকৃত জ্ঞানলাভ হচ্ছে, না হচ্ছে মেধার চর্চা। না বুঝে মুখস্থ বিদ্যার এই হলো বিপদ। একটু ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলেই লা-জবাব। আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব রয়েছে এটা সবারই জানা। বিশেষ করে অংক ও ইংরেজির ভালো শিক্ষকের অভাব প্রকট। যে দু-চারজন অভিজ্ঞ শিক্ষক আছেন তারা মহাব্যস্ত। দম ফেলার সময় নেই। কোচিং সেন্টারের নামে স্কুল খুলে বসেছেন। সাতসকালে কোচিং সেন্টার, দুপুরে স্কুল, বিকালে আবার কোচিং সেন্টার। মাঝ রাতের আগে ছুটি নেই। এভাবে প্রতিদিন সতের-আঠারো ঘণ্টা একটানা পরিশ্রম করে কীভাবে ছাত্রছাত্রীদের প্রতি তারা সুবিচার করেন তা জানতে ইচ্ছে করে।

শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক। কিন্তু সুযোগ-সুবিধার অভাবে এ মহান পেশায় আসতে আগ্রহী নন মেধাবীরা। তুমি ভবিষ্যতে কী হতে চাও? পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মেধাবীদের কাছে অনেক সময় এ প্রশ্নটি করা হয়। কেউ ডাক্তার হতে চায়, কেউ ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়, আবার কেউবা বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসন ক্যাডারে চাকরি পেতে চায়। ভালো শিক্ষক হতে চাই— এ জবাব কদাচিৎ মেলে। এ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। এত কথা না বলে মেধাবীদের এ পেশায় আসতে আগ্রহী করে তোলার ব্যাপারে আমরা কী কী পদক্ষেপ নিয়েছি তা একটু খতিয়ে দেখা ভালো। কীভাবে শিক্ষার মান উন্নত করা যায় তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা সভা, সেমিনার ও টকশোতে নানা পরামর্শ ও সুপারিশ দিয়েই চলেছেন। পত্রপত্রিকায় সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে এন্তার। ফলাফল শূন্য তা বলা যাবে না। শিক্ষা খাতে কোনো অর্জন নেই এমন কথা ঘোর শত্রুও বলেন না। শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো— এসব খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে, এটা সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন। এই যে শিক্ষা বছরের শুরুতেই সারা দেশে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে নতুন বই তুলে দেওয়া হচ্ছে, এটা কম অর্জন নয়। অথচ এমন একটা সময় ছিল যখন পাঠ্যবই পেতে শিক্ষার্থীদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হতো। শিক্ষার বিস্তার হয়েছে। কিন্তু মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। শ্রেণিকক্ষে পঠন-পাঠনের মান উন্নত না হলে শুধু আইন প্রণয়ন করে গাইড বইয়ের ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না, এ সত্যটি কী শিক্ষক, কী অভিভাবক, কী শিক্ষার্থী, সবারই উপলব্ধি করতে হবে।   শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত নির্ধারণ, মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষা উপকরণের ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, উপযুক্ত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যবইয়ের সংস্কার, ছুটি কমিয়ে কার্যদিবস বাড়ানো— এসব বিষয়ে আমাদের আরও মনোযোগ দিতে হবে।

 লেখক : সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি), জনতা ব্যাংক লিমিটেড।

Add Comment

Click here to post a comment





সর্বশেষ খবর